রাহুলের পদত্যাগ
তালেব রানা
সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচনে বিপুল বিজয় পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি। অন্যদিকে বিরোধী দল কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছে। এ পরাজয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে ভারতের সবচেয়ে পুরোনো দলটি। নির্বাচনে এ ব্যর্থতার পর পদত্যাগের ঘোষণা দেন ভারতের প্রভাবশালী নেহরু-গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকারী কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি তাত্ক্ষণিক তার পদত্যাগের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। যদিও পদত্যাগের ব্যাপারে অনড় ছিলেন রাহুল। গত বুধবার কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন তিনি। সেদিনই পদত্যাগপত্রটি টুইটারে প্রকাশ করেন। চার পৃষ্ঠার চিঠিতে রাহুল গান্ধী বলেন, কংগ্রেসের হয়ে কাজ করতে পারাটা আমার জন্য সম্মানের। যে দলের মূল্যবোধ ও আদর্শ আমাদের সুন্দর দেশের জীবন রক্ষার শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এ দেশ ও দলের ভালোবাসার জন্য আমি ঋণী। কংগ্রেসের সভাপতি হওয়ায় নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য আমি দায়ী। দলের ভালো ভবিষ্যতের জন্য জবাবদিহিতা গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই সভাপতির পদ থেকে আমি পদত্যাগ করেছি। দল ঢেলে সাজাতে কঠিন সিদ্ধান্ত প্রয়োজন ছিল।
চিঠিতে তিনি আরো বলেন, বিজেপির প্রতি আমার কোনো বিদ্বেষ বা ক্ষোভ নেই। তবে আমার শরীরের প্রতিটি ‘সেল’ তাদের মতাদর্শের বিরোধিতা করে। লোকসভা নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়েও কথা বলেন তিনি। তার দাবি কংগ্রেস শুধু রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে লড়েনি বরং ভারত রাষ্ট্রের সমগ্র ‘মেশিনারি’র বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। তার মতে, ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরএসএসের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা পাওয়ায় ভারতের গণতন্ত্র মৌলিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ঐ দিনই সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাহুল গান্ধী বলেন, আমি আর কংগ্রেস সভাপতি নই। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির উচিত দ্রুত বৈঠক ডেকে নেতা নির্বাচন করা। আমি এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে চাই না। সেক্ষেত্রে জটিলতা বাড়বে। একইসঙ্গে তিনি গান্ধী পরিবারের বাইরের কাউকে সভাপতি করার আহ্বান জানিয়েছেন। রাহুলের এ সিদ্ধান্তে গান্ধী পরিবারের বাইরে থেকে তৃতীয়বারের মতো কেউ সভাপতি হতে পারেন।
মাত্র দেড় বছর আগে কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন তিনি। তার পদতাগের মধ্যদিয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় পর ফের কংগ্রেসের নেতৃত্ব যাচ্ছে গান্ধী পরিবারের বাইরে কোনো নেতার হাতে। এখন পর্যন্ত সভাপতি হিসেবে উঠে এসেছে দলের বর্ষীয়ান দুই নেতার নাম। একজন সুশীল কুমার শিন্দে এবং অন্যজন মল্লিকার্জুন খড়গে। মহারাষ্ট্রের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ৭৭ বছরের সুশীল কুমার শিন্দে দলের অন্যতম দলিত মুখ। অন্যদিকে মল্লিকার্জুন খড়গে গত লোকসভার বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব সামলেছেন দক্ষ হাতে। দক্ষিণের রাজ্য কর্নাটকের এ নেতাও দল এবং সংসদীয় রাজনীতিতে অভিজ্ঞ। এ দুই জনের পাশাপাশি অবশ্য বিবেচনায় আরো কয়েক জনের নাম রয়েছে। তবে দলের অনেকের দাবি সভাপতি যেন অপেক্ষাকৃত কম বয়সী হন। যাহোক কংগ্রেসের নতুন সভাপতি কে হচ্ছেন তা এক সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত হয়ে যাবে।
যদিও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পুরোপুরি গান্ধী পরিবারের ছায়া এড়িয়ে কংগ্রেসের পথ চলা কার্যত অসম্ভব। নতুন সভাপতি নির্বাচন সোনিয়া, রাহুল এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সম্মতি ছাড়া হওয়া সম্ভব নয়। যদিও রাহুলের পর সোনিয়া গান্ধীও জানিয়ে দিয়েছেন সভাপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় থাকবেন না তিনিও।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, রাজীব গান্ধী নিহত হওয়ার পর কংগ্রেসে নেতৃত্ব নিয়ে এক অদ্ভুত সংকট তৈরি হয়। সেই সময় দলের দায়িত্বভার নেওয়ার মতো গান্ধী পরিবারের কেউ ছিলেন না। সোনিয়া গান্ধী সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন না। রাহুল-প্রিয়াঙ্কা দুই জনেই অল্পবয়সী ছিলেন। সেই ইন্দিরা যুগের পর গান্ধী পরিবারের বাইরে থেকে পি ভি নরসিংহ রাওকে দলের সভাপতি করা হয়। পাঁচ বছর তিনি দায়িত্ব সামলানোর পর দায়িত্ব পান সীতারাম কেশরী। তিনি পদে ছিলেন এক বছর। ততদিনে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে যান সোনিয়া গান্ধী। ফলে আবারও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ আসে গান্ধী পরিবারেই। সভাপতি হন সোনিয়া গান্ধী। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত প্রায় দুই দশক তিনি দলের দায়িত্বে থাকার পর ছেলে রাহুল গান্ধীকে সভাপতি করেছিলেন। রাহুলের পদত্যাগের পর এ প্রথম গান্ধী পরিবারের তিন সদস্য রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পরও কংগ্রেসের নেতৃত্বে কেউ থাকছে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাহুলের সিদ্ধান্তে আবারও কংগ্রেসে ঝড় এসেছে। কোনো নির্বাচনে বা অন্য কোনো কারণে গান্ধী পরিবারের কেউ পদত্যাগ করেছেন এমন নজির কার্যত নেই বললেই চলে। যে কারণে রাহুলের পদত্যাগে অনেকটাই অপ্রস্তুত কংগ্রেস। এ অবস্থায় গান্ধী পরিবারের বাইরের কাউকে দলের দায়িত্ব দেওয়াটাও চ্যালেঞ্জের। আর নতুন নেতার ওপর গান্ধী পরিবারের ছায়া থাকবে না সেটাও এ মুহূর্তে বলা কঠিন। সর্বোপরি নতুন নেতা কংগ্রেসকে পুনর্জীবন এনে দিতে পারবে কি না সেটাই দেখার বিষয়। যে উদ্দেশ্যে সরে দাঁড়িয়েছেন রাহুল। নতুন সভাপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় থাকতে চান সোনিয়া গান্ধী। যাতে মনে না হয়, নতুন সভাপতি গান্ধী পরিবারের কাঠের পুতুল।