সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতিতে নিয়োগের পরিসংখ্যান উপস্থাপন এবং কোটা সংস্কারের যৌক্তিক প্রস্তাবনা দেওয়ার আগে, কোটা সম্পর্কিত শব্দচয়ন নিয়ে একটু কথা বলি।
বিশেষায়িত (মুক্তিযোদ্ধা, নারী, জেলা, ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী) কোটার বাইরে যারা সমাজের বৃহত্তর শ্রেণি, প্রথমেই তাদের ‘মেধাবী’ না বলে বলুন ‘সাধারণ কোটা’র অংশী। কারণ বিসিএসের প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় মেধা ছাড়া কেউ পাস করতে পারে না। এরপর ভাইভাতেও পাস করা লাগে, ভাইভায় ফেল করলে কেউ আর কোটার জন্য বিবেচিত হয় না। তাই তথাকথিত ‘মেধাবী’দের মতো বিশেষ কোটাধারীদেরও সমান পরিশ্রম ও মেধার প্রমাণ দিতে হয় ভাইভা পাস পর্যন্ত। কোটার সুবিধাটা আসে তারপর।
সুতরাং কোটার সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ‘অমেধাবী’ তকমা দেওয়াটা হলো নির্বোধদের স্থুল রুচির পরিচয়। কারণ ৩ লাখ ব্যক্তি যদি বিসিএসে আবেদন করে ও পরীক্ষা দেয়, ভাইভা পর্যন্ত পাস করে হয়তো ১৫ হাজার, যা মোট পরীক্ষার্থীর ৫% মাত্র। কোটার হিসাব শুরু হওয়ার আগেই বাকি ৯৫% আউট। মেধার যুদ্ধে ৯৫% প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারানোর পর, তারপর কোটার সুবিধা পাওয়া যায়। তাহলে কোটাধারীরা অমেধাবী হলে, ভাইভা পর্যন্ত পাস না করা বাকি ৯৫% উচ্চশিক্ষিতরা কী?
কোটা থাকলেই চাকরি হয় কি?
আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একজন বড় ভাই মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়েও ৩ বার ভাইভায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হন, ফলে ক্যাডার তো দূরের কথা, ননক্যাডারেও বিবেচিত হননি তিনি। তিনি যদি প্রিলি-রিটেনের মতো ভাইভাতেও পাস করতেন, তারপর কোটা সুবিধার কারণে নিজের প্রাপ্ত নম্বরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটা বিসিএস চাকরি হয়তো পেতেন।
যাই হোক, চাকরি যুদ্ধের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় অন্তত ১৫-১৬টা পরীক্ষা দিয়ে, ৬-৭টা ভাইভার পর, একটি সরকারি ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার এবং এটিও হিসেবে দুটি চাকরি হয় তার। এটিওতে জয়েন করে নিজ এলাকায় চলে যান তিনি।
এখন বলুন, উনি কী মেধাবী নাকি অমেধাবী? শুধু কোটা থাকলেই কি চাকরি হয়? ৩ বিসিএসসহ উনি যে ৮-১০টা সরকারি চাকরির ভাইভা পর্যন্ত দিলেন এবং একপর্যায়ে ২টি চাকরিতে চূড়ান্তভাবে টিকলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি মিলে ১০টা সরকারি চাকরির ভাইভা যে দিতে পারে, সে কি অমেধাবী? দেশের ৯৫% চাকরিপ্রার্থী তো ভাইভা পর্যন্ত যেতেই পারে না। তারা তবে কী?
বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন রিপোর্ট ২০২০ বিশ্লেষণ
২০১৮ সালে কোটা পদ্ধতি উঠে যাওযার আগের ৩৫তম থেকে ৩৯তম ৫টি বিসিএস পরীক্ষায় নিয়োগের হার পর্যালোচনা করে কী দেখা যায়, কোটা পদ্ধতি থাকলে কোন কোটায় নিয়োগ কেমন আসুন ঠান্ডা মাথায় একটু দেখি।
৩৫তম থেকে ৩৯তম ৫টি বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০% থাকলেও নিয়োগ হয়েছে ৮.৭%, বাকি ২১.৩% কোটা পূরণই হয়নি। নারী কোটা ১০% ও জেলা কোটা ১০% পূরণ হয় নিয়মিত। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কোটা ৫% থাকলেও পূরণ হয়েছে ১% এর কম (.৮৮%), এই কোটা পূরণ হয় না ৪% এর বেশি; প্রতিবন্ধী কোটা ১%-ও পূরণ হয় না ঠিকমতো, পূরণ হয়েছে মাত্র (.১১%)।
নিয়মিতভাবে মুক্তিযোদ্ধা কোটা খালি থাকে ২১% এর বেশি ও ক্ষৃদ্র নৃ গোষ্ঠীর কোটা খালি থাকে ৪% এর বেশি।
এই ২ কোটাতেই খালি থাকে ২৫% এর বেশি।। তারমানে কি বোঝা গেল, প্রিলি-রিটেন অন্যদের মতো পাস না করলে শুধু কোটা থাকলেই কেউ ভাইভা দিতে পারে না, আর চাকরিও হয় না। কোটা থাকলেই চাকরি হয়, ব্যাপারটা এতো সহজ না। তাহলে এই ২৫% এর বেশি খালি থাকতো না!
