জাবির সাবিল
মানসুর মোহাম্মদ এল শোয়াইম
১.
ঠিক ছ’টা পাঁচ মিনিটের সময় নোকিয়া মোবাইল ফোনের অ্যালার্মের শব্দে সিটিজেন জাবির সাবিলের ঘুম ভেঙে যায়। প্রতিদিনের মতো সে মাথার বালিশ দিয়ে মুখমণ্ডল চেপে ধরে। কেননা সে তখন জঘন্য ধরনের দুর্বলতা অনুভব করে—সে নড়াচড়া করতে পারে না। তার মস্তিষ্কের অন্দরে অ্যালার্মের শব্দ একটানা বাজতে থাকে এবং হাতুড়ির মতো আঘাত করতে থাকে। যা হোক, শেষ অবধি সে আপনমনে স্থির করে যে, বিছানার পাশের টেবিলের দিকে হাত বাড়াবে এবং শব্দটা বন্ধ করবে। শব্দ থেমে যাওয়ার পরে বুকের মধ্যে ধুকপুকানির গতি শ্লথ হওয়ার জন্য সে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করবে এবং তারপর একসময় বিছানা থেকে নামবে। কিন্তু পুনরায় সে দুর্বলতা অনুভব করে। তার উভয় হাতে, মাথায়, এমনকি সমস্ত শরীরে কোনো বোধশক্তি নেই।
সিটিজেন জাবির সাবিল অতিশয় বেদনাদায়ক একধরনের অনুভূতি অনুধাবন করে। তার সেই অনুভূতিটা ছিল এরকম :সে একটা অদ্ভুত কিছুতে রূপান্তরিত হয়েছে। সে আগের মতো মানুষ নেই, যে বিগত রাতে দেরি করে ঘুমিয়েছে এবং বিকেলে দীর্ঘ সময় কাজ করার জন্য শারীরিকভাবে প্রচণ্ড পরিশ্রান্ত ছিল। তবে মানসিকভাবে সে তার নিজের অস্তিত্ব আন্দাজ করতে পারে এবং পুরোপুরি নিশ্চিত যে, সে ধাতুর তৈরি একটা ভয়ঙ্কর কিছুতে পরিবর্তিত হয়েছে। বিছানার ওপর যে জায়গায় ঘুমিয়েছিল, সেখানে সে স্থবির এবং শক্ত কিছুর মতো শুয়ে আছে।
২.
সিটিজেন জাবির সাবিল শক্ত এবং কঠিন অবয়বের সঙ্গে, যা তার মাংসল দেহকে পরিবর্তিত করেছে, অভ্যস্ত হতে বেশ কিছুটা সময় ব্যয় করে। তারপর সে রাস্তা থেকে ভেসে আসা স্কুলগামী প্রাণচঞ্চল ছেলেমেয়েদের হৈহুল্লোড় শুনতে পায়। এছাড়া তার কানে আসে সস্তা শাকসবজি ও গৃহস্থালী সামগ্রী বিক্রেতা এবং দুধওয়ালার হাঁকডাক। ঘরের মধ্যে যখন সিলিংয়ের ফাটল দিয়ে সূর্যের আলো আসা শুরু করে, তখন তার মধ্যে একটা অদ্ভুত অনুভূতি সৃষ্টি হয়। রীতিমতো আতঙ্কিত হওয়ার পরেও সে স্মরণ করে যে, সরকারি অফিসে বেতন কাটা এবং কঠোর মনিবের তিরস্কার শোনার ভয়ে সে গত রাতে দীর্ঘ সময় কাজ করেছে। চটজলদি বিছানা থেকে ওঠার জন্য সে আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু তার ধাতুর তৈরি ভারী শরীর তাকে বিরত রাখে এবং পুনরায় বিছানায় টেনে নেয়। ভয় এবং আতঙ্কে সে ভাবে :
‘আমি লোহার তৈরি। আমি লোহাতে রূপান্তরিত হয়েছি।’
৩.
