অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে বন্যপ্রাণীর প্রজনন বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গাছ উজাড়, বন সংকোচন, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, অবাধে পর্যটক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যুতের আলো, নতুন বনায়ন না হওয়া, বন বেদখল হওয়া, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হ্রাস ও খাদ্যসংকট এসব নানা কারণে বন্যপ্রাণীর প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
লাউয়াছড়ার স্থানীয় বাসিন্দা ও বন কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১২৫০ হেক্টর আয়তনের এক টুকরো বনে উল্লুকসহ নানা কিছু বিরল প্রাণীর বাসস্থান রয়েছে। এছাড়া অজস্র সরসৃপও রয়েছে। এক যুগ পূর্বে লাউয়াছড়ায় ঘন বনজঙ্গল থাকলেও বর্তমানে নানা কারণে বন ফাঁকা হয়ে গেছে। বনের ভেতর দিয়ে রেলপথ, সড়কপথ ও বৈদ্যুতিক লাইনে পিষ্ট হয়ে নানা সময়ে বিরল প্রাণীরাও মারা যাচ্ছে। তাছাড়া বনটিকে কেন্দ্র করে অপরিকল্পিত স্থাপনাও গড়ে উঠছে।
তাদের মতে, বনের গাছগাছালি রক্ষা না পাওয়ায় সংকট আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। উদ্যানটির এক ধরনের বাণিজ্যিকিকরণের কাজ চলছে। উদ্যানের ভেতরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হচ্ছে। বন বিভাগেরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় বন্যপ্রাণীর অবাধ চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাছাড়া বন সংকোচন, গাছ উজাড়, অবাধে দলবদ্ধ পর্যটক, গ্যাস কোম্পানির কার্যক্রম, বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত, নতুন বনায়ন না হওয়া, বন বেদখল হওয়া, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হ্রাস ও খাদ্য সংকট, বনের ভূমিতে লেবু, আনারস বাগান, মাঝেমধ্যে বনের ভেতরে আগুন লাগা, বনের খালি জায়গায় নতুন বনায়ন না হওয়া, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকানপাটে জনসমাগম—সব মিলিয়ে বন্যপ্রাণীর প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে উদ্যানের চাউতলী, কালাছড়াসহ বিভিন্ন বিটে রয়েছে ঔষধিসহ নানা প্রজাতির শতবর্ষী গাছগাছালি ও সামাজিক বনায়ন। সামাজিক বনায়নের গাছ কর্তনের পাশাপাশি ঔষধিসহ নানা ধরনের গাছ কর্তনের ফলে জাতীয় উদ্যানে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, খাদ্যসংকট, পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাউয়াছড়ায় বন্যপ্রাণী খাবারের অভাবে ছুটোছুটি ও লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। বনের ভেতরে ফলের নতুন গাছ রোপণের তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। শতবর্ষী ফলের অনেক গাছগাছালিও নিশ্চিহ্ন হয়েছে। ফলে উল্লুক, চশমাপরা হনুমানসহ বিরল প্রজাতির প্রাণীদের খাদ্য ও বাসস্থান আরো হুমকিতে পড়ছে। উদ্যানের ভেতরে বহেরা, ডুমুর, হরীতকী, আমলকি, জারুল, রিঠা, ডেউয়া, লটকন, কাঠবাদাম, লুকলুকি, বনউরি, কাউফল, কাটা জামগাছের উপস্থিতি অনেকটা হ্রাস পেয়েছে।
মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির প্রধান হেডম্যান ও পরিবেশ কর্মী জিডিসন প্রধান সুচিয়ানসহ স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, বনের মধ্যে দোকানপাট সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে। অবাধে পর্যটকদের হাল্লা-চিত্কার, লাইটের আলো, রেল ও সড়কপথ, গাড়ির হর্ন, ট্রেনের শব্দ, বনের গাছগাছালি রক্ষা করতে না পারা, অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা লাউয়াছড়ায় বন্যপ্রাণীর প্রজনন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সভাপতি মনজুর আহমেদ আজাদ মান্না বলেন, বনের শতবর্ষী অনেক গাছ কর্তন হয়েছে। এছাড়া ঔষধি ও ফলের গাছও কর্তন হয়েছে। ফলে বন্যপ্রাণীর খাবারসংকট, আবাসস্থল বিলুপ্ত, প্রজননে বাধাগ্রস্ত ও বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।
এ ব্যাপারে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের লাউয়াছড়া বন রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সহিদুল ইসলাম বলেন, আগে একসময় লাউয়াছড়া উদ্যান থেকে গাছ উজাড় হয়েছে। এখন রোধ হয়েছে। নানা কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও কমে গেছে। তাছাড়া এই অভয়ারণ্যের মধ্যে দিয়ে রেল ও সড়কপথে গাড়ির নিচে কাটা পড়ে প্রাণী মারা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়েও বিরল প্রজাতির প্রাণী লেপার্ট মারা যায়। অধিক পর্যটকসহ এসব নানা কার্যক্রমে বন্যপ্রাণীর প্রজননগত সমস্যা হচ্ছে।