আয়নাঘর রহস্য

‘ওরা কোমরের নিচে লাঠি দিয়ে পেটাতো আর বৈদ্যুতিক শক দিতো’

কয়েক বছরের আইনি লড়াইয়ের পর দাবি আদায় হওয়ায় শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক (বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা) ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ টেলিকমের বিরুদ্ধে ১১০টি মামলা ২০২২ সালের ২৩ মে তুলে নেন প্রতিষ্ঠানটির ইউনিয়ন নেতা ও কর্মচারীরা। এর প্রায় এক মাস পর ৩০ জুন গ্রামীণ টেলিকম ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মাহমুদ হাসানকে সাদা পোশাকধারী ২০-২৫ জন লোক তুলে নিয়ে যায়। তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে তারা। 

সেইসঙ্গে তাদের নির্দেশ না মানলে ফিরোজের পরিবারের সবাইকে তুলে নিয়ে আসারও হুমকি দেওয়া হয়। তারা ফিরোজের একটি জবানবন্দি রেকর্ড করতে চেয়েছিল, যেখানে তিনি বলবেন যে মামলা তুলে নিতে শ্রমিকদের রাজি করানোর জন্য ইউনিয়ন নেতারা গ্রামীণ টেলিকমের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিল।

মীণ টেলিকম ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মাহমুদ হাসান।

আয়নাঘরে ফিরোজের বন্দিদশা ছিল মাত্র সাত দিন। একই সময় বন্দি হন তার সহকর্মী ইউনিয়ন সভাপতি কামরুজ্জামান। তারা বলেন, ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে তাদের বাধ্য করা হয়েছে। তাদের আরও বাধ্য করা হয়, তারা যেন দাবি করেন টাকার বিনিময়ে গ্রামীণ টেলিকম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গোপনে একমত হওয়ার পরে নোবেল বিজয়ী তার বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারে শ্রমিকদের বাধ্য করেছেন।

যেদিন ফিরোজকে তুলে নেওয়া হয় সেদিন সম্পর্কে তিনি বলেন, সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে রাতের খাবার খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখন তাদের নজরে আসে, দেড় বছরের বাচ্চার জন্য বাসায় দুধ নেই। খাওয়ার আগে বাচ্চার জন্য দুধ কিনতে বাসার পাশেই মিরপুরের ইসিবি চত্বরে একটি দোকানে যান ফিরোজ। বাড়ি ফেরার পথে মুখোশধারীরা তার পরিচয় জানতে চায়। তারা ফিরোজের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় এবং তাকে তুলে নিয়ে যায়। গাড়িতে উঠেই তার চোখ বেধে দেয়। ফিরোজ তাদের কাছে অনুরোধ করেছিল বাচ্চার দুধটা একটু বাসায় পৌঁছে দিতে। তারা দেয়নি।

এর কয়েক ঘণ্টা পর ফিরোজকে নেওয়া হয় একটি বন্দিশালায়। ফিরোজ জানতেন না যে এটাই সেই ‘আয়নাঘর’। তার চোখ খুলে দেওয়া হয়। আয়নাঘরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ফিরোজ বলেন, আমি রাত না দিন বুঝতে পারিনি। এমনকি আজানও শুনিনি। যখন মেলামাইনের প্লেটে নাস্তা নিয়ে আসতো তখন বুঝতে পারতাম সকাল হয়েছে। ছোট্ট একটি সেলে থাকতেন ফিরোজ। ৩ ফুট চওড়া এবং ৬-৭ ফুট লম্বা ছিল।  সেলের তিন দিকে কংক্রিটের দেওয়াল। একটি লাইট, একটি ফ্যান, একটি পানির বোতল এবং একটি কম্বল ছাড়া আর কিছুই ছিল না সেখানে। ফিরোজ বলেন, বাইরে থেকে কোনো আলো, শব্দ বা বাতাস তার কক্ষে পৌঁছায়নি। বাল্বটি সবসময় জ্বলতো। যখনই আমার টয়লেট ব্যবহার করার প্রয়োজন হতো, আমি হাত বাড়াতাম, তখন একজন প্রহরী আসতো। আমি অনুমান করি তারা ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভির মাধ্যমে আমাকে পর্যবেক্ষণ করত। তারা আমার কোমর থেকে নিচে লাঠি দিয়ে প্রচণ্ড মারধর করত এবং একটি স্টিলের চেয়ারে হাত বেঁধে বসিয়ে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে নির্যাতন করত। আমি ভাবতাম যে কোনো দিন আমাকে হত্যা করা হবে, আমার পরিবারকে আর আমি দেখতে পাব না। সাত দিন নির্যাতনের পর ৬ জুলাই ভোরে ফিরোজকে ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

সেখানে কামরুজ্জামানের সঙ্গে তার দেখা হয়। যিনি ফিরোজের মতো একই সময়ে আটক ছিলেন এবং একই রকম অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে যান। এরপর তাদের দুই জনকে জালিয়াতি ও আত্মসাতের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ডে নিয়ে ফিরোজ ও কামরুজ্জামানকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি হিসেবে একটি স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করতে বাধ্য করা হয়। ফিরোজ বলেন, সেই স্ক্রিপ্টের একটি অনুলিপি আদালতে জমা দেওয়া হয়েছিল। এরপর তার আইনজীবী জামিনের আবেদন করলে প্রতিবারই তা নাকচ করে দিয়েছেন আদালত। ৯ মাস জেলে থাকার পর অবশেষে ২০২৩ সালের এপ্রিলে জামিন পান ফিরোজ।

ফিরোজ বলেন,  এ ঘটনা এতদিন মুখ খোলার সাহস পাইনি ভয়ে। কিন্তু ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে পালিয়ে যাওয়ার পর সেই অন্ধকার সময়ের কথাগুলো সবাইকে বলার সাহস পাচ্ছি।