দাবার আঙ্গিনায় জিয়ার শেষ বিদায়

আহারে জীবন। কত ঠুনকো জীবন। এক নিমিষেই শেষ হয়ে যায়। এক দিন আগেও যে মানুষটি নিজ পায়ে হেঁটে সিঁড়ি ভেঙে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পুরোনো বিল্ডিংয়ের দাবা কক্ষে উঠেছিলেন, জাতীয় দাবা চ্যাম্পিয়নশিপের ১২তম রাউন্ডে খেলবেন বলেন। সেই কিংবদন্তি দাবাড়ু গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমান জিয়া গিয়েছেন লাশের গাড়িতে। অন্যরা তাকে কাঁধে করে মাটিতে রাখেন।

শেষ শ্রদ্ধা জানাতে জিয়ার মরদেহ আনা হয়েছিল ক্রীড়াঙ্গনে। অনেকেই ছুটে এসেছিলেন দেশের দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টারকে শ্রদ্ধা জানাতে। দাবার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নারী-পুরুষ সবাই ব্যথিত। কারও মুখে কথা ছিল না। চোখে পানি ভাসছিল। মাইকে জিয়া সম্পর্কে বলা হচ্ছে। আর তিনতলার বারান্দায় নারীরা দাঁড়িয়ে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কেউ বলছিলেন, ‘আহারে জীবন। কত ঠুনকো জীবন। এক নিমিষেই শেষ হয়ে যায়। প্রদীপ নিভতেও সময় লাগে, জীবনের প্রদীপ নিভে যায় চোখের পলকে। দাবার এমন একটা মানুষ চলে গেলেন যার খারাপ কিছু দেখেননি কেউ। নীরবে চলতেন, কথা এদমই কম বলতেন। আপনি যেটাই বলুন জিয়া হাসি মুখে জি জি জি—বলেই শেষ করতেন।  

কোনো অভাব অভিযোগ ছিল না। কী পেলাম আর কী পেলাম না তা নিয়ে একটা শব্দও বলত না। দিলেও আছি, না দিলেও আছি। এমন একটা মানুষের চলে যাওয়া নিয়ে কষ্ট পেয়েছেন ক্রীড়াঙ্গনের মানুষ। মায়ের মৃত্যুর কারণে দাবা থেকে দূরেই সরে গিয়েছিলেন গ্র্যান্ডমাস্টার আব্দুল্লাহ আল রাকিব। ২০২১ সালে তার সঙ্গে জিয়ার শেষ দেখা হয়েছিল। পরশু রাতে জিয়ার মৃত্যুর খবরে ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন আব্দুল্লাহ আল রাকিব। বললেন, ‘জিয়া ভাই খুব স্ট্রংলি দেশকে রিপ্রেজেন্ট করেছেন। অসাধারণ মানুষ তিনি। উনার হাসি, আমরা কোনো দিন ভুলতে পারব না। এটা হচ্ছে উনার মনের বহিঃপ্রকাশ। জিয়া ভাইয়ের সরলতা ঝরনার মতো। জিয়া ভাই তার জীবনের প্রত্যেকটা সেকেন্ড দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ব্যয় করেছেন। দাবার জগতে আমার দেখা বাংলাদেশের বেস্ট পারফরমার। মানুষ হিসেবে, দাবা প্লেয়ার হিসেবেও। এরকম স্পোর্টস পারসন খুব কম হয়। তার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার ছিল। খুব শৃঙ্খল একজন মানুষ ছিলেন তিনি।’

১৪ বার জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি ঘরে তুলেছেন জিয়া। সাফল্য আরও আছে। দাবা খেলাটাকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন জিয়া। যে কোনো ধরনের টুর্নামেন্ট হোক তিনি অংশগ্রহণ করতেন। নিজে খেলতেন, খেলা শেখাতেন। দেশের খেলোয়াড়দেরও শিখিয়েছেন। ভারতের অনেক দাবাড়ু তার কাছে খেলা শিখেছেন। ঢাকায় এসে জিয়ার বাসায় অবস্থান করেও দাবা শিখেছেন। গ্র্যান্ডমাস্টার হয়েছেন জিয়ার কাছে খেলায় উন্নতি করে। জিয়া দাবা ছাড়া অন্য কিছু করতেন না। তার স্ত্রী খুব মেধাবী শিক্ষার্থী লাবণ্য, বিসিএস না দিয়ে জিয়ার পাশে পাশে থাকতেন। সব সময় একসঙ্গে চলাফেরা করতেন। একমাত্র পুত্র তাহসিন তাজওয়ার জিয়াকে নিয়েই ছিল তাদের সংসার। মৃত্যুর সময়ও স্ত্রী সঙ্গে ছিলেন, ছেলে পাশের বোর্ডে খেলছিলেন।

