খাঁ খাঁ করছে সিলেট, বিলাসবহুল হাউজবোট যেন ভূতুরে জাহাজ 

কোঠা সংস্কার আন্দোলন, তার আগে বন্যা ও ভারতীয় পাহাড়ি ঢলের কারণে এবার সিলেটে পর্যটনে ধস নেমেছে। সিলেটের অর্ধশতাধিক পর্যটন ষ্পটে এখন সুনসান নিরবতা। পর্যটকদের অভাবে ওইসব ষ্পট খাঁ খাঁ করছে। হাওড়ের বিলাসবহুল হাউসবোটগুলোও অলস পড়ে আছে।   

‘সব ব্যবসায় মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। ব্যবসা নেই বললেই চলে,’ এই মন্তব্য করে সিলেট জেলা কাষ্টমস ক্লিয়ারিং এন্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্ট (সিএন্ডএফ) এর সভাপতি বশিরুল হক ইত্তেফাককে বলেন, আমদানি রপ্তানি বন্ধ। হাজার হাজর শ্রমিক বেকার। এই খাতে বছরে অন্ততঃ চারশ কোটির টাকার ব্যবসা থমকে আছে।’ 

তিনি জানান, সিলেটের তামাবিল, সুতার কান্দি, চাতলা, বড়ছড়াসহ বেশ কয়েকটি স্পট পর্যট সমৃদ্ধ। এসব স্থানে ব্যবসায়ীরা ছাড়াও পর্যটকদের মিলন মেলা হতো। এখন সেগুলো ফাঁকা হয়ে আছে। 

তিনি বলেন, ‘সিলেটে পর্যটন খাত বিপর্যস্থ। ব্যবসা বাণিজ্য লাটে উঠেছে। যানবাহনের আধিক্য নেই, হোটেল, মোটেল প্রায় বন্ধ।’

শীত, বর্ষা দুই মৌসুমেই পর্যটকরা ভিড় করেন সিলেটে। এখানকার প্রাকৃতিক নয়ানাভিরাম সৌন্দর্য অবগাহন করে তারা মুগ্ধ হন। এখানে টাঙ্গুয়া, হাকালুকির হাওর, জাফলং, বিছানাকান্দি, সাদাপাথর, লালাখাল, পানতুমাই, জলারবন রাতারগুল, লাউয়াছড়া,মাধবকুন্ড, সাতছড়ি, নিলাদ্রি, শহীদ সিরাজ লেক, পাহাড় থেকে নেমে আসা সফেদ ঝর্ণা, সবুজ ঢেউ খেলানো দৃশ্য হাজার হাজার পর্যটকদের চিত্ত জুড়ায়। সিলেটের চার জেলার আনাচে কানাচে রয়েছে অসংখ্য পর্যটন স্পট। অন্যান্য সময় যেখানে এসব ষ্পটে নানা বয়সের পর্যটক মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ান। এখন সেখানে রাজ্যের নিরবতা। চা-বাগান সমৃদ্ধ শ্রীমঙ্গলসহ অন্যান্য সবুজ বনগুলো যেন নিঃসঙ্গ। 

ব্যবসায়ীরা জানান, করোনা মহামারীতে ব্যাপক ক্ষতির পর সিলেটের পর্যটন ব্যবসা ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাড়াতে চেষ্টা করে। কিন্তু পর পর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কোটা বিরোধী আন্দোলনে সহিংস ঘটনায় ব্যবসা বাণিজ্য লাটে উঠেছে। তীব্র খরার পর প্রবল বৃষ্টি, বন্যা, পাহাড়ী ঢল সিলেটের জনপদকে বিপন্ন করে তুলেছে। বন্যার প্রকোপ কমতে না কমতেই শুরু হয় দেশব্যাপী কোটা আন্দোলনে সব স্থবির। 

মায়াবী ঝর্ণায় এলোকেশীরা নেই, চা বাগানগুলেতে নেই ‘সেলফি’ তরু-তরুণীদের ভিড়, টাঙ্গুয়ার হাওরে হাইজবেটগুলো ঘাটে বাঁধা  

সিলেট নগরী থেকে ৩০ কিমি অদূরে বিছানাকান্দি। বিমান বন্দর সড়ক পেরিয়ে অদূরে চেরাপুঞ্জি। আর কাছের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণা যেন হাতছানি দেয়। পাথুরে বিছানায় বিছনাকান্দি জলপ্রবাহের নিবাস- বিশেষ করে ভরা বর্ষায় এর রূপ ফুটে ষোল কলায় পূর্ণ হয়। পর্যটকরা এখানে এসে আনন্দে লুটপুটি খান। দল বেধে হিমশীতল পানিতে সাঁতার কাটা কতই না চিত্তাকর্ষ। যেন কেউ ক্লান্ত হতে চান না। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা মিতালি করতে থাকেন পাথর আর পানির সঙ্গে। কিন্তু এখানে নেই এখন কোন কোলাহল। নেই কোন আনন্দ।

এদিকে টাঙ্গুয়ারা হাওরের লাখ-লাখ টাকায় তৈরি বিলাসবহুল বোটগুলো ঘাটে বাঁধা। পর্যটক না থাকায় ভুতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে হাউসবোটগুলোতে। 

পর্যটন খাতের ক্ষতি পোষাতে প্রণোদনার দাবি সিলেট চেম্বারের
বিশেষ করে গত এপ্রিল মাস থেকে শুরু হওয়া এই মন্দা সিলেটের পর্যটন কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যকে পথে বসিয়ে দিয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এখন খেয়ে না খেয়ে জীবনধারণ করছেন। এই খাতে বড় বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক ঋণের চিন্তায় চোখে আধার দেখছেন। 

প্রণোদনা চেয়ে সিলেট চেম্বারের সভাপতি তানিম আহমদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘এবার সিলেটের পর্যটন খাতে অন্ততঃ ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা মুশকিল।’