অনেকক্ষণ কসরত করার পরে অবশেষে সিটিজেন জাবির সাবিল বিছানা থেকে নিচে পড়ে যেতে পেরেছে। সত্যি বলতে কি, সে তার সদ্য পরিবর্তিত লৌহনির্মিত পুরো শরীরটাকে কংক্রিটের মেঝেতে ছুড়ে ফেলেছে। প্রচণ্ড শব্দ শোনার পরে সে আবিষ্কার করেছে তার পা জোড়া আগের মতোই লম্বা এবং সরু। সে পায়ের ওপর ভর করে কোনোভাবে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। সেই সময় ওয়ারড্রোবের মাঝখানে বিশাল আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখে সে স্খলিত পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে অন্য আরো কিছু আবিষ্কার করে, যেমন জোড়া চোখের বদলে তার একটি মাত্র চোখ। তবে এক চোখের দৃষ্টিক্ষমতা অত্যন্ত প্রখর এবং সেই এক চোখে সে ওয়ারড্রোপের মধ্যে সমস্ত জিনিসপত্র স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
সিটিজেন জাবির সাবিল লৌহনির্মিত সরু পা তোলার আগে কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ায়। তারপর সে আয়নার সামনে নিজেকে স্থাপন করে। তার সেই নতুন অবয়ব দেখার পর সিটিজেন জাবির সাবিল অপ্রত্যাশিত মানসিক আঘাত পেয়ে অদ্ভুত স্বরে কাঁদতে থাকে এবং রীতিমতো ভড়কে গিয়ে উন্মাদের মতো নিজের চতুর্দিকে চড়কির মতো ঘুরতে শুরু করে। একটা চোঙ্গা থেকে অগণিত বুলেট বেরিয়ে এসে তার দেহের সামনের দিকে সেঁটে যায়। এছাড়া অসংখ্য বুলেট উড়ে গিয়ে দেয়াল এবং ঘরের সমস্ত আসবাবপত্রের গায়ে গিয়ে আটকে যায়।
৪.
সিটিজেন জাবির সাবিল নিজের রূপান্তরিত নতুন যান্ত্রিক অবয়ব দেখে ভীষণভাবে মুষড়ে পড়ে। যান্ত্রিক অবয়ব দেখতে অনেকটা মেশিনগান ও চার-নলা বন্দুকের মাঝামাঝি কোনো অদ্ভুত অস্ত্রের মতো। তার এই যান্ত্রিক দেহে ছিল দূরবীক্ষণের মতো মারাত্মক চোখ এবং নরকের মতো জ্বলজ্বলে মুখ। এছাড়া বলিষ্ঠ পা দুটি দেখতে মনে হয়েছিল যেন মৃত্যুকে ভর করে দাঁড়ানোর জন্যই তৈরি করা হয়েছে। তার বিধ্বস্ত অনুভূতি আরো খারাপের দিকে যায় যখন সে দেখে যে তার জ্বলন্ত শরীর থেকে মারাত্মক বুলেটগুলো সব দিকে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে তার শরীর লাফঝাঁফ দিচ্ছে এবং একসময় তাকে রাস্তায় টেনে নিয়ে যায়।
সিটিজেন জাবির সাবিলের চলার পথের পেছনে পড়ে থাকে মৃত্যুর সারি এবং চতুর্দিকে ধ্বংসের চিহ্ন।
রাক্ষস
লিন্ডা মুসিতা
টেলিফোন বেজেছিল। মা তুলেছেন। তিন মিনিট ‘হ্যালো’ বলার পরও মা অপরপ্রান্তের কথা শুনছিলেন।
‘ধন্যবাদ,’ সব শেষে মা বললেন। তারপর তিনি তাঁর শোবার ঘরে যান এবং একটু পরেই বেরিয়ে আসেন। তাঁর পরনে পশমের কোট।
‘আয়, শবাগারে গিয়ে তোদের ভাইকে ‘ম্যান্ডিকেট’ করতে হবে।’
‘ম্যান্ডিকেট? সেটা কী?’ বেন এবং আমি মাকে অনুসরণ করে গাড়ির দিকে যাওয়ার পথে জিজ্ঞাসা করি।
মা নিশ্চুপ, মুখে কোনো কথা নেই।
*****
মা আমাকে টাকা দেন।
‘তাকে বলিস তোকে যেন এক কিলোগ্রামের এক-চতুর্থাংশ দেয়।’
আমি মা’র হাত থেকে টাকা নিই। টাকা নেওয়ার সময় আমার বুড়ো আঙুলে তাঁর লম্বা গোলাপি রঙের নখের আঁচড় লাগে। সবসময়ই এমন হয়। তাঁর হাত থেকে যা কিছু নিই না কেন, প্রতিবার আমার বুড়ো আঙুলে আঁচড় লাগবেই। আমি বিশ্বাস করতাম এবং এখনো বিশ্বাস করি যে, এর একটা নিজস্ব জীবন রয়েছে, যা মায়ের থেকে আলাদা।
