পাঁচ-ছয়গুণ বেশি টাকা দিয়েও তাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত

মালয়েশিয়া অভিবাসী শ্রমিক নেওয়ার কোটা পূরণ হয়ে গেছে। গত মার্চেই দেশটি জানিয়ে দিয়েছিল, মে মাসের ৩১ তারিখের পর থেকে আর কোনো শ্রমিক নেওয়া হবে না। কিন্তু গত দুই মাসেই মালয়েশিয়ায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন আরও অনেকে। শুক্রবার (৩১ মে) শেষদিনে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে ভিড় করছেন মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু হাজার-হাজার মানুষ। পাসপোর্ট–ভিসাও তাদের কাছে আছে। কিন্তু রিক্রুটিংয়ের দায়িত্বে থাকা এজেন্সি টিকিট দিতে পারেনি।

জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক হিসেবে যেতে চাওয়া এই মানুষগুলোর কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত খরচের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা নিয়েছে এজেন্সিগুলো। ছয়-সাতগুণ বেশি টাকা নেওয়ার পরও এখন তারা তাদের দায় নিচ্ছে না। সরকার দুষছে এসব এজেন্সিকে। এজেন্সিগুলোও দুষছে সরকারকে। কিন্তু মাঝে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ। তাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। তাদের অনেকেই নিজেদের জমি বিক্রি করে কিংবা ঋণ করে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য টাকা দিয়েছিলেন।

২০২২ সালের আগস্টে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য ভিসা উন্মুক্ত করে মালয়েশিয়া। সিন্ডিকেটের অনিয়মের কারণে চার বছর স্থগিত ছিল এই প্রক্রিয়া। দুই দেশের সরকারের চুক্তি অনুযায়ী শ্রমিক প্রতি খরচ নির্ধারণ করা হয় ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। কিন্তু এক জরিপ বলছে, প্রতি শ্রমিকের মাথাপিছু খরচ পড়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। সে হিসাবে সিন্ডিকেট অতিরিক্ত ১০০ কোটি ডলার হাতিয়েছে।

এজেন্সিগুলো বলছে, ঢাকা থেকে মালয়েশিয়াগামী ফ্লাইট কম থাকায় ৩১ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিকের টিকিটের ব্যবস্থা করা যায়নি। মালয়েশিয়া সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে শুক্রবারে (৩১ মে) পর বাংলাদেশসহ ১৫টি দেশ থেকে কোনো কর্মীকে দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। 

শুক্রবার শেষদিনে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল মাত্র দেড়হাজার কর্মীর। তাঁরা কে কোনো ফ্লাইটে, কোন বিমানে যাবেন, তা আগে থেকে ঠিক করা ছিল। এর বাইরে আরও ৩১ হাজার ৭০১ জন বাংলাদেশি কর্মী চাকরি নিয়ে মালয়েশিয়ার যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন ও ভিসা পেয়েছেন, কিন্তু টিকিট না পেয়ে বিপদে পড়েছেন।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার। প্রায় ১৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মী আছেন সেখানে। গতবছর সেখানে গেছেন ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন কর্মী। এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত গেছেন ৪৪ হাজার ৭২৭ জন।

শ্রমিকরা টিকিট পাননি, সরকারের উদাসীনতায় এই সংকট তৈরি হয়েছে জানিয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সভাপতি আবদুস সালাম আরেফ সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এক মাসের মধ্যে মালয়েশিয়ায় লোক যেতে হবে ৫০–৬০ হাজার লোক। এটা নিয়ে সরকারের উদাসীনতার কারণে কোন প্রস্তুতি নেই, আলোচনা নেই। এটা আমাদের মালয়েশিয়াগামী প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্ভাগ্য!’ 

মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অপেক্ষারত কয়েকজন জানান, তাদের মধ্যে অনেকে তিন দিন ধরে অপেক্ষা করছেন। অধিকাংশই উড়োজাহাজের টিকিট এখনো হাতে পাননি। যে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য টাকা জমা দিয়েছেন, তারাও এখন আর ফোন ধরছে না। 

অনেকে জমি বন্ধক রেখে ও ব্যাংক ও ব্যক্তির কাছ থেকে ঋণ নিয়ে এজেন্সিকে টাকা দিয়েছেন। এজেন্সি থেকে বলার পরও তাঁরা বিমানবন্দরে এসেছেন। কিন্তু টিকিট দিতে নানা টালবাহানা করছে, কেউ কেউ ফোনই ধরছেন না। 

বিমানবন্দরে হাজির হওয়া আরও বেশ কয়েকজন যাত্রী জানিয়েছেন, তাঁরা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সময় বাড়াতে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি করেছেন। তাঁরা বলছেন, পাঁচ থেকে সাত লাখ করে টাকা তাঁরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিয়েছেন। এখন যেতে না পারলে বিপদে পড়বেন। কোম্পানিগুলো তাঁদের দেওয়া টাকা ফেরত দেবে কি না, সেই সংশয়ও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। 

মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের ভিড় সম্পর্কে জানতে চাইলে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘দুই দিন ধরে মালয়েশিয়াগামী অনেক যাত্রীর চাপ রয়েছে। বাড়তি এই চাপ সামলাতে নিয়মিত ফ্লাইটের পাশাপাশি অতিরিক্ত ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’ 

এত আগে বিষয়টি জানানোর পরও কেন এখন এতগুলো মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে—এ ব্যাপারে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, কতসংখ্যক মানুষ যেতে পারেনি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) কাছে সেই তালিকা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা দেয়নি। 

তবে সরকার ওপর দায় চাপিয়ে বায়রা মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেছেন, মালয়েশিয়া সরকার অনেক আগেই বলেছে, ৩১ মে'র মধ্যে লোক পাঠানো শেষ করতে হবে। সার্বিক ব্যবস্থাপনা শেষ সময়ে এসে কেন করা হলো? 

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক ও মাইগ্রেশন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়ে যা হচ্ছে তা দুর্বৃত্তপনা। এখানে সিন্ডিকেটের জয়জয়কার। এটা কোনো নিয়ম হতে পারে না। ভিসার মেয়াদ থাকার পরেও ওই দেশে ঢুকতে পারবে না। দুই দেশের এখানে দায় রয়েছে। এতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।’

এ ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট জয় হয়েছে, হেরেছে প্রবাসী শ্রমিকেরা। অথচ এই প্রবাসী শ্রমিকদের টাকায় দেশ চলে। আমরা চাই সরকার এ ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত কমিশন করে প্রকৃত সত্য খতিয়ে দেখুক, সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিক।’ 

উল্লেখ্য, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর চক্রে শুরুতে ছিল ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি। পরে ধাপে ধাপে মোট ১০০ বেসরকারি এজেন্সি এতে যুক্ত হয়। পরে যুক্ত হয় সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)। গত এক যুগে তিনবারেরও বেশি মালয়েশিয়ায় শ্রমিক ভিসা চালু হয়। কিন্তু সিন্ডিকেটের অনিয়মের কারণে বারবার বন্ধ হয়েছে।