তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশের তাপমাত্রা গত ৫০ বছরে বেড়েছে। এর প্রধান কারণ ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন, কার্বন নির্গমন বৃদ্ধি এবং জলবায়ুর ওপর সমুদ্রের প্রভাব। দেশের ইতিহাসে গত ৫২ বছরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৩.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। এটি স্বাস্থ্য, কৃষি, পানিসম্পদ ও পরিবেশের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে হলে মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এছাড়া এর ফলে মানুষ ডিহাইড্রেশন, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হয়। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন-এসডোর গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর উইমেন’স ভলান্টারি অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউভিএ) অডিটোরিয়ামে এসংক্রান্ত গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘এসডো’। গবেষণার ফলাফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবগুলোকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, পূর্বাভাস অনুযায়ী যদি তাপমাত্রা বৃদ্ধির বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে। অনুমান অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে তা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে।
গবেষকেরা বলেন, বাংলাদেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে যে চারটি প্রধান কারণ দায়ী, সেগুলো হলো—বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান; জলবায়ুর পরিবর্তন; জীবাশ্ম জ্বালানি এবং শিল্পকারখানা থেকে কার্বন নির্গমন বৃদ্ধি, যা গ্রিনহাউজ গ্যাস বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এছাড়া এল নিনো ইভেন্টের মতো মহাসাগরীয় প্রভাব। এই কারণগুলো সম্মিলিতভাবে সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
মানুষের পরিবেশবিরোধী কার্যকলাপের কারণে দ্রুতগতিতে জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রতিদিন তাপপ্রবাহ বাড়ছে, যার ফলে পৃথিবী দ্রুত শীতল থেকে উষ্ণতর সময়ে রূপান্তরিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে এই পরিবর্তনের ফলে প্রায়ই তীব্র তাপপ্রবাহ হচ্ছে, যেখানে দৈনিক সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে, বিশেষ করে শীতকালে। যদি এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে উষ্ণ সময় মানবজাতির জন্য অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। যদিও আমরা এই প্রাকৃতিক অগ্রগতিকে থামাতে পারব না, কিন্তু আমরা বিশ্ব উষ্ণনায়নে অবদান রাখে এমন কার্যকলাপগুলো কমিয়ে এবং কার্যকর ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এর প্রভাব হ্রাস করা সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে পরিবেশবান্ধব কৃষি উৎপাদন ও নগর পরিকল্পনা করা এবং উচ্চ তাপমাত্রার হুমকি থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা। এই তীব্রতর অবস্থার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করতে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও তহবিল জরুরি।
গবেষণাটি বাংলাদেশে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা তুলে ধরেছে। ২০০০ সালের শুরু থেকে তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩৭.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রা অতিক্রম করেছে। পূর্ববর্তী তথ্যানুসারে, ১৯৯৪, ২০০৪ এবং ২০২৪ সালে চরম তাপপ্রবাহ বাংলাদেশে আঘাত হানে। এই প্যাটার্ন থেকে বোঝা যায় যে, এ ধরনের তীব্র তাপপ্রবাহের ঘটনা প্রায় প্রতি দশকে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এই প্রবণতা অনুসরণ করে অনুমান করা যায় যে, ২০৩৪ সালের দিকে আরেকটি চরম তাপপ্রবাহ ঘটতে পারে। যদিও জলবায়ু পরিবর্তন আগে থেকে অনুমান করা যায় না, তবে অনুমানটি আমাদের প্রস্তুতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা প্রদান করে।
গবেষণায় ১৯৭২ সাল থেকে তাপপ্রবাহের রেকর্ড সংগ্রহ করা হয়েছে, যা সেই সময় প্রায় ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল। বর্তমানে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে তা ৪৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে দাঁড়িয়েছে, যার কারণে এ বছর ১৫ জন মৃত্যুবরণ করে। ২০২৩ সালে তাপপ্রবাহের কারণে প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০৩০ সালে এই তাপপ্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে এবং বয়স্কদের মধ্যে তাপজনিত কারণে ২০৮০ সালের মধ্যে প্রতি লাখে ৩০ জনের মৃত্যু হতে পারে।
এসডোর চেয়ারপারসন ও সাবেক সচিব, সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ বলেন, এসডো পূর্ববর্তী তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই গবেষণা করেছে এবং যদি তাপপ্রবাহের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে ভবিষ্যতে তাপমাত্রা আমাদের জন্য অসহনীয় হবে। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর মাধ্যমে তাপপ্রবাহ কমানো সম্ভব এবং এই লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি নীতি বাস্তবায়ন করা জরুরি। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন এসডোর মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন ও এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা প্রমুখ।