একদিকে শিক্ষকদের প্রত্যয় স্কিম ইস্যুতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি, কর্মকর্তারাও অনির্দিষ্টকালের জন্য যাচ্ছেন না অফিসে। আবার অন্যদিকে রাজপথে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কেউই নিজেদের দাবি আদায় না করে ফিরবেন না ক্লাসে; এমনটাই জানিয়ে আসছেন গণমাধ্যমকে। এ যেন আরেক করোনা। স্থবির হয়ে আছে শিক্ষা-কার্যক্রম। সেশনজটের হতাশা গ্রাস করছে শিক্ষার্থীদের। কবে শুরু হবে ক্লাস-পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল কার্যক্রম? ঠিক জানেন না কেউই!
পৃথক পৃথক আন্দোলনে কেউ কারো নয়
এদিকে শিক্ষকদের প্রত্যয় স্কিমের সমাধান হলেও কোটা সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত ক্লাসে ফিরছেন না শিক্ষার্থীরা। আবার শুধুমাত্র কোটা সংস্কারের সমাধান হলেও প্রত্যয় স্কিমের সমাধান না হলে জুন থেকে চলে আসা শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কর্মবিরতিও বহাল থাকছে অনির্দিষ্টকালের জন্য। সেক্ষেত্রে ক্লাস-পরীক্ষা চালুর জন্য একইসঙ্গে দুটো ইস্যুরই দ্রুত সমাধান হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
তবে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আলাদা আলাদা আন্দোলনে 'কেউ কারো নয়' পরিবেশ লক্ষণীয়। কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের বিষয়ে যেমন কোনো বক্তব্য দেননি শিক্ষকরা আবার একইভাবে এতদিন ধরে শিক্ষকদের করা কর্মবিরতিতে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকলেও শিক্ষকদের এই দাবির বিষয়েও কোনো বক্তব্য দেয়নি ছাত্র সংগঠনগুলো।
এবিষয়ে গণমাধ্যমে দেওয়া এক মতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক জিনাত হুদা বলেন, 'শিক্ষকদের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা সম্পৃক্ত হোক এমনটি আমরা চাইনি।'
আবার, সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত 'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন' এর অন্যতম সমন্বয়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ্ ইত্তেফাককে বলেন, শিক্ষকরা কোটা সংস্কারের আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা জানাননি। শিক্ষকদের নিজেদের সন্তানদের জন্যই তো পোষ্য কোটা আছে। সেজন্যই হয়তো তারা এবিষয়ে কথা বলছেন না।'
বাড়ছে সেশনজটের আশংকা
এমনিতেই করোনার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই সেশনজট লেগেই আছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন বিভাগে ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদি সেশনজট রয়েছে। তারওপর নতুন করে সৃষ্ট এই অচলাবস্থা সেশনজটের কলেবর বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান থাকা ভর্তি প্রক্রিয়াও থেমে আছে অনির্দিষ্টকালের জন্য। নবীনদের মধ্যে পড়ছে এর বিরূপ প্রভাব।
বন্ধ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাপ্তরিক কার্যক্রমও
এদিকে বন্ধ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাপ্তরিক কার্যক্রমও। অনেকেই সনদসংক্রান্ত কাজসহ বিভিন্ন সেবা নিতে এসে ফিরে যাচ্ছেন। কমবেশি একই চিত্র দেখা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে।
হতাশাগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা
কবে নাগাদ এই অচলাবস্থার সমাপ্তি ঘটনা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না কেউই। এই সময়টাকে অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা নাকি স্কিল ডেভেলপমেন্টের কাজে লাগাবেন তা নিয়ে দোদুল্যমান অবস্থায় শিক্ষার্থীরা। এদিকে সঠিক সিদ্ধান্তে যেতে না পেরে অনেকেই হচ্ছেন বাড়িমুখো।
