শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর। একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত মানুষরূপে গড়ে ওঠার পেছনে বাবা-মার চেয়ে শিক্ষকের অবদান কোনো অংশে কম নয়। অথচ একশ্রেণির শিক্ষক ব্যক্তিস্বার্থে পদ-পদবি পেতে দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিতে জড়িত। শিক্ষার মান উন্নয়ন ও গবেষণা বৃদ্ধির পথে বড় বাধা এই শিক্ষক রাজনীতি।
সম্প্রতি দেশের পাঁচ জন শিক্ষাবিদ ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে এই অভিমত ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, শিক্ষকদের রাজনীতি নয়, শিক্ষকনীতি ও শিক্ষানীতি নিয়েই মাথা ঘামানো উচিত। বর্তমানে পড়ানোর চেয়েও রাজনীতিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন অনেক শিক্ষক। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগ ও পদোন্নতি হয় দলীয় বিবেচনায়। এ কারণে বাধ্য হয়ে রাজনীতি করেন অনেক শিক্ষক।
আজ শনিবার বিশ্ব শিক্ষক দিবস। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিবসটি উদযাপনের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। প্রতি বছর ৫ অক্টোবর ইউনেস্কো ঘোষিত নীতিমালা অনুযায়ী সারা বিশ্বে শিক্ষক দিবস উদযাপন করা হয়। দিবসটির প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে শিক্ষকদের রাজনীতির জালে আটকে পড়ার বিষয়গুলো।
শিক্ষার্থী ও সুশীল সমাজের বড় একটি অংশ শিক্ষক রাজনীতির বিরুদ্ধে। তারা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধ না হলে ক্লাসরুমের শিখন নিশ্চিত করা কঠিন। তবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার পেছনে নানা যুক্তি দিয়ে থাকেন শিক্ষকরা।
তাদের দাবি, নিয়োগ-পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধার জন্য লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিতে যুক্ত না হয়ে উপায় থাকে না। এসব কারণে অনেক শিক্ষক পাঠদানের চেয়ে দলীয় নেতা-নেত্রীদের চাটুকারিতায় বেশি আগ্রহী। তাদের ভাষ্য, রাজনীতি না করলে চাকরির নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক সরাসরি রাজনৈতিক দলের সদস্য। তারা শিক্ষকতার চেয়ে বেশি সময় দেন দলীয় কর্মসূচিতে। কেউ কেউ দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের চেয়েও বেশি দলীয় আনুগত্য প্রদর্শনে ব্যস্ত থাকেন। এর প্রভাব পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম থেকে শুরু করে সর্বস্তরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামীপন্থি এবং বামপন্থি শিক্ষকরা সাধারণত নীল দলের রাজনীতি করেন, বিএনপি-জামায়াতপন্থি শিক্ষকরা সাদা দলের রাজনীতি এবং বামপন্থি হিসেবে পরিচিত শিক্ষকদের কেউ কেউ গোলাপি দলের রাজনীতি করেন। মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) ব্যানারে আওয়ামীপন্থি চিকিৎসক ও ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ব্যানারে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকরা রাজনীতি করেন।
সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক- রাজনীতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অনেক শিক্ষণ রাজনৈতিক প্রভাব হারানোর ভয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াননি। অনেক শিক্ষক চাইলেও সাহস করতে পারেননি। ফলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে ভয়াবহ চিড় ধরেছে।
শিক্ষার্থীরা এখন দাবি জানাচ্ছেন, তারা আর ক্যাম্পাসে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি চায় না। তাদের দাবি মেনে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ, বগুড়া জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকসহ সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন,‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখার মানখারাপ হওয়ার পেছনে শিক্ষক রাজনীতি দায়ী বলে আমি মনে করি।’