কোটা পদ্ধতি সংস্কারে একটি প্রস্তাবনা
বাস্তব পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে কোটা বিষয়ে সময়োপযুগী সিদ্ধান্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ, অবশ্যই এখানে একটা সংস্কার প্রয়োজন।
সুতরাং অব্যবহৃত কোটাগুলো কমিয়ে দেওয়া হোক। সেই হিসেবে কোটা পদ্ধতি সংস্কার করে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০% থেকে কমিয়ে ১০% এ আনা হোক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কোটা ৫% থেকে কমিয়ে ১% করা হোক। কারণ এগুলো পূরণ হয় না, সাধারণ কোটায় এই ২৪% ছাড়া হোক।
২০১৮ সালে কোটা উঠে যাওয়ার পর, বিসিএসে পুলিশের ৪০তম ব্যাচে ২৪ জেলা ও ৪১তম ব্যাচে ১৮ জেলা থেকে কেউ নিয়োগই পায়নি। তাই জেলা কোটা না থাকলে চরাঞ্চল, খরাপ্রবণ এলাকা ও পিছিয়ে থাকা দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত জেলাগুলো থেকে প্রার্থীরা উচ্চপ্রতিযোগিতামূলক পেশায় ঢুকতে ব্যর্থ হবে, ফলে একটা সময় দেখা যাবে অল্প কিছু জেলার লোকই সম্পূর্ণ রাষ্ট্রযন্ত্র চালাচ্ছে, এতে সীমাহীন সামাজিক বৈষম্যের সৃষ্টি হবে। তাই জেলা কোটা থাকতে হবে।
কোটা উঠে যাওয়ার পরের ৩ বিসিএসের (৪১ থেকে ৪৩তম বিসিএস) পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নারীর নিয়োগ প্রায় ২৬.৮৭% থেকে ১৯.৪% এ নেমে গেছে। পুলিশের ৪৩ ব্যাচে নারী কর্মকর্তার হার নেমে এসেছে ১৭.০৫ শতাংশে। তাই দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর জন্য কোটা না থাকলে তাদের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি হবে খুবই ধীর, দেশের সার্বিক অগ্রগতির জন্য তাদের প্রয়োজন পুরুষদের সমান, তাই তাদের অগ্রগতির জন্য একটু সহায়তা করতে এই কোটা দরকার।
তাই নারী ১০% ও জেলা ১০% যেহেতু পূরণ হয়, সুতরাং এটা অপরিবর্তিত থাক।
প্রতিবন্ধী কোটা ১%ও পূরণ না হলেও, এটা অন্তত ১% বহাল থাক। সাথে এতিমদের জন্য ১% কোটা চালু করা হোক। পিছিয়ে পড়াদের সামনে আনতে রাষ্ট্রের দায় থাকে।
তাহলে সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত কোটা দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ৩৩%। বৃহত্তর সাধারণ জনগোষ্ঠীর জন্য থাকে কোটা ফাঁকা থাকে ৬৭%।
কোটাধারীরাও মেধাবী
প্রিলি-রিটেন-ভাইভা পাসের পর কোটার কারণে কেউ সামান্য ২০-৩০ নাম্বার কম থাকলে নিয়োগে একটু আগায় যায়, তাতে কোনো ক্ষতি নাই। ব্যাপারটা এমন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ যদি বিসিএসে ৭৫% নাম্বার পায়, আর আমার প্রত্যন্ত গ্রামের কেউ যদি ৭০% নাম্বার পায়, তাতে খুব বেশি পার্থক্য হয় না।
উল্টো সব সুযোগ পেয়ে ৭৫% নাম্বার পাওয়া ব্যক্তির চেয়ে, অনেক সুযোগ বঞ্চিত ৭০% নাম্বার পাওয়া ব্যক্তির গুরুত্ব ও মাহাত্ম্যই বেশি। কোটা মানে এটাই। কোটা মানে ফেল করা কেউ এসে চাকরি পাচ্ছে না। মেধার পরীক্ষা তাদেরকেও দিয়ে আসতে হয়। মেধা দিয়েই কোটাধারীদের সব ধাপ অতিক্রম করা লাগে।
ব্যতিক্রমীভাবে প্রতি জেনারেশনে ৯০% নাস্বার পাওয়া হাতেগোনা কয়েকজন উচ্চমেধাবী ছাড়া, তথাকথিত মেধাবী দাবি করা ব্যক্তিদের সাথে কোটাধারীদের মেধার কোনো পার্থক্য নাই।
আরেকটা কথা, সেটা হলো: মেধাবী বনাম কোটা না, টার্মটা হবে সাধারণ কোটা ও অন্যান্য কোটা। সাধারণ কোটা হোক ৬৭%, অন্যান্য সব কোটা হোক ৩৩%।
গড়ে উঠুক জ্ঞানভিত্তিক সমাজ। বাংলাদেশ এগিয়ে যাক।
লেখক: কবি ও যোগাযোগ গবেষক