তৌহিদ আজিজ
ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে করা ইরানের পরমাণু সমঝোতা চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে আসার পর থেকেই তেহরান-ওয়াশিংটন সম্পর্ক তলানিতে এসে পৌঁছায়। ২০১৮ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে এই চুক্তি থেকে সরিয়ে নেয়। আর এর পর থেকেই ইরানের ওপর চলতে থাকে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞার খড়গ। কিন্তু অনড় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নানা হুমকি-ধমকিকে তোয়াক্কা না করে উলটো তারা হুঁশিয়ারি দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তারা মাথা নত করবে না। সম্প্রতি ইরান ঘোষণা করে যে, তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ চালিয়ে যাবে। আর সে অনুযায়ী তারা ইউরেনিয়ামের মজুত বাড়িয়ে যাচ্ছে।
ইরান আরো ঘোষণা দেয় যে, ৭ জুলাই থেকে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ পাঁচ মাত্রায় নিয়ে যাবে। পরমাণু চুক্তি অনুযায়ী তাদের যে ৩.৬৭ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বাধ্যবাধকতা ছিল তা আর তারা মানবে না। দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লা আলি খামেনির সিনিয়র উপদেষ্টা আলী আকবর বেলায়েতি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ইরান তার শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির জন্য যে কোনো মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করতে পারে। তবে এটাও বলেন যে, পরমাণু চুক্তির প্রতিশ্রুতি যদি সবাই মেনে চলে তাহলে তারা এ থেকে সরে আসতে পারেন। এবার দেখা যাক এই ইউরেনিয়াম কেন বিশ্ববাসীর কাছে এত আতঙ্কের কারণ। মূলত নিম্নমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করা হলে তা কারো কাছে অতটা মাথাব্যাথার কারণ হয় না। কিন্তু এর মাত্রা যদি বাড়ানো হয় তা অবশ্যই বিশ্বের কাছে একটি ভয়াবহ আতঙ্কের খবর। কারণ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধকরণ করা হলে এ থেকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব। যদিও ইরান আগে থেকেই বলে আসছে এ ধরনের কোনো অভিপ্রায় তাদের নেই। কিন্তু তারপরও যদি এর ব্যত্যয় ঘটে তাহলে কী ঘটতে পারে। খুব স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে যদি কেউ ভেতরে ভেতরে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করার মানসিকতা পোষণ করে তাহলে এর চেয়ে ভয়াবহ কিছু আর হতে পারে না। পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত তেমন দিকে মোড় না নিলেও সে দিকে যাবে না এমন কেউ তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। সাধারণত বিদ্যুত্ উত্পাদন বা চিকিত্সা সংক্রান্ত কাজে এর সীমিত ব্যবহার হয়ে থাকে। কিন্তু অতিরিক্ত মাত্রায় ব্যবহার হলে তার কী হবে। ইরানকে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল তিন থেকে চার শতাংশ। আর পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে যে মাত্রার প্রয়োজন হয় তা হলো ৯০ শতাংশ বা তার বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যে হারে বাকবিতণ্ডা বর্তমানে চলছে তা থেকে তেহরান যদি তেমন কোনো মানসিকতা পোষণ করে থাকে তাহলে পরিস্থিতি কল্পনার চেয়েও ভয়ংকর হতে বাধ্য।
আসলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতো না যদি যুক্তরাষ্ট্র বেশি মাত্রায় তাদের নিয়ে না ঘাটাত। যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে এসে ইরানের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে থাকে। এর ফলে ইরানও তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসে অনেকটা শক্ত হতে থাকে। তারাও যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে পালটা জবাব দিতে থাকে। একপর্যায়ে তারা চুক্তি থেকে আংশিক সরে এসে ইউরেনিয়ামের মজুত বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। আর এরপর থেকেই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটে। অতি সম্প্রতি উপসাগরীয় এলাকায় মার্কিন সামরিক তত্পরতা দুই দেশের মধ্যে বেশিমাত্রায় উত্তেজনার সৃষ্টি করে।