চলতি মাসের ১৭ ও ১৮ জুন পিয়ংইয়ং-এ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আলোচিত সফর উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। এই সফরে দুই রাষ্ট্রপ্রধান পারস্পরিক প্রতিরক্ষাধারাসহ একটি ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির বিবরণ অনুযায়ী এটাকে কৌশল বললে ভুল হবে। চুক্তিতে যথেষ্ট বিবরণের অভাবে ইতিমধ্যে এটার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার এই সম্পর্ককে একটি ‘জোট’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের বৈঠকে উঠে এসেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো মার্কিন মিত্র শুধু উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক শক্তিই নয়, মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে অস্ত্রচুক্তির জন্যও পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পারস্পরিক প্রতিরক্ষার আশ্বাস ও চীনের প্রভাব
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে উত্তর কোরিয়ার নেতার রাশিয়া সফরের পরিপ্রেক্ষিতে আবার নতুন করে কিম জং উনের সঙ্গে পুতিনের বৈঠকটি বেশ অপ্রত্যাশিত ছিল। এবার পিয়ংইয়ংয়ে কিম ও পুতিন কয়েক ঘণ্টা ধরে আলোচনা চালিয়ে যান। কিম ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রতি তার সমর্থন নিশ্চিত করেছেন এবং রাশিয়ার সমস্ত নীতির জন্য উত্তর কোরিয়ার নিঃশর্ত সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। উত্তর কোরিয়ার ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে পুতিন তার কিম জং উনকে রাশিয়ান অ্যাডমিরালের ড্যাগার, একটি চা সেট এবং একটি রাশিয়ান তৈরি ‘অরাস লিমোজিন’ গাড়ি উপহার দিয়েছেন।
ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার যোগাযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ পশ্চিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য কামান ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো প্রচুর পরিমাণে যুদ্ধাস্ত্রের প্রয়োজন। আর পিয়ংইয়ংয়ে পুতিনের জমকালো অভ্যর্থনা, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কের মাধ্যমে মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি নতুন বহুমুখী বৈশ্বিক ব্যবস্থা তৈরি করার প্রতিশ্রুতি এই ইঙ্গিত দেয় যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হবে এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত আরো লম্বা সময় ধরে চলবে।
উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্বের ধারণা নতুন কিছু নয়। এই চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যকার পূর্ববর্তী চুক্তিগুলোকে সম্ভবত নবায়ন করবে। পূর্বের চুক্তিগুলোর মধ্যে ১৯৬১ সালে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি ও ২০০০ সালে সংঘটিত আরেকটি চুক্তি উল্লেখযোগ্য। যদিও ওই চুক্তিগুলোয় উভয়ের মধ্যে কোনো নিরাপত্তার আশ্বাস ছিল না।
পুতিন ও কিমের বৈঠক শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরে প্রকাশিত উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার একটি বিবৃতি নিশ্চিত করেছে, পুতিন ও কিম একমত হয়েছেন যে, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া যদি কখনো অন্য কোনো রাষ্ট্রের আক্রমণের শিকার হয়, তাহলে তারা একে অপরকে সামরিক ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান করবেন। এটি একটি তাত্পর্যপূর্ণ চুক্তি যার রাজনৈতিক ও আদর্শিক মূল্যবোধ ছাড়াও বহুমুখী প্রভাব রয়েছে। মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যকার সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অসম হয়ে উঠলে তাদের শক্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে, যেমনটি স্নায়ুযুদ্ধের সময় হয়েছিল। যদিও আপাতদৃষ্টিতে এটাকে অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে, তবে এমন সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া উচিত হবে না।
রাশিয়া বা উত্তর কোরিয়া অন্য কোনো দেশের দ্বারা আক্রমণের ক্ষীণ সম্ভাবনার কারণে এই ধারাটি কখন প্রয়োগ করা হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারায় উল্লিখিত বিবৃতি অনুযায়ী তারা এখনও ‘আক্রমণের’ ধারণাকে সংজ্ঞায়িত করতে পারেনি। অবশ্য এটাও একটা উদ্বেগের কারণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মার্কিন মিত্রের যে কোনো ধরনের কর্মকাণ্ডকে তারা আক্রমণাত্মক মনে করে যুদ্ধ শুরু করে দিতে পারে। রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কের এমন উন্নতি বেপরোয়া হয়ে উঠবে কি না, তা নির্ভর করে চীনের ওপর। কারণ এখানে চীন আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
বেইজিং কিম জং উনের এই দাবিকে মাথায় রাখবে যে রাশিয়া উত্তর কোরিয়ার ‘সবচেয়ে একনিষ্ঠ বন্ধু’। মস্কো এবং পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে উন্নত সামরিক প্রযুক্তিতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও, চীন উত্তর কোরিয়ার বৃহত্তম অর্থনৈতিক অংশীদার রয়ে গেছে। ১৯৫৩ সালের কোরিয়ান যুদ্ধ যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষরকারীদের একজন হিসেবে চীন নিশ্চিত করতে চাইবে যে, তারা উত্তর কোরিয়ার বৈদেশিক নীতির ওপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। একই সময়ে চীন দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গ দৃঢ় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইবে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সিউলের নিরাপত্তা সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইবে। এই বছরের শেষের দিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং কিম জং উনের মধ্যে যে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে, সেটাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় জরুরি
বহু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া না গেলেও কিম-পুতিন বৈঠক এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া উভয়ই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের কঠোর বিরোধিতার বিপরীতে নিজেদের অবস্থান জাহির করতে চায়। তাদের কাজ ও কথার মাধ্যমে, পুতিন ও কিম জং উন এখন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, উভয় রাষ্ট্রেরই মার্কিন নেতৃত্বাধীন উদারনৈতিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অংশ হওয়ার ইচ্ছা নেই বললেই চলে। এছাড়া তারা সক্রিয়ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মার্কিন পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে চ্যালেঞ্জ করতে থাকবে। অর্থাত্ রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া কর্তৃক পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতা ও নিষেধাজ্ঞা-লঙ্ঘনমূলক আচরণ অব্যাহত থাকবে।
এই পদক্ষেপগুলো নিঃসন্দেহে দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য উদ্বেগের কারণ হবে, যারা রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইউক্রেনের সমর্থনে সামরিক সহায়তা প্রদানে এতদিন অনিচ্ছুক ছিল। এই বছরের মে মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওল জানিয়েছেন যে, সিউল মস্কোর সঙ্গে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। অবশ্য, পিয়ংইয়ং-এ ঘোষিত রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার নতুন ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ দক্ষিণ কোরিয়ার তার অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে প্ররোচিত করবে বলে মনে হচ্ছে।
এজন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তার উত্তর-পূর্ব এশিয়ার মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে আরো বেশি জরুরি। কিম-পুতিনের বৈঠকের উদ্দেশ্য থেকে বোঝা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের এখন একটি বহুমুখী সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। যার মধ্যে রয়েছে উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নকে রোধ করা। পাশাপাশি উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া অথবা ইরানের মতো অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যে অস্ত্র আদান-প্রদান ব্যাহত করা। আগামী মাসে ওয়াশিংটনে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন এইসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এক্ষেত্রে এই তিন দেশের নীতিনির্ধারকদের উচিত তাদের নিজ নিজ জোট শক্তিশালী করা এবং সমন্বিত হুমকির বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করার ব্যাপারে তাদের প্রতিশ্রুতি জোরদার করা।
লেখক: অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের প্রভাষক
চ্যাথাম হাউজ থেকে অনুবাদ: আব্দুল্লাহ আল মামুন