ক্রসরোডে দাঁড়িয়ে হিজবুল্লাহ, লেবাননের ভাগ্য কোন পথে?

ঘরোয়া সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব বা গৃহযুদ্ধের পথে না গিয়ে লেবানন কীভাবে হিজবুল্লাহর সঙ্গে নিজের জটিল সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারে, সেই প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে। গাজা যুদ্ধের দায়ে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে দাবি করেছেন যে, এই প্রশ্নের উত্তর আছে তার কাছে। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, 'লেবানিজদের অবশ্যই হিজবুল্লাহর কাছ থেকে লেবাননকে মুক্ত করতে হবে।' তিনি যোগ করেন, 'লেবাননকে বাঁচানোর সুযোগ আছে; তবে দীর্ঘ যুদ্ধের অতল গহ্বরে নিপতিত হওয়ার আগে, গাজার মতো ধ্বংস ও দুর্ভোগে পড়ার আগেই সেই সুযোগ নিতে হবে।'

গাজা যুদ্ধ নিয়ে উত্থাপিত আইসিসির (আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত) অভিযোগ প্রত্যাখ্যানকারী এই নেতা লেবাননের জনসংখ্যার ওপর গাজার মতো একই কায়দায় ধ্বংসাত্মক সামরিক কৌশল প্রয়োগের হুমকি দিচ্ছেন। তিনি যদি সত্যিই হিজবুল্লাহর সঙ্গে লেবাননের চুক্তিতে সাহায্য করতে চান, তাহলে তো ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালানোর কথা নয়। নেতানিয়াহু কি লেবানন ও হিজবুল্লাহর ইতিহাস ভুলে গেলেন?

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, হিজবুল্লাহর জন্ম হয়েছিল দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব প্রতিরোধ করার জন্য। ১৯৮২ সালে এই দখলবাজির খেলা শুরু হয়ে তা চলে ২০০০ সাল পর্যন্ত। ইসরায়েলের হাতে আক্রান্ত লেবাননকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রশ্নেই আবির্ভাব ঘটে সশস্ত্র হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর। এ গোষ্ঠীর বক্তব্য ছিল, ইসরায়েলি আক্রমণ প্রতিহত করাই হবে তাদের একমাত্র লক্ষ্য। এরপর বহু জল গড়িয়েছে, দিনে দিনে সম্প্রসারিত হয়ে কার্যপরিধি বাড়িয়ে নিয়েছে গোষ্ঠীটি। পাশাপাশি স্থানীয় লেবানিজদের সঙ্গেও জড়িয়েছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দ্বন্দ্বে। এই দ্বন্দ্বের জের ধরে বিভিন্ন সময় লেবাননের মাটি থেকে এর কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার দাবিও উঠেছে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলার কারণে আবার 'সেই পুরনো অজুহাত' খাড়া করার উপলক্ষ্য খুঁজে পেয়েছে হিজবুল্লাহ। ফলে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার প্রয়াস পাচ্ছে গোষ্ঠীটি।"

ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে যে সংঘাত ও পালটাপালটি হামলার ঘটনা ঘটছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে তেল আবিবের হাতে লেবাননের ভূখণ্ড বেদখল হওয়ার জোর শঙ্কা এখন অবধি লক্ষ করা না গেলেও, লেবানিজ সেনাবাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী একটি আধাসামরিক সংস্থাকে (হিজবুল্লাহ) লেবানিজরা কি শিগগিরই নিরস্ত্র করতে পারবে? অথচ দুঃখজনকভাবে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাতের লেবানিজরা পড়েছে উভয় সংকটে-একদিকে ইসরায়েল, আরেক দিকে হিজবুল্লাহ। ঠিক এমন একটি অবস্থার মুখে লেবাননের অভ্যন্তরীণ উপদলগুলো যদি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হাতে অস্ত্র তুলে নেয়, তাহলে আবারও গৃহযুদ্ধ ফিরে আসবে লেবাননের ঘরে। যদিও ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত লেবানিজরা বেশ ভালোমতোই অনুভব করেছে, গৃহযুদ্ধের দাবানল কতটা কঠিন, মর্মান্তিক হতে পারে।