জানা গেছে, রাজনীতির বাইরে গেলে পদোন্নতি, স্কলারশিপ, আবাসিক শিক্ষক হওয়াসহ নানা সুযোগ- সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেড় ডজন শিক্ষক নেতা রয়েছেন, যারা নিয়মিত ক্লাস নেন না। রাজনীতিতে বেশি সময় দেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, ‘আমি সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না হওয়ার কারণে বছরের পর বছর আমার পদোন্নতির ফাইল আটকে ছিল। যারা রাজনীতি করতেন, শিক্ষক নেতাদের সারাক্ষণ সময় দিতেন, রাজনৈতিক প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করতেন, তাদের পদোন্নতি হয়েছে দ্রুত। এমনও শিক্ষক নেতা আছেন, যিনি মাসে একটার বেশি ক্লাস নেন না, প্রশ্নও তৈরি করেন না। কিন্তু দায়িত্বে অবহেলার কারণে তাদের কোনো শাস্তি হয় না।’
শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন
এদিকে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। শিক্ষাবিদরা বলেন, আমাদের দেশে শিক্ষাদানে নিয়োজিত শিক্ষকদের মধ্যে অনেকের ক্ষেত্রেই মানের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পর্যন্ত। মাধ্যমিকে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। অন্যদিকে, বর্তমানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মধ্যকার সেই সম্মানের সম্পর্কও হুমকির মুখে।
একসময় নিজের ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষকরা একই সঙ্গে কঠোরভাবে শাসন করতেন। আবার নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। শিক্ষার্থীরাও তাদের শিক্ষকদের মনে করত বাবা-মায়ের পর সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। শিক্ষকরা ছিলেন নির্ভরতার প্রতীক। অথচ বর্তমানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের চরম অবনতি হয়েছে শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষকদের নাজেহাল হওয়ার কিংবা তুচ্ছ কারণে তাদের ওপর হামলার খবর এখন প্রতিনিয়তই দেখা যায়।
সুবিধা বাড়ানোর তাগিদ
শিক্ষকদের সুযোগ- সুবিধা বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে দেশে দুই জন শিক্ষক নেতা বলেন, সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হওয়ার কারণেই ফিনল্যান্ডে সবচেয়ে মেধাবীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার ব্যাপারে অগ্রহী থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশের চিত্র উলটো। শিক্ষা বিভাগগুলো এখানে অবহেলিত। ফলে একজন শিক্ষক শিক্ষা ক্যাডার থেকে যেতে চান অন্য ক্যাডারে। কারণ অন্য বিশেষ ক্যাডারগুলোতে এত বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যে, এক জন শিক্ষককে তাদের সামনে নতজানু হয়ে থাকতে হয়। আমাদের দেশে শিক্ষকের মর্যাদা দিন দিন ক্ষুন্ন হচ্ছে এর জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বিদ্যমান ব্যবস্থা দায়ী। শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার ঘটনা প্রায়ই শোনা যাচ্ছে।
শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবি
শিক্ষার মান উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদ (বিপিসি) ও বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির (বাকশিস) নেতারা। এ সময় বক্তারা সুশাসনেবিপ্লব-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করারও আশ্বাস দেন। গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৪ উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান তারা। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ট্রেজারার অধ্যাপক মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান, অধ্যক্ষ ইসহাক হোসেন, অধ্যক্ষ সাহিদুন নাহার, শিক্ষক নেতা লিয়াকত আলী, অধ্যক্ষ রেজাউল কবির, অধ্যাপক সৈয়দ মুহাম্মাদ ইউসুফ, অধ্যাপক ইলিন মোহাম্মদ নাজমুল হোসেন, অধ্যক্ষ রফিকা আফরোজ, অধ্যক্ষ জহিরউদ্দিন আলম, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন মণ্ডল, অধ্যক্ষ এম এ মোনায়েম প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটিগুলো শিক্ষকদের ওপর নির্যাতন করে এগুলোর প্রতিকার করতে হবে। আদর্শ শিক্ষকরা এক চরম হতাশার মধ্যে দিনযাপন করছেন। ফলে সৃজনশীল চিন্তার উন্মেষ ঘটার পরিবর্তে সাধারণ দায়িত্ব পালন করার স্পৃহা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।