‘ঘর বাইন্ধে থাহনের লাইগ্গে সরহারি (সরকারি) একটু জাগা (জায়গা) লিজ নিছিলাম। আমার এই জাগাডাও ক্ষমতাশালী রশিদ দখল কইরা নিছে। জাগাত গেলে আমারে খারাপ ভাষায় গালাগালি করে। তাড়ায়া দেয়। নিজের এই জাগাটা থুইয়াও ১৫ বছর ধইরে আমার মাইনসের বাড়িত থাকতে অইতাছে। আমার জীবনডা তো মাইনসের বাড়িত থাইক্যা আর মাইনসের কাম (কাজ) কইরাই চইল্যা গেছে। অহন অন্তত মরার আগে আমার নিজের জাগাত আমি একটা ঘর বাইন্ধে থাকতাম চাই’- কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার দলপা ইউনিয়নের বেখৈরহাটী গ্রামের ষাটোর্ধ্ব ভূমিহীন অসহায় বৃদ্ধা রাবিয়া খাতুন।
সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকালে সরজমিনে গেলে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে আক্ষেপ নিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
বর্তমানে একই গ্রামের মনাফ নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রিতা হিসেবে বসবাস করে আসছেন বৃদ্ধা রাবিয়া। তার এক ছেলে ও দুই এক মেয়ে রয়েছে। এরমধ্যে এক মেয়ে বিধবা এবং অন্য মেয়েটার স্বামী চা দোকান চালায়। ছেলেটা দিনমজুরি করে আর রাবিয়া মানুষের বাড়িতে কাজ করে কোনো রকম সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাবিয়া খাতুন জানান, স্বামী বকুল মিয়া মারা গেছেন অনেক আগেই। সহায় সম্পদ কিছুই রেখে যাননি। এ অবস্থায় এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে অন্যের জায়গায় থেকে মানুষের কাছে হাত পেতে কোনো রকম জীবন চালিয়ে আসছিলেন তিনি। এরইমধ্যে ২০০৯ সালে সন্তানদের নিয়ে মাথা গোঁজার জন্য বেখৈরহাটী বাজারের বেখৈরহাটী নরেন্দ্র কান্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ সংলগ্ন ৬ শতাংশ সরকারি খাস জায়গা লিজ নেন। কিন্তু জায়গা লিজ নিলেও তার জায়গার অধিকাংশ দখল করে নেন স্থানীয় প্রভাবশালী আব্দুর রশিদ নামে এক ব্যক্তি এবং অন্য অংশটুকুও দখলে নিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করেন একই গ্রামের মাদেক মিয়া ও সাদেক মিয়া নামে দুই ভাই। সেই থেকে অসহায় রাবিয়া খাতুন স্থানীয় মাতব্বর, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও তার লিজ নেওয়া জায়গাটুকু উদ্ধার করতে পারছেন না। এ অবস্থায় তিনি সন্তানদের নিয়ে অদ্যাবধি অন্যের বাড়িতেই বসবাস করে আসছেন।
এ সময় স্থানীয় বাসিন্দা আসাদুজ্জামান, এবিএম রফিকুল হক ও আলী বাকের হোসেন শাওনসহ কয়েকজনের সাথে কথা হলে তারা জানান, রাবিয়ার মতো অসহায় মানুষ আমাদের এলাকায় খুব কমই আছে। এমন একজন মানুষের লিজ নেওয়া জায়গাটুকু দখল করে নেওয়া চরম অমানবিক। আমরা রশিদকে বহুবার জায়গাটা ছেড়ে দিতে বলেছি। কিন্তু রশিদ আওয়ামী লীগের প্রভাব কাটিয়ে গত ১৫ বছর যাবত তা দখল করে রেখেছে। কারো কথারই সে পাত্তা দেয় না। তাই আইনি প্রক্রিয়ায় জায়গাটা উদ্ধার করে রাবিয়াকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক- আমরা এমনটাই চাই।
বিষয়টি নিয়ে মাদেক ও সাদেক মিয়ার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে আব্দুর রশিদের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আমি কারো জায়গা দখল করিনি। এটা আমার ক্রয়কৃত জায়গা। তবে হয়তো রাবিয়ার লিজ নেওয়া জায়গার কিছু অংশ আমার এখানে থেকে থাকতে পারে। যদি থাকে তাহলে আমি তা ছেড়ে দিব।
তিনি আরও বলেন, রাবিয়াকে যে জায়গাটুকু লিজ দেওয়া হয়েছে, সেটা খালের জায়গা। এই খাল দিয়ে স্থানীয় হাওরের পানি নামে। তবে বর্তমানে খালটা প্রায় ভরাট হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমদাদুল হক তালুকদার বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।