‘বায়তুল আজগর সাত গম্বুজ জামে মসজিদ’। কুমিল্লার দেবীদ্বার পৌরসভার গুনাইঘর এলাকায় অবস্থিত সুউচ্চ চার মিনারের ব্যতিক্রমধর্মী এই মসজিদের নির্মাণশৈলী মোগল সাম্রাজ্যের স্মৃতি বহন করে। মোগল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত মসজিদটি ইসলামি ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হয়ে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। সাত গম্বুজবিশিষ্ট নানা কারুকার্যখচিত এক অনন্য বৈশিষ্ট্যের এই মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। এছাড়া নান্দনিক স্থাপত্য শিল্পের এ মসজিদে জুমা ও ধর্মীয় বিশেষ দিবসে অসংখ্য মুসল্লির সমাগম ঘটে। মোগল-তুর্কি ও পারস্যের সংমিশ্রণে কারুকার্য করা এ মসজিদটির বাহ্যিক ও অভ্যন্তরের নির্মাণশৈলী মুসল্লি-দর্শনার্থীদের মোহিত করে। মসজিদটির অপার সৌন্দর্য এখন পর্যটকদের হাতছানি দিচ্ছে।
সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, নির্মাণশৈলীর দিক থেকে গুনাইঘর বায়তুল আজগর সাত গম্বুজ জামে মসজিদটি দেশের বিখ্যাত মসজিদগুলোর অন্যতম। মোগল স্থাপত্যের নির্মাণ পদ্ধতি অনুসরণ করে আধুনিকতার সংমিশ্রণে নজরকাড়া অসংখ্য ক্যালিওগ্রাফিতে আঁকা ব্যতিক্রমধর্মী এ মসজিদটি দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এ মসজিদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ক্যালিওগ্রাফি ও নির্মাণ কৌশল। মসজিদটির অভ্যন্তর, বাহির ও মিনার গম্বুজপাত্রে রয়েছে সিরামিকসে করা শতাধিক ক্যালিওগ্রাফি। ঐতিহ্যবাহী লিপিশৈলী শেকান্তে, সুসল দিওয়ানী ছাড়াও রয়েছে আটটি বাংলা ক্যালিওগ্রাফি। মসজিদের ওপরে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা রয়েছে।
মসজিদের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরের টেরাকোটার অসাধারণ সুসজ্জিত কারুকাজের নান্দনিকতা যে কারো মন জুড়িয়ে যায়। মসজিদের চার কোণায় ৮০ ফুট উচ্চতার চারটি মিনার রয়েছে। এতে গম্বুজ রয়েছে সাতটি। সাতটি গম্বুজের পাঁচটিই ঝাড়বাতিসমৃদ্ধ। মসজিদটি ৪৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩৬ ফুট প্রস্থবিশিষ্ট। মসজিদে বাংলা ও আরবিতে ক্যালিওগ্রাফি করা হয়েছে। মসজিদে লিখা ‘আল্লাহু’ শব্দটি রাতের অন্ধকারে তারকার মতো জ্বল জ্বল করে জ্বলতে থাকে। অনেক দূর থেকে এ আলো দেখা যায়। আরবি অক্ষরে দক্ষ কারিগরের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় লিখা রয়েছে ‘সুরা আর রাহমান’, ‘আয়তুল কুরসি’ ও ‘চার কুল’। মসজিদের ভেতরের মূল অংশে ৫টি গম্বুজ আছে। একটিতে লেখা আয়তুল কুরসি। অন্য চারটি গম্বুজের ভেতরে লেখা চারটি কুল শুরা। মসজিদটির বাইরের আবরণে বহু চাঁদ-তারা আঁকা রয়েছে। মসজিদটিতে ইট, সিমেন্ট, বালির পাশাপাশি চিনামাটি ও টাইলস ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে ৩৫০ মন চিনামাটির টুকরা ও ২০০ গ্লাস ব্যবহার করা হয়েছে।
মাওলানা আসাদুর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক বজলুর রহমানসহ মুসল্লিরা জানান, একটি আধুনিক মসজিদে যা কিছু থাকার কথা সবই আছে। মসজিদটির পশ্চিম পাশে রয়েছে ফুল ও ফলের বাগান। এছাড়া রয়েছে বিশাল আকৃতির জলাধার। এর পাড়সহ চার দিক শ্বেত পাথরে মোড়ানো, যা পর্যটকের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। এ মসজিদের মোতোয়াল্লি স্থানীয় সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহ্সান মুন্সী সাংবাদিকদের জানান, ‘২০০২ সালে মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০০৫ সালের ১৪ জানুয়ারি উদ্বোধন হয়। এ মসজিদ নির্মাণে প্রায় তিন বছরে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ জন শ্রমিক কাজ করেছেন। মোঘল-তুর্কি ও পারস্যের সংমিশ্রণে মসজিদের কারুকার্য করা হয়েছে। চার মিনারের কোনো মসজিদ বাংলাদেশে এটাই প্রথম। মসজিদের ক্যালিওগ্রাফি, কারুকাজ ও নকশার নান্দনিকতা দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী আসেন। এখানে পাঁচ শতাধিক মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। মোগল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত মসজিদটি ঐতিহ্যের স্মারক।’