মানুষের জীবনে সমস্যা থাকিবেই। সমস্যা থাকিলে তাহার সমাধানেরও প্রচেষ্টা থাকিতে হইবে; কিন্তু সমস্যা লইয়া বসিয়া থাকিলে কিংবা এই ব্যাপারে উদাসীনতা প্রদর্শন করিলে সমস্যা আরো জটিল আকার ধারণ করিবে, ইহাই স্বাভাবিক। মানুষের জীবনের ন্যায় সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সমস্যা রহিয়াছে; কিন্তু সমস্যা হইতে পলায়নপর মনোভব সুখকর হইতে পারে না। কথায় বলে মুশকিলে আসান। অর্থাৎ সমস্যা থাকিলে তাহার সমাধানও নিশ্চয়ই রহিয়াছে। তাই ছোট হউক আর বড় হউক, কোনো সমস্যা দেখা দিলে তাহা মোকাবিলায় আগাইয়া আসিতে হইবে। সেই সমস্যার গভীরে প্রবেশ করিতে পারিলে একটা না একটা সমাধান যে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। উন্নত দেশগুলিতে দেখা যায়, সমস্যা যতই জটিল ও বড় হউক না কেন, ইহার সমাধানের প্রচেষ্টা থাকে অব্যাহতভাবে। এই জন্য জাতীয় সমস্যায় দলমতনির্বিশেষে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হইতে দেখা যায়।
বিশ্বমহামারি করোনার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় জাতীয় নেতাদের কথামতো সাধারণ জনগণকেও আমরা দেখিয়াছি যথাসাধ্য কৃচ্ছ সাধন করিতে; কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলিতে দেখা যায়, ইহার বিপরীত চিত্র। সেখানে জাতীয় বড় বড় সমস্যাকেও থোড়াই কেয়ার করা হয়। এখানকার ক্ষমতাসীনদের এত সময় কোথায় যে, তাহারা ইহা লইয়া গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করিবেন। তাহারা ব্যক্তিগত, দলীয় বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ লইয়া এতটাই ব্যস্ত এবং ক্ষমতার মদমত্ততায় মোহগ্রস্ত যে, নিজ দায়িত্বের কথা অনেক সময় বেমালুম ভুলিয়া যান। তাহারা সর্বদা এমন পরিবেশ ও মেজাজে থাকেন যে, সাধারণ জনগণের বড় সমস্যাকেও অনেক সময় তাহারা সমস্যাই মনে করেন না।
কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার লিখিয়াছেন, ‘চিরসুখীজন ভ্রমে কি কখন/ ব্যথিতবেদন বুঝিতে পারে?/ কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে/ কভু আশীবিষে দংশেনি যারে।’ রাসেলস ভাইপারের দংশনের কী ব্যথা, তাহা যাহারা ইহার শিকার হইয়াছেন, তাহারাই কেবল ভালো বলিতে পারিবেন। অনুরূপভাবে কলকারখানা ও ব্যবসায়-বাণিজ্যের কী অবস্থা, উদ্যোক্তাদের ঈশানকোণে কত অশ্রুজল, যাহারা দিনে আনেন দিনে খান, বাজারে গেলে তাহাদের কী করুণ দশা, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত চিকিত্সা, শিক্ষা, আইন-আদালত হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত যেই সকল সমস্যার মুখোমুখি হইতেছেন, তাহাদের কী দুর্দশা তাহা কেবল তাহারাই ভালো জানেন। যেহেতু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের অর্থকড়ির অভাব নাই, তাহাদের কেহ কেহ লক্ষ লক্ষ, এমনকি মিলিয়ন মিলিয়ন অর্থবিত্তের মালিক, তাই এই শ্রেণির জনগণের দুঃখ-বেদনা সহজে তাহাদের হূদয় স্পর্শ করে না। বড় ধরনের অঘটন বা বিক্ষোভ-প্রতিবাদ না হইলে তাহা তাহাদের কর্ণকুহরেও প্রবেশ করে না। কেননা তাহারা তো দিব্যি আছেন রাজার হালে। প্রজাদের সমস্যার কথা শুনিবার সময় ও ধৈর্য কোথায়?
এই সকল দেশে লুম্পেন অর্থনীতি বিরাজমান। স্বাধীনতা লাভের এত বত্সর পরেও বৈধ-অবৈধ উপায়ে পুঁজি গঠনের প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয় নাই। এই জন্য নানা অবিচার, অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতির অন্ত নাই। তাহার পরও এই সকল দেশে উন্নয়নের বুলি থামিয়া নাই। মাঝেমধ্যে এমন সকল সাফল্যের কথাও জানা যায়, যাহা দেখিয়া বিশ্ববাসী বিস্মিত হইয়া পড়ে; কিন্তু দিন শেষে ইহাকে লিপিস্টিক ইকোনমি ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। আমাদের সমাজে এমন ব্যক্তিও রহিয়াছেন, ভিতরে শত দুঃখ-যন্ত্রণা ও অভাব-অনটন থাকিবার পরও তাহারা সাজসজ্জা ও বেশভূষায় কেতাদুরস্ত থাকিতে চান। বিউটি বা জেন্টস পার্লারে যাইয়া নিয়মিত মেকআপ করেন, যাহাতে তাহাদের মুখ উজ্জ্বল দেখায়। অথচ হয়তো তাহাদের অনেকের পেটে ভাত নাই। তাহাদের ছেলে-সন্তানরা ঠিকমতো পড়াশুনা করে না; কিংবা পড়াশুনা শেষ করিলেও তাহারা এখানে সেখানে বেকার ঘুরিয়া বেড়ায়। তাহাদের এই ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হইলে তাহার প্রত্যুত্তরে তাহারা পালটা প্রশ্ন ছুড়িয়া দিয়া বলেন যে, লেখাপড়া করিয়া কী লাভ হইবে? ভালোভাবে পড়াশুনা করিলেই কি চাকুরি পাইবার নিশ্চয়তা রহিয়াছে? তাহাদের শত বঞ্চনা, হতাশা ও দুঃখগাথাকেও পাত্তা দেওয়া হয় না। অথচ তাহারাই হইলেন আগামীর ভবিষ্যত্ এবং দেশ ও জাতির কর্ণধার।
উন্নয়নশীল দেশগুলিতে হাজারো সমস্যা বিদ্যমান। বিভিন্ন সমস্যার জট পাকিয়া উঠিতেছে ক্রমশ; কিন্তু এই জন্য সঠিক ব্যবস্থাপনা গড়িয়া উঠিতেছে না। গুরুত্বপূর্ণ সমস্যারও সমাধান হইতেছে না! ফলে এই সকল দেশ যেই তিমিরে ছিল, সেইখানেই রহিয়া যাইতেছে। অতএব, এই ব্যাপারে সেই সকল দেশের নেতাদের যত শিগিগর সঠিক বোধোদয় হয়, ততই মঙ্গল।