তৃতীয় বিশ্বের কোনো কোনো দেশ আজ পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হইয়াছে বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। অনেক দুঃখ ও হতাশার বিষয় এই যে, বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে এই সকল দেশ স্বাধীনতা লাভ করিলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এখন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে শক্তিশালী হইয়া উঠিয়াছে। প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বৃদ্ধি পাইয়াছে তাহাদের দাপট ও দৌরাত্ম্য। তাহাদের মনে রাখা উচিত ‘এক মাঘে শীত যায় না’।
যেই পুলিশের শক্তিতে আজ তাহারা বলীয়ান হইয়া অত্যাচার-নির্যাতন চালাইতেছে, এমন পরিস্থিতি একদিন তাহাদের জন্য যে বুমেরাং হইবে না তাহার নিশ্চয়তা নাই। তাহাদের কারণে তৃণমূল পর্যায়ে বসবাস করাই কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। তাহারা যেইভাবে মিথ্যা, সাজানো ও ভিত্তিহীন মামলা দিয়া নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি করিতেছে, তাহা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। কী তাহাদের অভিযোগ? তাহারা এই বলিয়াও মামলা দায়ের করিতেছে যে, জাতির পিতা ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি ভাঙিয়া ফেলা হইয়াছে কিংবা বিরোধী নেতার বাসায় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা হইয়াছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের উপরমহল পর্যন্ত কোনো কমনসেন্স আছে বলিয়া প্রতীয়মান হয় না। তাহারা ইহা একবারও গভীরভাবে তদন্ত করিয়া দেখিবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। যাহারা সরকারের সহিত থাকিয়া এই সকল অপকর্ম করিতেছে, তাহারা প্রশাসনকে অর্থকড়ি দিয়া এমনভাবে বশংবদ করিয়া ফেলিয়াছে যে, তাহারা এখন তাহাদের কথামতোই হুকুম তামিল করিতেছে। অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করিতেছে। ইহার চাইতে দুঃখজনক আর কী হইতে পারে?
অথচ যেই ছবি ভাঙচুরের কথা বলা হইতেছে, সেই ছবি তাহাদের অফিসের নহে। ঘটনাস্থল সঠিকভাবে তদন্ত ও বিশ্লেষণ করিলে দেখা যাইবে, সেইখানে অন্য ছবি ছিল। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেইখানে জাতির পিতা ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি প্রতিস্থাপন করা হইয়াছে। তাহা ছাড়া স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি কি এই কাজ করিতে পারে? তাহারা কি এতটাই উন্মাদ হইয়া পড়িয়াছেন? ইহা কি হাস্যকর বিষয় নহে? তাই যাহারা এই সকল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দান করিতেছেন, কাজটা কি তাহারা ভালো করিতেছেন? কে না জানেন যে, তাহারা মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট লইয়াছেন জাল-জালিয়াতি করিয়া। স্বাধীনতা লাভের অর্ধশত বত্সর পার হইয়া গেলেও নকল যোদ্ধা ও তাহাদের সমর্থকরা কি নাই? মুক্তিযোদ্ধাদের একাধিক তালিকার কথা কি কাহারও অজানা? সেই তালিকায় কি হাজারটা অসংগতি নাই? তাহারা সরকারি দল করিলেও একটা কথা ছিল। প্রকৃতপক্ষে তাহারা তো অনুপ্রবেশকারী ও বর্ণচোরা। তাহারা মাদক ব্যবসায়সহ এমন কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নাই, যাহা করিতেছে না। অথচ মুক্তিযোদ্ধা সাজিয়া ও তাহার সার্টিফিকেট লইয়া সমাজে দিব্যি ঘুরিয়া বেড়াইতেছে!
এমতাবস্থায় প্রশ্ন, কোন পথে যাইতেছে এই সকল দেশের মানুষ? এমন দেশে চুরিচামারি করিয়া পয়সা বানানো এবং তাহা রাজনীতিতে খরচ করিয়া প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জন করাই যেন এখন অনেকের ধ্যানজ্ঞান হইয়া উঠিয়াছে। যাহারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে কাজ না করিয়াই বিল উঠাইয়া লয়। এই সকল বন্ধ করিতে না পারিলে দেশ অবশ্যই বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হইবে। তাহাদের নিয়ন্ত্রণ না করিয়া বল্গাহীন ছাড়িয়া দেওয়ার পরিণাম কখনোই শুভ হইতে পারে না। এমন অন্যায়, অনিয়ম ও অবিচার কোনো দেশেই দীর্ঘদিন ধরিয়া চলিতে পারে না। পৃথিবী পরিবর্তনশীল। তাই এই দুঃসহ ও দমবন্ধ করা পরিস্থিতিরও একদিন অবসান হইবেই।
প্রতিরোধ যে একেবারেই হইতেছে না তাহাও নহে। নানা অন্যায়-অবিচারের পরিপ্রেক্ষিতে এই সকল দেশে বিক্ষোভ এমনকি খুনখারাবি লাগিয়াই রহিয়াছে। ইহাতে যাহারা ক্ষমতায় আছেন তাহারা অস্বস্তিবোধ করিলে কী হইবে? তাহারা দুষ্কৃতকারী ও অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করিয়া বরং তাহাদের পক্ষাবলম্বন করিতেছেন। তাহাদের আরো উসকাইয়া দিতেছেন। এই পরিস্থিতিতে তাহাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ রুখিয়া দাঁড়াইবেই। ইহা সময়ের ব্যাপার মাত্র। কেননা আল্লাহ তায়ালা সীমা লঙ্ঘনকারীদের মোটেও পছন্দ করেন না। যাহাদের বয়স হইয়াছে তাহারা দেখিয়া আসিতেছেন, এই সকল অপশক্তির শেষ পরিণতি কেমন হয়। অতএব, যাহারা ক্ষমতায় রহিয়াছেন, তাহাদের এই বিষয়টি গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিতে হইবে।