‘কেউ কি আমার বাবার চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে পারবে? ২৫ বছর ধরে ভ্যান চালিয়ে তিনি আমাদের খেয়ে না খেয়ে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন, আর সেই একমাত্র উপার্জনের ব্যক্তিটি আজ ১০ দিন ধরে হাসপাতালে পড়ে আছেন, এখন আমাদের লেখাপড়া তো দূরের কথা; খেয়ে বাঁচতে পারব কি-না সেটাই অনিশ্চিত।’—পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি চোখে ছররা গুলিতে আহত বাবা মো. মাহবুল খানের ১৪ বছরের কিশোরী মেয়ে মনিকা এভাবেই তার ক্ষোভের কথা বলল।
সোমবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁও জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে কথা হয় আহত একাধিক ব্যক্তি ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে। মনিকা আরো বলে, ‘গুলি বাবার পায়ে না ছুঁড়ে, কেনো চোখে ছোঁড়া হলো? এখন এর মাসুল কে দেবে? আমাদের লেখাপড়ার দায়িত্ব কি সরকার নিবে?’ আহত মাহবুলের স্ত্রী বলেন, ‘তিনি খুব সাদাসিদে মানুষ, পুলিশের খাতায় এ জীবনে তার নাম ওঠে নাই। আমার ছেলেটা ইন্টার পরীক্ষা দিচ্ছে, মেয়েটা ৯ম শ্রেণিতে পড়ে, আর ছোট মেয়েটার বয়স চার বছর। আমরা রাজনীতি বুঝি না; কোনো দলও করি না। তবু আমার স্বামী গুলিবিদ্ধ হলো কেন?’
সম্প্রতি কোটা আন্দোলন চলাকালে সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে মাহাবুলের মতো অনেকেই চোখে আঘাত পেয়েছেন। কারো এক চোখে, কারো দুই চোখেই ছররা গুলির স্প্লিন্টার লেগেছে। কারো স্প্লিন্টার অস্ত্রোপচারে বের করা হয়েছে, কারো বা চোখের ভেতরেই রয়ে গেছে। কারো চোখে রক্ত জমাট বেধে আছে, চোখের চারপাশ জখম, ব্যন্ডেজ নিয়ে হতাশায় সময় পার করছেন আহতরা। কেউ এক চোখে দেখতে পাচ্ছেন না, কেউবা দু চোখেই দেখতে পাচ্ছেন না। তবে এই আলো দেখতে না পারা স্বল্প সময়ের জন্য নাকি আজীবনের, সে বিষয়ে কেউ কিছুই বলতে পারছেন না।
মুখে রাজ্যের বিরক্তি আর ঘৃণা নিয়ে মোবাইল ফোন হাতে হাসপাতালের বিছানায় বসে আছেন ১৮ বছরের জিহাদ মাহমুদ সিহাব। সে ঢাকা সেন্ট্রাল পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের ছাত্র। ১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার মিরপুর-২ নম্বর থানার সামনে আনুমানিক বিকাল ৫টার দিকে ছররা গুলি লাগে তার চোখে। এখন বাম চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না সিহাব।
বিদ্যুতের কাজ করা কিশোর ইমরানেরও একই অবস্থা। একচোখে ছররা গুলির স্প্লিন্টার ঢুকে গেছে। সে-ও কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। ইমরান বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে আমাদের ঠিকভাবে কিছুই বলা হচ্ছে না। চোখের দৃষ্টি ফিরে আসবে কিনা কিছুই ঠিকমতো বলছেন না।’
বাংলাদেশ আই হসপিটালের মালিবাগ শাখার পরিচালক, রেটিনা ও ফ্যাকো সার্জন ডা. মাসুদ হাসমী ইত্তেফাককে বলেন, ছররা গুলি যাদের চোখের ভেতরে ঢুকে গেছে, তাদের চোখের গুলি বের করলেও দৃষ্টি খুব একটা ভালো আসবে না। আর যাদের গুলি চোখের আশ পাশ দিয়ে গেছে, সেইসব ক্ষেত্রে গুলি বের করা হলে চোখের দৃষ্টি ভালো থাকবে। চোখের ভেতরে গুলি ঢোকা মানে এ চোখটা অল মোস্ট ব্লাইড হয়ে যাওয়া। যেসব চোখ একেবারে ড্যামেজ হয়ে গেছে, সেসব চোখে চিকিত্সকরা অস্ত্রোপচার করে না, আর যে সব চোখে অস্ত্রোপচার করলে দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসবে, সেসব চোখের সার্জারি করা হয়।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের এই হাসপাতালে ৪২৫ জন চোখে বিভিন্ন ধরনের আঘাত নিয়ে এসেছিলেন। কারো ইটপাটকেলের আঘাত, কারো ছররা গুলির আঘাত ছিল। তাদের মধ্যে ৩১৯ জন হাসপাতালে ভর্তি ছিল এবং ২৮৭ জনের অস্ত্রোপচার হয়েছে। চোখে আঘাতের কারণে এখনো ১১/১২ জন হাসপাতালে ভর্তি আছে। এদের মধ্যে বেশির ভাগ বয়সে তরুণ, তাদের বয়স ২০ থেকে ৩০ বছর। তিনি বলেন, চার থেকে ছয় মাস পরে বোঝা যাবে তাদের চোখের দৃষ্টি কতটুকু আছে বা থাকবে।