মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে অনেক করেছেন। এখন দেশে সীমাহীনভাবে চোরের উপদ্রব বেড়ে গেছে। এদের কারণে খাদ্যসামগ্রীতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। খাদ্যের দাম নিয়ে দেশের মানুষ কষ্টে আছে। যে দেশের মানুষ শিষ্টাচার, নৈতিকতা কী জিনিস বোঝে না, যে দেশে খেতে দিলে গ্লাস, থালাবাসন চুরি করে, ওয়াশরুমে হাতমুখ ধৌত করতে গিয়ে সাবান, টিস্যু চুরি করে পকেটে ভরে, সে দেশকে অল্প কয়েক বছরে আপনি (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী) সোনার হরিণ বানিয়েছেন। উন্নয়ন অর্থনীতিতে এনেছেন পরিবর্তন। এতকিছুর পরও অধিকাংশ মানুষের চরিত্র বিন্দুমাত্র বদলায়নি। অফিসের বড় বড় কর্তার (তবে সব নয়) দেখলে চোর চোর মনে হয়। যে দেশে এক কাপ চা পান করে অপরের গিবত করতে বুকে বাঁধে না, সে দেশের আদমসন্তানরা মানুষ হবে কবে?
চোরে চোরে দেশটাকে গিলে ফেলেছে। হজমের পর এখন কারো কারো বদহজমও হচ্ছে দেখি! এভাবে দেশটাকে লুটেপুটে খেয়েদেয়ে একেক জন পালাচ্ছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, দেশ স্বাধীন করে কেউ কেউ সোনার খনি পায় আর আমি পেয়েছি চোরের খনি। গভীরভাবে চিন্তা করতে গেলে দেখা যাবে, এ দেশটা আসলে চোরদের স্বর্গরাজ্য। চোরের এত বেশি উৎপাত বেড়েছে, সামাল যদি দিতে না পারেন তাহলে পুরো দেশটারে এরা গিলে খেয়ে ফেলবে। ব্যাংক, বিমা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, ওয়াসা, কাস্টমস-এছাড়া অন্যান্য সরকারি- বেসরকারি-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান সবখানে সেবাপ্রার্থী মানুষ সীমাহীন হয়রানির শিকার হচ্ছে।
দেশের কিছু উচ্চাভিলাষী মানুষের কারণে পুরো দেশ আজ কলঙ্কিত। প্রশাসনে আরো নজরদারি বাড়ান, তাদের সম্পদের খোঁজ নিন। একজন পিয়ন কীভাবে ৪০০ কোটি টাকার মালিক হয়, একজন ড্রাইভার কীভাবে হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যায়। দুর্নীতির লম্বা ফিরিস্তি লিখে শেষ হবে না। এদের শেকড় বহু বিস্তৃত। বাংলাদেশে সবচেয়ে নাকি দুর্নীতি হয় ভূমি, বিদ্যুৎ, ওয়াসার অফিসগুলোতে। এদের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করুন। এত এত বেতন দিয়ে দুর্নীতিবাজদের চাকরিতে রেখে লাভ নেই। এরা দেশের শত্রু, গণদুশমন!
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দেশের মানুষ খুব কষ্টে দিনযাপন করছে। মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তরা পরিবার-পরিজন নিয়ে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই শ্রেণির মানুষগুলো কাউকে মুখ ফুটে কোনো কথা বলতে পারছে না। কাঁচাবাজার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর দাম লাগামহীনভাবে হুহু করে বেড়ে চলেছে। কোথাও কোনো জবাবদিহিতা নেই। চড়া দামের কারণে মানুষ ঠিকমতো খেতে পারছে না। সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে দেশের মানুষ আজ সর্বস্বান্ত। সন্তানদের পড়ালেখার ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। সে হিসেবে
আয় বাড়েনি। বিগত এক বছর ধরে বাজার সরকারের নিয়ন্ত্রণহীন। সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষরা আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছে না। সন্তানদের স্কুল- কলেজের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খাবারের মধ্যে টান পড়েছে। কাঁচাবাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি দেখে ক্রেতাদের সদাই না করে খালি থলে নিয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে। এ নিয়ে পরিবারে ঝগড়া-বিবাদ লেগে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। চিনি, পেঁয়াজ, চাল, ডাল, বিস্কুট-সামগ্রী সেই কবে যে নাগালের বাইরে গেছে, কমার কোনো লক্ষণ নেই, বাজারে নজরদারিও নেই। এ পরিস্থিতিতে স্বল্প আয়ের মানুষ কীভাবে পরিবারের মা-বাবা, ভাইবোন, স্ত্রী-সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেবে?
পুষ্টিকর খাবার এখন সাধারণ মানুষের জন্য স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, ওয়াসার প্রিপেইড মিটারের নামে মানুষের পকেট কাটছে, ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের কারণে মুহূর্তে টাকা নাই হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ জানাতে গেলে উলটো হয়রানির শিকার হচ্ছে। মোবাইল ফোন
কোম্পানিগুলোতেও কোনো রকম তদারকি নেই, যেমন খুশি তেমন করে টাকা কেটে নিচ্ছে। দুর্নীতি যে কী পরিমাণে বেড়েছে গত কয়েক মাসে, আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া কিছু দুর্নীতিবাজের আসল রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। প্রশাসনিক পর্যায়ের এরকম আরো বহু দুর্নীতিবাজ ধরাছোঁয়ার বাইরে আছে, তাদের আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব নয়। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রান্তিক চাষিদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। বীজ থেকে সার, কৃষির সব ধরনের প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম কমিয়ে আনতে হবে। কৃষি উপকরণের উচ্চমূল্যের ভয়ে কৃষকরা চাষ করতে সাহস পাচ্ছেন না। শ্রমিকদের দিনমজুরি দিতে গিয়ে লোকসানে লোকসানে তারা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। কৃষিকাজে কৃষকরা নিরুৎসাহিত হওয়ার কারণে দেশে দিনদিন খাদ্যসংকট বেড়ে চলেছে। এজন্য বললাম, এখন আর উন্নয়ন নয়, খাদ্যশস্যে মানুষকে বাঁচার সুযোগ করে দিন। আমাদের দেশে বিপুল পরিমাণ জনশক্তি আছে, এই জনশক্তিকে যদি বিভিন্ন প্রণোদনার মধ্য দিয়ে কাজে লাগানো যায়, তাহলে বাংলাদেশ থেকে ভবিষ্যতে খাদ্যসংকট ঘুচে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যসহ তৃতীয় বিশ্বে যুদ্ধের দামামায় খাদ্যসংকটে হাহাকার চলছে। এর থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে কৃষিকাজে বিপ্লব ঘটানো ছাড়া বিকল্প পথ খোলা নেই।
লেখক: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক