ট্রাম্পের ইমিউনিটি সীমাহীন নয়

গত সোমবার মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্টের ইমিউনিটি সম্পর্কে ঘোষণা দেয়, ‘সাবেক প্রেসিডেন্টরা নির্দিষ্ট কিছু সরকারি কর্মকাণ্ডের জন্য অপরাধমূলক বিচারের সম্মুখীন হবেন না।’ অবশ্য এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিউ ইয়র্কে তার অপরাধের জন্য জবাবদিহির সময় পুনরায় বিলম্বিত করার জন্য একটি শেষ চেষ্টা চালান। ট্রাম্পের আইনজীবী বিচারক জুয়ান মেরচানকে ১১ জুলাইয়ের আগে তার নির্ধারিত সাজা বিলম্বিত করার অনুরোধ করেন। আমরা জর্জিয়ায়ও একই ঘটনা দেখতে পাব, যেখানে ট্রাম্প ইমিউনিটির ভিত্তিতে মামলা খারিজ করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের এই বক্তব্য ব্যবহার করবেন। অন্যদিকে ফাল্টন কাউন্টিতে ট্রাম্প তার বিরুদ্ধে নির্বাচনি হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ম্যানহাটনে ট্রাম্পের সাজা ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মুলতুবি রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিচারক মারচান, যাতে তিনি ৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে মতামত দিতে পারেন। তখন ট্রাম্পের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি অনেকটা নিশ্চিতভাবেই বলা যাবে। সুপ্রিম কোর্টের মতামত ২০১৬ সালের নির্বাচন ষড়যন্ত্র এবং সেগুলো গোপন রাখার চেষ্টা থেকে উদ্ভূত ট্রাম্পের ৩৪টি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত হওয়াকে প্রভাবিত করে না।

জর্জিয়ায় ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল পরিবর্তন করার ষড়যন্ত্রের জন্যও ট্রাম্পকে জবাবদিহির মুখোমুখি হওয়া থেকে এই রায় বাঁচাতে পারবে না। উভয় ক্ষেত্রেই তার প্রচারণার সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযুক্ত কার্যকলাপ সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক এবং স্পষ্টভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিক আচরণ, যা প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার সরকারি দায়িত্বের মূল অংশের মধ্যে নয়। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের মতে, ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক কার্যকলাপের জন্য কোনো ধরনের ইমিউনিটি নেই।’

ম্যানহাটন মামলা দিয়ে শুরু করা যাক। একজন নাগরিক হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বেআইনিভাবে হস্তক্ষেপ করার ষড়যন্ত্র করা এবং তারপর তা গোপন করার জন্য ব্যাবসায়িক রেকর্ড জাল করা মোটেও প্রেসিডেন্টের সরকারি দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত নয়। এছাড়া তিনি ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট ছিলেন, যখন স্টর্মি ড্যানিয়েলসকে টাকা প্রদান করার জন্য তার ব্যক্তিগত আইনজীবীকে অর্থ দিয়েছিলেন। ট্রাম্প অর্গানাইজেশন কর্তৃক ব্যাবসায়িক রেকর্ড জাল করা অবশ্যই তার প্রেসিডেন্টের দায়িত্বের অংশ ছিল না। তার এই ব্যক্তিগত কাজ কোনোভাবেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারা নির্দেশিত আনুষ্ঠানিক কাজের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়।

ট্রাম্প এসব ভালোভাবেই জানেন। তার পরও তিনি প্রেসিডেন্টের ইমিউনিটির ভিত্তিতে তার নিউ ইয়র্কের অপরাধমূলক মামলা ভিত্তিহীন প্রমাণ করার জন্য যুক্তি প্রদানের চেষ্টা করেছেন। যদিও ফেডারেল ও নিউ ইয়র্ক উভয় আদালতই তার যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে।

প্রথমে তিনি ফেডারেল আদালতে তার মামলাটি স্থানান্তর করার চেষ্টা করেছিলেন, যখন তিনি প্রেসিডেন্ট ইমিউনিটির দাবি করেছিলেন। ফেডারেল আদালত ট্রাম্পকে অপরাধমূলকভাবে দায়িত্বমুক্ত ঘোষণা করেনি। কারণ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা প্রচারণা দুর্নীতি এবং সেগুলো গোপন করার চেষ্টা সম্পূর্ণরূপে তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কার্যকলাপের অংশ ছিল। মার্কিন জেলা বিচারক আলভিন হেলারস্টেইন বলেছেন, ‘একজন পর্ন তারকাকে অর্থ প্রদান করা প্রেসিডেন্টের অফিশিয়াল কাজের অংশ হতে পারে না।’ তা সত্ত্বেও আদালত তখন ট্রাম্পকে আপিল করার সুযোগ দিয়েছিল, কিন্তু ট্রাম্প তা করেননি। তাই আইন অনুযায়ী এখন তিনি আপিলের নাম করে সময় নষ্ট করতে পারবেন না।

ফেডারেল আদালতে তার পরাজয়ের পরেও, ট্রাম্প স্টেট আদালতে বলেছিলেন যে প্রেসিডেন্টের ইমিউনিটি তাকে বিচার থেকে রক্ষা করেছে। ফেডারেল আদালতের মতো বিচারপতি মারচান ট্রাম্পের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, স্টেট কোর্টে আপিলের জন্য তাকে যে সময় দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে তিনি আপিল করতে পারেননি। তাই গত সোমবার বিচারপতি মারচানের কাছে পাঠানো ট্রাম্পের চিঠি গ্রহণযোগ্য নয়।

২০১৮ সালে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আর্থিক লেনদেন, যা তার সাবেক আইনজীবী মাইকেল কোহেনের মাধ্যমে সম্পাদন করা হয়েছিল, সেটা প্রেসিডেন্টের অফিশিয়াল কাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সুপ্রিম কোর্টের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কাজকে অফিশিয়াল কাজ হিসেবে জনসম্মুখে প্রদর্শন করা বেআইনি। এবং এ ধরনের কাজের জন্য তিনি প্রেসিডেন্টের ইমিউনিটি ব্যবহার করতে পারবেন না।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ট্রাম্পের বিভিন্ন টুইট উপস্থাপন করেছেন, যার অধিকাংশই ব্যক্তিগত, আনুষ্ঠানিক নয়। প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ট্রাম্পের অনেক টুইট তার ব্যক্তিগত আইনজীবী কোহেনের সঙ্গে চুক্তি সম্পর্কিত ছিল। যেমন—কোহেনের কার্যক্ষমতা, ড্যানিয়েলসকে দেওয়ার জন্য কোহেনকে অর্থ প্রদান করা এবং এ ব্যাপারে চুক্তি নিয়ে আলোচনা করা ইত্যাদি। এ ধরনের টুইট স্পষ্টভাবে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, তাই সেগুলোকে প্রেসিডেন্টের অফিশিয়াল কাজ বলে প্রচার করার দাবি একদম ভিত্তিহীন।

এক্ষেত্রে ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে তার সাবেক নির্বাহী সহকারী ম্যাডেলিন ওয়েস্টারহাউট ও যোগাযোগ পরিচালক হোপ হিক্সকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করার দাবি করতে পারেন। কিন্তু তাদের সাক্ষ্য আবার ট্রাম্পের অফিশিয়াল কাজের ওপর ব্যক্তিগত নয়, বরং তার ব্যক্তিগত কাজের, যার মধ্যে ছিল কোহেনকে অর্থ প্রদান করার প্রক্রিয়া এবং কোহেনের সঙ্গে চুক্তি গোপন রাখার মতো বিষয়। ট্রাম্প এমন কোনো সাক্ষী জোগাড় করতে পারেননি, যারা জুরির সামনে প্রমাণ করবে তার কার্যকলাপ প্রেসিডেন্টের অফিশিয়াল কাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

জর্জিয়ায় নির্বাচনি ফলাফলে হস্তক্ষেপের চেষ্টার জন্য তার কেমন শাস্তি হবে? এখানেও যদি তিনি এই কাজকে প্রেসিডেন্টের অফিশিয়াল কাজ বলে প্রচারের চেষ্টা করেন, তাহলে তিনি বিপদে পড়বেন।

একটি মিনি ট্রায়াল হিসেবে ওয়াশিংটন ডিসিতে ২০২০ সালের নির্বাচনি ফলাফলে হস্তক্ষেপের চেষ্টা যেকোনো ফেডারেল কোর্টে আন-অফিশিয়াল কাজ বলেই প্রমাণিত হবে। বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেট বলেছেন, ‘আইনসভার ওপর বা তাদের নেতৃত্বের ওপর প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নেই। যদিও ট্রাম্প যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করবেন যে তিনি শুধু একটি ফেডারেল নির্বাচনের অখণ্ডতা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হিসেবে যে কাজ করার ক্ষমতা তার নেই, সেই কাজ করার জন্য তাকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। ফেডারেল আদালত ইতিমধ্যে রায় দিয়েছে, জর্জিয়ায় তার বিরুদ্ধে যে কাজের অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেটা রাজনৈতিক, অফিশিয়াল নয়।

ম্যানহাটনে তার ৩৪টি অপরাধমূলক কাজের জন্য দোষী সাব্যস্ত হওয়া বা জর্জিয়ায় নির্বাচনি ফলাফলে হস্তক্ষেপের মামলায় ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের ইমিউনিটি ব্যবহার করতে পারবেন না। এবং উভয় স্থানেই সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক মতামতের ওপর ভিত্তি করে তার ইমিউনিটি পাওয়ার প্রচেষ্টা নিশ্চিতভাবে ব্যর্থ হবে।

নিউ ইয়র্ক শহরে বিচারপতি মারচান সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ট্রাম্পের মামলা মুলতুবি রেখেছেন—এটা শুনে অনেকে হতাশ হতে পারেন। আমি তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, আপনারা হতাশ হবেন না। মহামান্য বিচারক তার স্বাভাবিক পদ্ধতি অনুসরণ করে তার বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সেপ্টেম্বরে আদালত রায় দেওয়ার পর স্টেট আদালত থেকে আপিল পর্যালোচনার জন্য দুটি স্তর থাকবে। আর সেখানে বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস, স্যামুয়েল আলিটো ও তাদের সহকর্মীরা ট্রাম্পের ভিত্তিহীন যুক্তির বিপক্ষে রায় দেবেন বলে আমরা আশা করি। আর ২০২৫ সালের আগে কোনোভাবেই এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া সম্ভব নয়।

লেখক: সিএনএনের আইনি বিশ্লেষক

সিএনএন থেকে অনুবাদ: আব্দুল্লাহ আল মামুন