রাবির মনোবিজ্ঞান বিভাগের দুই শিক্ষিকাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে যৌন হয়রানির অভিযোগকারী দুই শিক্ষিকাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন শিক্ষার্থীরা। বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মনোবিজ্ঞান বিভাগের সামনে দুই শিক্ষিকার ছবি সম্বলিত ব্যানারে ‘অবাঞ্ছিত ঘোষণা’ লিখে বিভাগের সামনে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পাঁচ দফা দাবিও জানিয়েছেন তারা। 

অভিযুক্তরা হলেন অধ্যাপক ড. মাহবুবা কানিজ কেয়া ও অধ্যাপক ড. নাজমা আফরোজ। শিক্ষার্থীরা আক্রমণাত্মক আচরণ, পর্যাপ্ত ক্লাস না নেওয়া ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়ম-অবিচারের অভিযোগ এনে অধ্যাপক ড. মাহবুবা কানিজ কেয়াকে; অন্যাদিকে শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা, রুমে ডেকে হুমকি ও মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া এবং মিথ্যা মামলার ভয় দেখানোর অভিযোগে অধ্যাপক ড. নাজমা আফরোজকে বিভাগে অবাঞ্চিত ঘোষণার কথা বলা হয়েছে। 

গত ১৫ সেপ্টেম্বর মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজমা আফরোজ তার বিভাগীয় সহকর্মী অধ্যাপক এনামুল হকের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। এতে বলা হয়, বিভাগীয় সভাপতি গত ৮ সেপ্টেম্বর শিক্ষকদের মিটিং ডাকেন। সেখানে সভাপতির কাছে এজেন্ডা জানতে চাইলে তিনি সঠিক উত্তর না দিয়ে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকেন। এক পর্যায়ে বিভাগের কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী ও বহিরাগত ৫২৫তম সিন্ডিকেট সভার ৩৮নং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিভাগের যৌন নিপীড়নের অভিযোগে শাস্তিপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. এনামুল হককে বিভাগে ফেরত আনার দাবিতে হট্টগোল শুরু করেন। এ বিষয়ে আলোচনার কথা বলে সভাপতি ও তার অনুগত ২-১ জন শিক্ষক আমাদের মনোবিজ্ঞান গবেষণাগার-১ এ নিয়ে যান। সেখানে তারা অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষে শিক্ষার্থীদের লেলিয়ে দিয়ে বিভিন্ন কাগজপত্রে তার (নাজমা আফরোজ) স্বাক্ষর আদায়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। তিনি স্বাক্ষর দিতে অস্বীকার করায় সকল শিক্ষককে অভুক্ত অবস্থায় সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত উক্ত গবেষণাগারে আটক রাখা হয়। মুক্ত হবার পর সমস্ত ঘটনা পর্যালোচনা করে জানতে পারেন, যৌন নিপীড়ক শিক্ষক অধ্যাপক ড. এনামুল হক কতিপয় সহযোগী ও বখাটে শিক্ষার্থীর মাধ্যমে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাদের আটক রাখেন। অভিযুক্ত শিক্ষক ও বিভাগের সভাপতি সহ তাদের সহযোগী ২-১ জন শিক্ষকের কারণে বিভাগে পাঠদানের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

অন্যদিকে গত ১১ সেপ্টেম্বর সভাপতির অফিস কক্ষে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। বিভাগে অধ্যাপক নাজমা আফরোজ, নূরে আলম সিদ্দিকী, কাজী ইমরুল কায়েশ, মাহবুবা কানিজ কেয়া ও সাদেকা বানুর নেমপ্লেট ভাংচুর এবং বিভাগের অফিস কক্ষে তালা লাগিয়ে ফুলের টব ভাংচুর করে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। পরে প্রক্টর ও ছাত্র উপদেষ্টার উপস্থিতিতে তারা (শিক্ষক) সেখান থেকে মুক্ত হন।

২০২৩ সালের ২১ মে মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এনামুল হকের বিরুদ্ধে অশালীন অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন ও যৌন হয়রানিমূলক আচরণের অভিযোগ তুলে অধ্যাপক ড. নাজমা আফরোজ ও তৎকালীন বিভাগীয় সভাপতি অধ্যাপক মাহবুবা কানিজ কেয়াসহ বিভাগের ৯ জন শিক্ষক উপাচার্য বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২৫তম সিন্ডিকেট সভায় অধ্যাপক এনামুল হককে দুই বছরের জন্য একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এদিকে শিক্ষার্থীদের ৫ দফায় বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীদের হুমকি প্রদান ও ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে রেজাল্ট ট্যাম্পারিং করতে পারবেন না; শিক্ষকদের দলাদলি বা রেষারেষি বন্ধ করতে হবে; অধ্যাপক নাজমা আফরোজ ও অধ্যাপক মাহবুবা কানিজ কেয়াকে অব্যাহতি দিতে হবে; দলীয় প্রতিহিংসার শিকার অধ্যাপক এনামুল হকের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ প্রত্যাহার ও দুই কর্মদিবসের মধ্যে তাকে একাডেমিক কাজে ফিরিয়ে আনতে হবে; পরিচ্ছন্নতাকর্মী শ্রী রাম হেলাকে বিভাগে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং সকল শিক্ষককে লিখিত দিতে হবে, তারা সকল কার্যক্রম (ক্লাস, পরীক্ষা, রেজাল্ট) রুটিন মাফিক করবেন।

এ বিষয়ে অধ্যাপক মাহবুবা কানিজ কেয়ার ফোনে একাধিকবার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি। আর অধ্যাপক নাজমা আফরোজ বলেন, শিক্ষার্থীরা তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে, কেন করেছে, এমন কোনো খবর জানি না। কেউ এখনো বিষয়টি অবহিত করেনি। তবে সম্প্রতি আমার সঙ্গে পরপর দুইদিন খুব বাজে ঘটনা ঘটেছে। খুব ভীতিকর অবস্থার মধ্যে রয়েছি। কোনভাবেই স্বাভাবিক হতে পারছি না। যৌন নিপীড়ক শিক্ষক ড. এনামুল শাস্তি থেকে অব্যাহতির জন্য শিক্ষার্থীদের আমার পেছনে লেলিয়ে দিয়েছেন। আমি সঠিক বিচারের আশায় উপাচার্য বরাবর অভিযোগ দিয়েছি। থানায় জিডি করবো বলেও ভাবছি।

মনোবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মজিবুল হক আজাদ খান বলেন, ছাত্ররা তাদের দাবি নিয়ে বিভাগের সামনে অবস্থান নিয়েছিলেন। শুনেছি তারা বিভাগের দুজন শিক্ষককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। তবে এ বিষয়ে তিনি অফিসিয়াল বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। 

এ ঘটনার বিষয়ে অধ্যাপক এনামুল হক বলেন, এসব বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমার সঙ্গে তো বিভাগের আপাতত কোনো সম্পর্ক নেই। কে বা কারা এসব করছে, বুঝতে পারছিনা। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব বলেন, মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজমা আফরোজ লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি বেশ জটিল। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।