বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দুই-দুইটি বিশ্বযুদ্ধের ধকলে বিশ্ব অর্থনীতি অস্থির হইয়া উঠিয়াছিল। ইহার রেশ বহিয়া যায় পরবর্তী দশকগুলিতে। এমন একটি পরিস্থিতিতে বিশ্বের প্রধান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্ব ‘একটি চমত্কার অর্থনৈতিক অবস্থান’ সৃষ্টি করিতে সক্ষম হন বটে। বিশ্ববাসী ইহার সুফলও পাইয়াছিল হাতে হাতে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যের শিকল ভাঙিয়া বাহির হইয়া আসে। উপরন্তু বিভিন্ন জরিপে জানা যায়, ১৯৬১-২০১৯ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পায় তিন গুণের অধিক। এইভাবে ভালোই চলিতেছিল, তবে বর্তমান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ঘটনাগুলি এখন আর তেমন আশা জাগানিয়া নহে বলিয়াই প্রতীয়মান। বিশেষত, উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির অর্থনৈতিক অবনমন লক্ষ করিয়া হা-হুতাশ না করিয়া উপায় নাই! এইরূপ অবস্থার প্রেক্ষাপটে সেই সকল দেশকে স্বাভাবিকভাবেই উন্নত দেশগুলির দ্বারস্থ হইতে হইতেছে। ঠিক এমন একটি পটভূমিতে দাঁড়াইয়া ভাবিয়া দেখা দরকার, আর্থিক দুরবস্থায় নিপতিত দেশগুলি অর্থনীতির চাকা সচল রাখিবার ব্যাপারে ‘দূরদর্শী পন্থা’ অবলম্বন করিয়াছিল কি না।
একবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধবিগ্রহের বিশ্বে অনেক ক্ষুদ্র রাষ্ট্রও বহাল তবিয়তে আগাইয়া যাইতেছে। বলিতে হয়, তরতর করিয়া আগাইয়া যাইতেছে। এই সকল দেশের অর্থনীতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাহারা অভ্যন্তরীণ সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা করিবার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র আপস করে নাই। সকল ধরনের সম্পদ ‘জেনারেট’ করিবার বিষয়েই তাহাদের অধিক দৃষ্টি ছিল। ইহাই তো হওয়ার কথা। প্রতিটি দেশের হাতেই যে বিপুল পরিমাণ খনিজসম্পদ থাকিবে, তাহার তো কোনো গ্যারান্টি নাই। তবে সেই সকল দেশেও অবশ্যই কিছু না কিছু ‘সম্পদ’ থাকিবেই। ‘মানবসম্পদ’ একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হইতে পারে। অর্থাত্, যেই সকল দেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের ভিতর দিয়া যাইতেছে, সেই সকল দেশ এই সম্পদের সঠিক ব্যবহার করিয়া অর্থনীতির চাকা সচল রাখিতে পারে। পৃথিবীর এমন বহু দেশ রহিয়াছে, যাহারা বিদেশ হইতে কাঁচামাল আমদানি করিয়াও অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি বজায় রাখিতে সমর্থ হয়—যেমন জাপান। অর্থাত্, এই ক্ষেত্রে তাহাদের মূল লক্ষ্য হইল ‘জেনারেট করা’। কিন্তু যেই সকল দেশের হাতে তেল নাই, গ্যাস নাই—তাহারা যদি অপরিণামদর্শীভাবে হাজারে হাজারে কলকারখানা খুলিয়া বসে এবং একটি পর্যায়ে আসিয়া তাহা চালাইবার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতায় না থাকে, তাহা হইলে সেই দেশের অবস্থা কী হইতে পারে?
অনেক উন্নয়নশীল দেশে লক্ষ করা যায়, সেইখানে সকল ক্ষেত্রেই যেন ‘মিস ম্যানেজমেন্ট’। এই সকল দেশে আরেকটি মারাত্মক সমস্যা হইল, এই সকল দেশ অর্থনীতির চাইতে রাজনীতিকে ‘বড়’ করিয়া দেখে। ইহার ফল স্বভাবতই সুমিষ্ট হইবে না! অবস্থা এমন যে, সেই সকল দেশের নীতিনির্ধারক মহলকে হাতড়াইয়া বেড়াইতে হইতেছে, ‘কোনটি ফার্স্ট প্রায়োরিটি’। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার কারণেই যে এহেন অর্থনৈতিক অবস্থার সৃষ্টি, তাহা বেশ ভালোমতোই বুঝা যায়।
এই সকল দেশের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলি আরো ভালোভাবে সমাধান করা যাইত, যদি সরকারগুলি বিশ্ব অর্থনীতির ভাবধারা অনুসরণ করিতে সচেষ্ট হইত। আজিকার উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলি এখন আর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার বাহিরে নহে—ইহার কারণ অবশ্যই ‘গ্লোবালাইজেশন’। এই যুগের মূল সুর হইল তীব্র প্রতিযোগিতা, সকল ধরনের সম্পদ জেনারেট করাই যেইখানে আসল অস্ত্র। কিন্তু অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশ ভাগ্যোন্নয়নের সন্ধানে আর যাহাই করুক না কেন, নিজস্ব সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহার এবং এই সকল ক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনার প্রতি মনোনিবেশ করে নাই।
বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ত পরিবর্তনশীল। বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতির খাতিরে দেশগুলিকে অনেক কিছুই করিতে হয়। কিন্তু অনেক উন্নয়নশীল বিশ্ব এমন কর্মকাণ্ড করিয়া বসেন, সেই দরবেশের গল্পের সঙ্গে তুলনীয়। দরবেশ তাহার শিষ্য লইয়া এক দেশে উপস্থিত। দেখিলেন, সেই দেশে ঘি-তেল সকল কিছুর সমান মূল্য। তিনি শিষ্যকে বলিলেন, এই দেশে থাকা চলে না। কিন্তু শিষ্য রহিয়া গেল। সেখানে থাকিয়া খাইয়া মোটাতাজা হইল। একদিন এক বৃদ্ধা নিহত হইলেন। দেখা গেল যাহার দোষে বৃদ্ধা নিহত হইয়াছে, সে খুবই কৃশকায়। আদেশ হইল একজন মোটাতাজা ব্যক্তিকে শূলে চড়ানোর। রাজার সৈন্যরা ধরিয়া আনিল দরবেশের শিষ্যকে। এমন সময় দরবেশ ফিরিতেছিলেন। অবস্থা দেখিয়া তিনি রাজাকে কহিলেন, রাজা মশাই গণনা করিয়া দেখিয়াছি, অদ্য যিনি শূলে চড়িবেন, তাহার বংশসমেত স্বর্গ নিশ্চিত। রাজা বলিলেন, আমার শূলে আমি ছাড়া আর কে চড়িবে! উন্নয়নশীল বিশ্বের অবস্থা এই গল্পের সঙ্গেই মিলিয়া যায়।