এসএন করপোরেশনেই ১৫ বছরে ১২ জন মারা গেছে

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের এসএন করপোরেশন নামে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় বিস্ফোরণে দগ্ধদের মধ্যে একজন মারা গেছেন। মারা যাওয়া ব্যক্তির নাম আহমেদ উল্লাহ (৩৮)। তিনি ঐ প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শুধু এসএন করপোরেশনেই গত ১৫ বছরে ১৩টি দুর্ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ২৫ জন। এই বিস্ফোরণের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশগত ছাড়পত্র স্থগিত করা হয়েছে। কেন তাদের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে না, সে বিষয়ে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। গত ৯ বছরে চট্টগ্রাম শিপইয়ার্ডে ১২৪ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ইত্তেফাককে বলেন, ‘এই ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছি, এই শিল্পটি আসলেই আমাদের প্রয়োজন আছে কিনা? কারণ এটা এত গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হলে উন্নত দেশগুলোও স্থাপন করত। কেউ বলতে পারেন তাহলে আমাদের লোহার চাহিদা কীভাবে পূরণ হবে? এখন অধিকাংশ লোহা আমাদের আমদানি করতে হয়। এখন যদি আপনি শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের মালিকদের সঙ্গে কথা বলেন তাহলে তারা বলবে এটার বিশাল প্রয়োজন রয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশ আন্দোলনে যুক্তদের সঙ্গে কথা বলেন তারা বলবে এটা এখনি বন্ধ করতে হবে। ফলে আমি নিরপেক্ষ মানুষদের নিয়ে একটি কমিটি করব। তাদের কাজটা হবে, আসলেই এই শিল্পের প্রয়োজন আছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা। কারণ এই শিল্প আমাদের যে পরিমাণ পরিবেশ দূষণ করছে সেটাও তো দেখতে হবে। সাগরপাড়ে এই শিল্প না থাকলে সেখানে সবুজ বনায়ন হতো। পরিবেশ ভালো থাকত। ফলে সবকিছু মিলিয়ে আমাদের এই শিল্প নিয়ে ভাববার সময় এসেছে।’ 

আহত একজনের মৃত্যু : গত শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সীতাকুণ্ডের কুমিরা এলাকার এসএম করপোরেশন ইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় বিকট শব্দে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে শিপ ইয়ার্ডে আগুন ধরে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করে। এতে ১২ জন আহত হন। এর মধ্যে আট জন ছিলেন গুরুতর। এর মধ্যে একজন গতকাল জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় গুরুতর দগ্ধ আরও সাত জন এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক।

পরিবেশ ছাড়পত্র স্থগিত: পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, শুধু এই প্রতিষ্ঠানটিতেই গত ১৫ বছরে ১৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৫ জন আহত হয়েছেন। জানা গেছে, এর আগেও প্রতিষ্ঠানটিতে দুর্ঘটনার পর কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তিনি পার পেয়ে গেছেন। তবে জড়িতরা পার পাবে না বলে জানিয়েছেন পরিবেশ উপদেষ্টা।

এ বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী শওকত আলী চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘এ বিষয়ে তিনি কোনো কথা বলবেন না।’

শনিবারের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উপদেষ্টার নির্দেশে এসএন করপোরেশন (ইউনিট-২) ও এমটি স্বরাজ্য স্ক্র্যাপ জাহাজের পরিবেশগত ছাড়পত্র স্থগিত করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। কেন তাদের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে না, সে বিষয়ে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত, স্বরাজ্য স্ক্র্যাপ জাহাজের শিপ ব্রেকিং কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তাদের প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, এই দুর্ঘটনার ফলে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের পরিবেশগত ছাড়পত্রের কয়েকটি শর্ত লঙ্ঘিত হয়েছে। একইভাবে, স্ক্র্যাপ জাহাজের ছাড়পত্রের শর্তাবলিও ভঙ্গ করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মেসার্স এসএন করপোরেশন (ইউনিট-২) এবং এমটি স্বরাজ্য স্ক্র্যাপ জাহাজের পরিবেশগত ছাড়পত্র স্থগিত করা হয়েছে এবং শিপ ব্রেকিং কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি : বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা তদন্তে আট সদস্যের কমিটি করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়েছে। গতকাল চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক রাকিব হাসান এ কমিটি গঠন করেছেন। কমিটিতে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম গোলাম মোর্শেদ খানকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটির অন্য সাত জন সদস্য হলেন—শিল্প পুলিশের প্রতিনিধি, সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ কে এম রফিকুল ইসলাম, পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান, ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল মালেক, সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল উদ্দিন, সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসাইন এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক শুভঙ্কর দত্ত। কমিটিকে বিস্ফোরণে হতাহতের কারণ অনুসন্ধান ও ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ এবং এ ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সুপারিশমালা প্রণয়ন করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

৯ বছরে ১২৪ মৃত্যু : শিপইয়ার্ডে প্রায়ই এমন দুর্ঘটনায় হতাহত হচ্ছেন বহু মানুষ। গত ৯ বছরে (২০১৫ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত) দুর্ঘটনায় শিপ ইয়ার্ডগুলোতে নিহত হয়েছেন ১২৪ জন। বেসরকারি সংস্থা লেবার রিসোর্স অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার সূত্র জানিয়েছে, প্রতি বছরই শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পাশাপাশি ব্যাপক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা না রাখায় দুর্ঘটনার মূল কারণ বলেও মনে করছে সংস্থাটি। সংস্থাটির হিসেবে ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছরের ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১২৪ জন। এর মধ্যে ২০১৫ সালে ১৬ জন, ২০১৬ সালে ১৮ জন, ২০১৭ সালে ১৯ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন, ২০১৯ সালে ২৩ জন, ২০২০ সালে ১০ জন, ২০২১ সালে ৯ জন, ২০২২ সালে সাত জন, ২০২৩ সালে সাত জন এবং চলতি বছর দুর্ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন। চলতি বছরে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে শিপ ইয়ার্ডগুলোতে ১২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

লেবার রিসোর্স অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘শিপইয়ার্ডে গত শনিবারের দুর্ঘটনাটি খুব বেশি ভয়াবহ ছিল। ১২ জন আহতদের মধ্যে আট জনের অবস্থা গুরুতর। গ্যাস দিয়ে জাহাজের ধাতব অংশ কাটতে গিয়ে আগুন গিয়ে পড়ে অয়েল ট্যাংকে। এতেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। যে শিপইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে সেটি গ্রিন শিপইয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। এসব ইয়ার্ড ঝুঁকি এড়াতে অনেক নিয়মকানুন মেনে চলে। তাই গ্রিন শিপইয়ার্ডে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫টি শিপইয়ার্ড আছে। সেগুলোর মধ্যে গ্রিন শিপইয়ার্ড আছে মাত্র চারটি। তাদের অবস্থাই যদি এমন হয় তাহলে পরিস্থিতি তো ভয়াবহ বোঝাই যায়।’