মধ্যে পড়ে এই লেবানিজরা নিহত বা পঙ্গু হচ্ছে, 'সন্ত্রাসী' হিসেবে আখ্যায়িত হচ্ছে, শিকার হচ্ছে বাস্তুচ্যুতের। এক হিসাবে জানা গেছে, মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ লেবানিজ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।

অর্থাৎ, লেবানিজরা পড়েছে উভয় সংকটে-একদিকে ইসরায়েল, আরেক দিকে হিজবুল্লাহ। ঠিক এমন একটি অবস্থার মুখে লেবাননের অভ্যন্তরীণ উপদলগুলো যদি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হাতে অস্ত্র তুলে নেয়, তাহলে আবারও গৃহযুদ্ধ ফিরে আসবে লেবাননের ঘরে। যদিও ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত লেবানিজরা বেশ ভালোমতোই অনুভব করেছে, গৃহযুদ্ধের দাবানল কতটা কঠিন, মর্মান্তিক হতে পারে।
নেতানিয়াহুর প্রস্তাব (হিজবুল্লাহকে লেবানন থেকে বিতাড়িত করা) খালি চোখে ফাঁপা এবং নিষ্ঠুর বলে মনে হলেও বাস্তবতাকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা কারো নেই। ২০০০ সাল থেকে লেবাননের জন্য 'প্রধান নির্ধারক' হয়ে উঠেছে এই গোষ্ঠী। বিগত কয়েক দশক ধরে গোষ্ঠীটি জোর দিয়ে বলে আসছে যে, শুধু তারাই লেবাননকে ইসরায়েলি আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা রাখে। আজ থেকে ২৪ বছর আগে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে বিতাড়িত করার ইতিহাস আমলে নিলে তাদের দাবিকে মানতেই হয়। কিন্তু এর পরের ইতিহাস কী বলে? লেবানন থেকে ইসরায়েলের চলে যাওয়ার পর হিজবুল্লাহর সামরিক ভূমিকাকে কতটা বৈধ বলা যায়?

বিভিন্ন সময় লেবাননের ওপর বাইরে থেকে যেসব হামলা চালানো হয়েছে, তার সব কি হিজবুল্লাহ ঠেকাতে পেরেছে? ইসরায়েলি আক্রমণও কতটা ঠেকাতে পারছে তারা? বরং বলতে হয়, এর কর্মকাণ্ড লেবানন-ইসরায়েলি শত্রুতাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যার জলজ্যান্ত উদাহরণ ২০০৬ সালের যুদ্ধ এবং বর্তমান সময়ের মারাত্মক সংঘর্ষ।

বস্তুত, হিজবুল্লাহর কার্যপ্রণালি, অস্ত্রশস্ত্র, কর্মপরিকল্পনা-কোনো কিছুই তার নিজের নয়। বহু বছর ধরে ইরান ও সিরিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থনে এ গোষ্ঠী কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। এ কথা আজ আর গোপন নেই যে, তেহরান গোষ্ঠীটিকে ইসরায়েলের সঙ্গে চিরস্থায়ী সংঘাতে আটকে থাকা কয়েকটি প্রক্সি গ্রুপকে একটি আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের আওতায় রাখার 'শক্ত আঠা' হিসেবে গড়ে তুলেছে।

যাহোক, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইয়েমেন, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একটি সফল সংগ্রামের জন্য এ অঞ্চলের সব আঞ্চলিক ফ্রন্টের একীভূত হওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে হিজবুল্লাহকে লেবাননের বেশ দরকার বটে। ইসরায়েলকে ঠেকাতে হিজবুল্লাহর সাহায্যের প্রয়োজন পড়বে বৈরুতের, যেমনটি দেখা গিয়েছিল ২০০৬ সালে। সে সময় উত্তর ইসরায়েলে প্রবেশ করে দুই ইসরায়েলি সেনাকে বন্দি করে নিয়ে আসে হিজবুল্লাহ। অর্থাৎ, হিজবুল্লাহ যে লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও অস্তিত্বের জন্য অপিরহার্য-এ কথা অনস্বীকার্য।