চলছে কোটা সংস্কারের আন্দোলন
ইত্তেফাককে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত 'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন' এর অন্যতম সমন্বয়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম বলেন, আমাদের দাবির বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট পদক্ষেপ না আসা পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো। প্রধানমন্ত্রী নিজেই এর যৌক্তিকতা স্বীকার করে কোটাব্যবস্থা বাতিল করেছিলেন। আন্দোলনের যৌক্তিকতা ২০১৮ সালে প্রমাণিত হয়েছে, যা আবার প্রমাণিত হবে। আন্দোলনটি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত নয় বলেও জানান নাহিদ।
হাবিপ্রবিতে আন্দোলনকারী এক শিক্ষার্থী বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের জন্য সাময়িক সময়ের অসুবিধা হলেও এর ফলাফল দীর্ঘমেয়াদি। যতোদিন না কোটাব্যবস্থার সংস্কার হচ্ছে ততোদিন পর্যন্ত ঢাকার সাথে তাল মিলিয়ে এই আন্দোলন চলবে।
এদিকে গণমাধ্যমকে কোটার বিষয়ে আন্দোলনে ছাত্রলীগের সর্মথন আছে জানিয়ে ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত বলেন, 'ছাত্ররা যে আন্দোলন করছে এটা সরকারের পক্ষে। সরকারের ভাতৃপ্রতীম সংগঠন হয়ে আমরা কেন এটার বিরোধিতা করতে যাব? ছাত্রলীগের শিক্ষার্থীরাও তো সরকারি চাকরি পরীক্ষা দেবে। আমরা কর্মীদের বলেছি এটিতে আমাদের বাঁধা নাই, মানে যার যার ইচ্ছা। আইনি প্রক্রিয়ায় সরকার অলরেডি লড়ছে। সেক্ষেত্রে কারো মন চাইলে আন্দোলন করতেও পারে, নাও পারে।'
শিক্ষার্থীদের সতর্ক থাকার আহবান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আমার মনে হয় এই আন্দোলনে কিছু অপশক্তি ভর করছে তারা বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে আন্দোলনটাকে সরকার বনাম সাধারণ শিক্ষার্থী করতে চাচ্ছে, এটিকে সাধারণ শিক্ষার্থী বনাম ছাত্রলীগ আন্দোলন করার একটা পায়তারা চলছে। এটা একটা ষড়যন্ত্র।
যা বলছেন শিক্ষকনেতারা
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, 'এখন পর্যন্ত আমরা আশ্বাসের মধ্যেই আছি। কোনো সমাধান পাইনি। প্রত্যয় স্কিম প্রত্যাহার, প্রতিশ্রুত সুপারগ্রেডের বাস্তবায়ন ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের দাবিতে আমাদের এই কর্মবিরতি চলছে। আমাদের দাবি না মেনে নেওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে।'
শিক্ষকদের কর্মবিরতির ফলে সেশনজট বাড়ছে। এবিষয়ে তিনি বলেন, সেশনজট হচ্ছে। এটাই বাস্তবতা। করোনা পরবর্তী সময়ে আমরা সেশনজটের ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছি। এবারও সেশনজট নিরসনে আমরা শিক্ষকরা কাজ করবো।
আন্দোলনের ব্যাপ্তিকাল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. সাদেকুর রহমান বলেন, যতোদিন পর্যন্ত আমাদের দাবী আদায় না হয়েছে আমরা মাঠেই থাকবো। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের প্রতি আস্থাশীল। আশা করছি, সরকার দ্রুতই আমাদের দাবি মেনে নেবে।
সেশনজটের বিষয়ে যা বলছে ইউজিসি
শিক্ষকদের আন্দোলনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, সরকারের পক্ষ সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে ইউজিসি সে অনুযায়ী-ই কাজ করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য ইউজিসির পক্ষ থেকে কিছু করার নেই।
সেশনজটের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের মতো দেশে সেশনজট লেগেই থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলনের বিষয়টার শেষ হলে সেশনজট নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে ইউজিসিও কাজ করবে।