হাতের মুঠোয় টাকা নিয়ে আমি শবাগারে যাই। অ্যাপ্রোন পরিহিত এবং মাথায় পাচকের টুপি পরা লোকটি চুল্লির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে একাধিক চুল্লি। প্রত্যেকটির গায়ে নামফলক রয়েছে। সেসব চুল্লিতে মাংস, যকৃত্, অন্ত্র, শিশ্ন, উরোজ এবং অন্যান্য অঙ্গ-পতঙ্গ পোড়ানো হচ্ছে। সবগুলো চুল্লির পাশে একটা পাত্র এবং ছোট একটা তুলি আছে, যা দেখতে রং করার তুলির মতো।
আমার ভাগ্য ভালো যে, লোকটি একটা নির্দিষ্ট চুল্লির পাশে দাঁড়িয়েছে এবং সেই চুল্লির পরিচয়পত্রে লেখা : মৃতের নাম : এমওয়াচাকু অ্যালোনসো। সে-ই ছিল আমার ভাই। আমি লোকটির হাতে একটা পাঁচ শ’ টাকার নোট তুলে দিই।
‘মা এক কিলোগ্রামের এক-চতুর্থাংশ দিতে বলেছেন,’ আমি তাকে বললাম।
লোকটি টাকা নেয়।
‘আমি কি ফালি করে কাটবো?’ লোকটি জিজ্ঞাসা করে।
‘আমার মনে হয়, তা-ই করেন,’ আমি বললাম।
লোকটি পাত্রের মধ্যে তুলি রাখে এবং পাত্রের তরল পদার্থ দিয়ে কিলোগ্রামের এক-চতুর্থাংশের ওপর লেপন করে। তারপর সে ধারালো ছুরি দিয়ে ফালি করে কাটে। একটা থালার মধ্যে কাটা মাংস রাখার পর সে স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি জীবাণুমুক্ত পরিষ্কার আরেকটা বাটি উপুড় করে ঢেকে দেয়। সে তার চর্বি মাখানো আঙুল চাটে এবং একসময় আমার হাতে ‘শবদেহ’ তুলে দেয়।
‘এই নাও। তোমার পরিবারের প্রতি আমার সহানুভূতি থাকলো।’
*****
মা এবং বেন দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে।
অন্যসব সময়ের মতো মা স্বাভাবিকভাবে অনুযোগ করেন, ‘তোকে পঁই পঁই করে বলে দিয়েছি। এসব টুকরা যেমন পুরু হওয়ার কথা ছিল, সেই রকমের পুরু নয়। তোর ভাই ছিল নাদুস-নুদুস।’
বেন কিছু বলল না। তার পরিবর্তে সে একটা টুকরা তুলে নেয় এবং কড়মড় করে চিবাতে থাকে। আমি ভাবলাম, এটা অপ্রাকৃতিক এবং শতভাগ অস্বাভাবিক। আমির মায়ের দিকে তাকাই। মায়ের মুখভঙ্গি স্বাভাবিক, যেন এটা কোনো বিষয়ই নয়। এমনকি তিনি অ্যালোসোর এক টুকরা মাংস তুলে নেন এবং না চিবিয়ে চটজলদি মুখের ভেতর চালান করেন।
‘এই নে, শেষ কর!’ আমাকে উদ্দেশ্য করে মা ধমকের স্বরে বললেন।
তারপর মুহূর্তেই কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে তিনি আরো বললেন, ‘আমার মনে হয় আমাদের খাওয়া শেষ করার আগেই তোদের বাবা তার রক্ষিতাকে নিয়ে এখানে চলে আসবে।’
বেন অ্যালোনসোর মাংস এমনভাবে চিবাচ্ছে যেন সে পোড়া মুরগির মাংস খাচ্ছে। ঠোঁট চেটে সে পুনরায় ভালো টুকরা নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করে।
আমি এক টুকরা মাংস নিয়ে খাই এবং দু মিনিটের মধ্যেই আমার মুখের ভেতর লালা জমে। লবণাক্ত লালা। আমার চোখ অশ্রুতে ভরে যায়। আমি গলার ভেতর জঘন্য ব্যথা অনুভব করি। উদ্গীরণের সময় সাধারণত : এ ধরনের ব্যথা হয়। অন্য আরো জিনিসের সঙ্গে গলার ভেতর থেকে অ্যালোনসো বেরিয়ে আসে। আমার ভীষণ কষ্ট হয়।
প্রচণ্ড রাগে মা অগ্নিমূর্তি ধারণ করেন।
‘তুই তো জানিস, কবর দেওয়ার মতো আর কোনো জমি অবশিষ্ট নেই। কী, জানিস না?’
‘হ্যাঁ, জানি মা। কিন্তু ...’
‘খেয়ে নে! পানশালা এবং রেস্তোরাঁর লোকজন আসার আগে নিদেন হলেও তোর ভাইয়ের কিঞ্চিত্ অংশ তোর মধ্যে রাখতে হবে।’
দু টুকরা নেওয়ার পরেও কাজ হয়নি। এবার আমি মাংস গিলে খাইনি। হাত দিয়ে থুতনি ধরে জোরে নাড়া দিই। মা আমার কান টেনে ধরেন এবং কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেন ব্যথায় চিত্কার করার সময় কুঁকড়ে যাওয়া আমার মুখ এবং চাপাস্বরের ফোঁপানি।
ওরা সবাই মিলে এক কিলোগ্রামের এক-চতুর্থাংশের বাকিটুকু সাবাড় করে থালা-বাটি ফেরত দেয়। তারপর আমরা বাড়ি ফিরে যাই। মা’র পশমের কোটের ভাঁজে হিম জমে আছে এবং তিনি অভিযোগ করেন।
লেখক পরিচিতি
সমকালীন সুদানি কথাসাহিত্যের উদীয়মান অন্যতম লেখক মানসুর মোহাম্মদ এল শোয়াইম। তাঁর জন্ম দক্ষিণ দাফুরের নায়ালায়, ১৯৭০ সালে। একাধারে তিনি একজন ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প লেখক, সম্পাদক এবং সাংবাদিক। তিনি মাত্র কুড়ি বছর বয়সে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন এবং ১৯৯৫ সালে তাঁর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এ পর্যন্ত তাঁর ঝুলিতে রয়েছে তিনটি উপন্যাস এবং দুটি ছোটগল্প সংকলন। তাঁর প্রথম উপন্যাসের শিরোনাম ‘তুখৌম আর-রামাদ’। তিনি দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দাখিরাত শিরির’ (ইংরেজিতে ‘দ্য বাউন্ডারি অব অ্যাশ’)-এর জন্য সুদানের স্বনামধন্য এবং আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে সুপরিচিত লেখক তায়েব সালিহ্র নামানুসারে ‘তায়েব সালিহ্ অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। পরবর্তীসময়ে উপন্যাসটি ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়। এছাড়া তাঁর অন্যান্য উপন্যাস এবং ছোটগল্প ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। চল্লিশ বছরের কম বয়সের উদীয়মান আরব বিশ্বের লেখক হিসেবে তিনি ২০০৯-১০ সালে ‘হে ফেস্টিভ্যাল’-এর ‘বৈরুত ৩৯ প্রজেক্ট’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। তাঁর সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘দ্য লাস্ট সুলতান’। এই উপন্যাস লেখার জন্য তিনি ‘আরব ফান্ড ফর আর্টস অ্যান্ড কালচার’ ফান্ড লাভ করেন।
কেনিয়ার নারী লেখক, সম্পাদক এবং আইনজীবী লিন্ডা মুসিতার জন্ম ১৯৮১ সালে। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন। তাঁর প্রথম ছোটগল্প প্রকাশিত হয় ‘আফ্রিকান চিলড্রেন স্পিক’ সংকলনে। তাঁর ছোটগল্প একাধিক দৈনিক খবরের কাগজে এবং ‘ব্রেইনস্টর্ম কেনিয়া’ ব্লগসহ বিভিন্ন ব্লগে প্রকাশিত হচ্ছে। ‘২০১০ কেইন প্রাইজ ফর আফ্রিকান রাইটিং’ পুরস্কারের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকার লেখক/লেখিকাদের পরামর্শক হিসেবে কাজ করার জন্য ‘স্টোরিময়া হে ফেস্টিভ্যাল ২০১২/১৩’-এর ফেলো নির্বাচিত হন। তিনি স্টার পত্রিকার সম্পাদক এবং বর্তমানে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে বসবাস করেন।