কৌশলগতভাবে গাজা যুদ্ধে হামাসকে সহায়তা করতে গিয়েই ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে হিজবুল্লাহ। তবে এর পেছনে যে অন্য কোনো ঘটনা নেই, তেমন কথাও বলা যায় না। হিজবুল্লাহর প্রভু, তথা তেহরানের যে এ নিয়ে অন্য কোনো কৌশলগত লক্ষ্য নেই, সে কথাই- বা কে বলতে পারবে? সম্ভবত ইসরায়েলের ওপর একটি নতুন বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাতের মাধ্যমে যার মাধ্যমে এই বার্তা দেওয়া হবে যে, ফিলিস্তিন ও লেবাননের যুদ্ধক্ষেত্র আলাদা নয়, বরং অভিন্ন ফ্রন্ট!

উল্লেখ্য, গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে গাজা যুদ্ধ চলছে। সেই থেকেই হামাসের সমর্থনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়ছে হিজবুল্লাহ। লম্বা সময় ধরে লেবানন ও ইসরায়েল সীমান্তে উভয় পক্ষ পালটাপালটি রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করছে। তবে গত মাসে লেবাননে বোমা হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েল। আর এ মাসের শুরুতে শুরু করে স্থল অভিযান। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ইসরায়েলি স্থল অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। এদিকে, ইসরায়েলের সেনাঘাঁটিতে কয়েক দফা হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহও, যার ফলে ঘটেছে হতাহতের ঘটনা। ঠিক এমন একটি প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, 'আমরা বৈরুতসহ লেবাননের সব জায়গায় হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালিয়ে যাব। আর এ হামলা চলবে নির্দয়ভাবে।' অনেকের মতে, গত বছরের ৮ অক্টোবরের পর থেকে একই সঙ্গে হামাস ও হিজবুল্লাহকে টার্গেট করে এগোচ্ছে ইসরায়েল। আর এ কারণে হামাসের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার পর হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লেবাননে নতুন ফ্রন্ট চালু করার অংশ হিসেবে এর শীর্ষ নেতা হাসান নাসরাল্লাহসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক ও সামরিক কমান্ডারকে হত্যা করার মিশন হাতে নেয় ইসরায়েলি বাহিনী। এরই মধ্যে হিজবুল্লাহর সদর দপ্তরকে তারা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। 

এমনকি হিজবুল্লাহ বাহিনীতে অনুপ্রবেশ করেছে তারা, যেমনটা আগে কখনোই দেখা যায়নি। আর সবশেষ দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলির বেশির ভাগ এলাকা তারা ইতিমধ্যে খালি করে নিয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, এসব অঞ্চলে হিজবুল্লাহর খাঁটি রয়েছে। লেবানিজদের ভয় মূলত এই জায়গাতেই। কারণ, একইভাবে হামাসের ঘাঁটি আছে দাবি করে গাজা ভূখণ্ডকে ইসরায়েল মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে বোমা মেরে।

যাহোক, নিজেকে রক্ষা করতে এবং সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে লেবানিজদের 'এক কন্ঠে কথা' বলতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং কেবল লেবানিজদের সম্মিলিত শক্তিই পারে বৈরুতকে রক্ষা করতে।

লেখক: চ্যাথাম হাউজের সহযোগী ফেলো এবং দ্য ইউএস-মিডল ইস্ট প্র্যাকটিস অব ট্রেন্ডস রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভাইজরির বিভাগীয় প্রধান দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর: সুমৃৎ খান সুজন