বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন

হাসিখুশি কাজল এখন জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে

কাজল ছিলেন অসম্ভব মেধাবী। অষ্টম শ্রেণিতে কাজল পুরো গোপালগঞ্জে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পান। এসএসসি, এইচএসসিতে তার জিপিএ-ফাইভ ছিল। ২০১৬-১৭ সেশনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হন (৪৪ সমাবর্তনে)। বিশ্ববিদ্যালয়েরই বিভিন্ন পরিকল্পনায় কাজ করছিলেন কাজল। পাশাপাশি চাকরি খুঁজছিলেন। স্ত্রীসহ থাকতেন সাভারের গেরুয়াতে। এলএলবি সম্পন্ন করা স্ত্রী সিনথিয়া আক্তার নিশি জানান, তাদের ১৩ বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তার পরিবার কাজলের সঙ্গে বিয়েতে রাজি ছিল না। অন্যত্র তার আংটি বদলও হয়। তার পরও কাজলের বাবা গিয়ে তাকে নিয়ে আসেন। গত ১ আগস্ট তাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী ছিল। যাত্রাবাড়ীতে বড় ভাশুরের বাসায় বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করতে যান তারা। সেখানেই ৫ আগস্ট কাজলের মাথায় গুলি লাগে।

২৭ বছরের কাজল এখন রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে লাইফসাপোর্টে আছেন। গতকাল সোমবার হাসপাতালের আইসিইউয়ের সামনে কথা হয় সিনথিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ছিল বলে তারা বাড়ি ফেরেননি। ছোটবেলা থেকেই সত্যের পক্ষে লড়ে চলেছেন কাজল। সত্যের জন্য সকলের বিপরীতে গিয়ে একা দাঁড়াতেও পিছপা হননি কখনো। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক, ছোট-বড় শিক্ষার্থী সবার প্রিয়জন ছিলেন কাজল। সবার বিপদে পাশে থেকেছেন। সিনথিয়া জানান, পরিবারের অমতে বিয়ে করেছেন বলে তাদের সঙ্গে এতদিন যোগাযোগ ছিল না। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই বলে আমার সঙ্গে সঙ্গে কাজলেরও মন খারাপ হতো। তবে এখন কাজলকে হাসপাতালে দেখতে আসেন সিনথিয়ার মা-ভাই। হাসপাতালে শ্বশুর, ভাশুর, দেবরের সঙ্গে সারা দিন থাকেন। আইসিইউয়ের পাশেই বেশি সময় কাটে তার।   

সেইদিনের ঘটনাবলি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সকালে ফজরের নামাজ পড়ে নাশতা করেন কাজল। আমি একটি ডিম ভেজে দেই। কখনই নিজে পুরোটা খেতেন না। অর্ধেক ডিম আমাকে খাওয়ান। স্বামী হিসেবে একশতে তাকে একশরও বেশি দেব। সব সময় আমার ভালোমন্দের গুরুত্ব দিতেন। আমার যেন কোনো অসুবিধা না হয় সেদিকে সম্পূর্ণ নজর থাকত তার।’ অশ্রুসজল চোখে তিনি বলেন, ‘ঐদিন আমিই তাকে যেতে বলি। না করিনি। বেলা ১টা পর্যন্ত আমার সঙ্গে ফোনে কথা হয় তার। ২টার দিকে গুলি লাগে। আশপাশের লোকজন তাকে মাতুয়াইল স্পেশালাইজড মেডিক্যাল কেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যায়, সেখানে তার ওয়ালেটে জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে গোপালগঞ্জের ঠিকানা পাওয়া যায়। সেই হাসপাতালের এক কর্মী বাড়িতে ফোন দেন। আড়াইটার দিকে আমরা ফোন পাই। মাতুয়াইল হাসপাতাল থেকে বিকালে এখানে আনা হয়। এখানে ৬ আগস্ট তার মাথায় অস্ত্রোপচার করা হয়। এখন পর্যন্ত আছেন লাইফসাপোর্টে।’ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ জানান, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ৫০০ আহত রোগী ঐ হাসপাতালে চিকিত্সা নেন। ১৩২ জন ভর্তি হন। ২৪ জন মারা যান। তিন জনকে মৃত অবস্থায় আনা হয়। বর্তমানে বিভিন্ন বিভাগে ১১ জন আহত রোগী চিকিৎসাধীন আছেন। তাদের মধ্যে তিন জন আইসিইউতে আছেন। তাদের অবস্থা গুরুতর।