শনিবার শেষ শ্রদ্ধা জানানোর অনুষ্ঠানে ভিড়ের মধ্যে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেক গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হোসেন রাজিব। গত শুক্রবার বিকালে জাতীয় দাবা চ্যাম্পিয়নশিপের ১২তম রাউন্ডে জিয়া শেষ খেলাটি রাজিবের বিপক্ষে খেলছিলেন। খেলতে খেলতে রাজিবের চোখের সামনেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন জিয়া। দুুজনের মধ্যে জিয়ার সঙ্গে রাজিবের কাকতালীয় ঘটনাই ঘটেছে। ১৯৯৫ সালে রাজিব দাবায় প্রথম গেম খেলেছিলেন জিয়ার সঙ্গে। আর জিয়ার মৃত্যুর আগেও জিয়ার শেষ ম্যাচের প্রতিপক্ষ ছিলেন রাজিব। তার সঙ্গে কত স্মৃতির কথা মনে পড়ছে রাজিবের। নানা জনের মুখে নানা কথা চলছে। ততক্ষণে জিয়ার নামাজে জানাজা শেষ।

সবাইকে মরদেহ শেষ দেখার জন্য সাদা কাপড়ে পেঁচানো জিয়ার মুখটা খুলে দেওয়া হয়। কড়া রোদের আলো পড়ছিল নিথর মুখে। চোখের পানি পড়ছিল দাবার মানুষদের। জিয়ার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মোহাম্মদপুরে মোহাম্মদী হাউজিং সোসাইটির মসজিদে দ্বিতীয় জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর  মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডস্থ কবর স্থানে তার পিতা মরহুম পয়গামউদ্দিন আহমেদের কবরে তাকে সমাধিস্থ করা হয়, এ সময় গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমানের পুত্র তাহসিন তাজওয়ার জিয়া, গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়ার দুই ভাই, দেশের দুই গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোরশেদ ও রিফাত বিন সাত্তারসহ দাবাড়ু, বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের কর্মকর্তাবৃন্দ, দাবা বিচারক ও দাবা সংগঠকবৃন্দসহ তার আত্মীয়স্বজন উপস্থিত ছিলেন।     

শোক জানিয়েছেন যারা

গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমান জিয়ার মৃত্যুর খবর পেয়ে শুক্রবার রাতে ক্রীড়ামন্ত্রী নাজমুল হাসান পাপন জিয়ার মোহাম্মদপুরস্থ মোহাম্মদী হাউজিংয়ের বাসায় গিয়েছিলেন পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে। তার মন্ত্রণালয় জিয়ার পরিবারের জন্য কিছু করবে বলে জানিয়েছেন পাপন। গতকাল জিয়ার প্রথম নামাজে জানাজার আগে শেষ শ্রদ্ধা জানায় বিওএর মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজা, উপ মহাসচিব ও আশিকুর রহমান মিকু, দাবা ফেডারেশনের দুই সহ সভাপতি তরফদার মো. রুহুল আমিন ও কে এম শহিদউল্যা, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শাহাব উদ্দিন শামীম, দুই যুগ্ম সম্পাদক ড. শোয়েব রিয়াজ আলম ও মাসুদুর রহমান মল্লিক, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. শামীমুল হক,  হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান কোহিনুর, ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর হোসেন, অ্যাথলেটিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রকির (মন্টু), বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর উপ মহাপরিচালক (প্রশিক্ষক) মো. জিয়াউল হাসান, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. তৈয়বুর রহমান, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর পরিচালক (ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক) দেওয়ান মাতুলুবুর রহমান, অ্যাসোসিয়েশন অব চেস প্লেয়ারস সভাপতি মো. মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মো. শওকত বিন ওসমান শাওন, বিভিন্ন ফেডারেশন, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন হতে জিয়ার কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে।

আগামী ১২ জুলাই শুক্রবার বাদ জুমা গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমানের মোহাম্মদী হাউজিং সোসাইটির ১০ নম্বর রোডস্থ ৫ নম্বর বাড়ির লেবেল-৫ এ মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনার জন্য দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। সকলকে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে অংশ নিয়ে গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমানের রুহের মাগফেরাত কামনার জন্য দোয়া করতে অনুরোধ করা হয়েছে। 

মনন তার শিরোপা উত্সর্গ করলেন জিয়াকে 

মনন তার শিরোপা জিয়াকে উৎসর্গ করেছেন। ৪৮তম দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে নৌবাহিনীর ফিদে মাস্টার মনন রেজা নীড় অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ১৩ খেলায় ১০ পয়েন্ট নিয়ে শিরোপা জয় করেন মনন। আনসারে খেলা গ্র্যান্ড মাস্টার জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর কারণে আগামী সোমবার পর্যন্ত জাতীয় দাবা স্থগিত থাকলেও শ্রীলঙ্কার কলোম্বো শহরে ওয়েস্টার্ন এশিয়ান ইয়ুথ দাবায় অংশগ্রহণের কারণে ৭ জুলাই রবিবার শ্রীলঙ্কা যাবেন বিধায় ফিদে মাস্টার মনন রেজা নীড়ের শেষ রাউন্ডের অমিত বিক্রম রায়ের সঙ্গে খেলাটি গতকাল বিকালে অনুষ্ঠিত হয়। খেলাটিতে ফিদে মাস্টার মনন রেজা নীড় অমিত বিক্রম রায়ের সঙ্গে ৬ চালে ড্র করে শিরোপা জয় নিশ্চিত করেন।