সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ অন্য কোথাও থেকে কোনো মতবাদ আমদানি করবে না। আমাদের নিজস্ব মতবাদ অনুসারে সবকিছু পরিচালিত হবে। এ সূক্ষ্ম বিষয়গুলো বোঝার জন্য আপনাকে আমাদের ইতিহাস নিয়ে অনুসন্ধান করতে হবে। শেখ মুজিব একজন সামাজিক গণতন্ত্রী ছিলেন, যিনি বাংলাদেশকে সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে কল্পনা করেছিলেন।’
সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করেছিল শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের গবেষণা সেল সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) প্রকাশনা বা ম্যাগাজিন ‘হোয়াইট বোর্ড’। তাতে উঠে আসে চারবার তার রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা, দেশের ভবিষ্যৎ এবং বিভিন্ন নীতি নির্ধারণী বিষয়। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগের ইন্টেলেকচুয়াল ইনপুট দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সিআরআই। দলীয় এ থিংকট্যাংকটিতে শেখ পরিবারের সদস্যদেরই আধিক্য, যাদের হাত ধরে প্রকাশিত হতো নীতিবিষয়ক প্রকাশনা হোয়াইট বোর্ড।
শেখ হাসিনা টানা ১৫ বছর ৭ মাস সরকারপ্রধান থাকাকালীন ২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর যাত্রা করে সিআরআইয়ের ম্যাগাজিন হোয়াইট বোর্ড। দেশের প্রথম পলিসি ম্যাগাজিন দাবি করা এ প্রকাশনাটি নীতিনির্ধারণী বিষয়ক নির্মোহ ও সার্বিক পর্যালোচনা করবে—উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এমন বার্তা উঠে আসে প্রধান সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের বক্তব্যে।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সিআরআইয়ের ট্রাস্টি রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক বলেন, ‘এ ম্যাগাজিন নীতিনির্ধারক এবং তরুণদের জন্য বস্তুনিষ্ঠ ও স্পষ্ট বার্তা দেবে। দেশের সবচেয়ে মেধাবীদের জন্য একটি অবস্থান তৈরি করছে হোয়াইট বোর্ড। পাশাপাশি বিদেশ থেকে বাংলাদেশের জন্য কাজ করে যাওয়া মানুষের জন্যও কাজ করে যাবে এটি।’
সিআরআইয়ের চেয়ারম্যান শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ভাইস চেয়ারম্যান। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে আরো রয়েছেন শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক ও ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি। পরিবারটির বাইরে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে আছেন সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। শেখ পরিবার ও আওয়ামী লীগের হয়ে গবেষণা সংস্থাটির সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছেন তন্ময় আহমেদ। এছাড়াও তন্ময় আহমেদ সিআরআই মিডিয়া-উইংয়ের প্রধান হিসেবেই দায়িত্ব পালিন করেছেন বলে জানা যায়। এদিকে আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিআরআইয়ের আরেক সিনিয়র অ্যানালিস্ট ব্যারিস্টার শাহ আলী ফরহাদ। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সিআরআইয়ের সঙ্গে কাজ করা ফরহাদ আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা উপ-কমিটি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপ-কমিটিরও সদস্য ছিলেন। ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ পান। এছাড়াও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাতের নেতৃত্বে একটি বিশেষ মিডিয়া সমন্বয়ক দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি।
দলীয় বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও জনমত গঠনে ২০১০ সালে দৃশ্যমান ও সক্রিয় হতে শুরু করে সিআরআই। সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে না জড়িয়ে বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রাসঙ্গিক থাকার চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগের বুদ্ধিবৃত্তিক নীতিকৌশল ও পরামর্শ প্রদানকারী সংস্থাটি। এজন্য ২০১৪ সালে ‘ইয়াং বাংলা’র মতো অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। সিআরআইয়ের তত্ত্বাবধানে কয়েক বছর ধরে যুব উদ্যোক্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে চালু করা হয় ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’। একইভাবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে কেন্দ্র করে হয়ে আসছিল ‘জয় বাংলা কনসার্ট’।
তবে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিরোধী দলেরও বিভিন্ন কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আসছিল সংস্থাটি। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির আগে বিরোধী মত দমনে অপপ্রচার, গুজব ও ভুয়া খবর ছড়ানোরও অভিযোগ রয়েছে সিআরআইয়ের বিরুদ্ধে। সে কারণে প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট ৫০টি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও ৯৮টি পেজও বন্ধ করে দিয়েছে মেটা। আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মটি তখন জানিয়েছিল, এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আওয়ামী লীগ ও সিআরআইয়ের সঙ্গে যুক্ত।