কাজী রিয়াজ রহমানের নেতৃত্বে মাস্তুল ফাউন্ডেশন আজ সমাজের জন্য এক আলোকবর্তিকা, যে প্রমাণ করেছে, মানবসেবা শুধু একজন মানুষের দায়িত্ব নয়, বরং একটি শক্তিশালী, সুসংগঠিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
স্বপ্ন দেখতেন কিশোরবেলা থেকে মানুষের কল্যাণে কাজ করার। আর এই স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয় ২০১২ সালের ১৯ অক্টোবর। তার স্বপ্ন পুরণে গড়ে উঠে সমাজের এক মানবকল্যান সেবায় নিয়োজিত সংগঠন। তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং মানবসেবার অনুপ্রেরণায় বছরের পর বছর সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। শিশুদের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে তাঁদের দায়িত্ব নেওয়া থেকে শুরু করে দুর্ঘটনায় আহতদের সাহায্য করা, এমনকি করোনাকালে প্রথম সারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করে তিনি নিজেকে সমাজসেবায় নিবেদিত করেছেন।
যেভাবে শুরু:
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন একবার রবীন্দ্র সরোবরে আড্ডা গাওয়ার সময় পরিচয় হয় অসংখ্য পথশিশুর সঙ্গে। আবদার ছিল কিছু বই ও রংপেন্সিল দেওয়ার। বাসা থেকে পাঁচ-ছয়জনের জন্য সে আবদার পূরণ করতে গিয়েই দেখেন অপেক্ষমাণ প্রায় ৪০ জন। পথশিশুদের আগ্রহ আর উপেক্ষা করতে পারলেন না কাজী রিয়াজ রহমান। সাতপাঁচ না ভেবে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে তৈরি করে বসলেন পথশিশুদের জন্য একটি ছোট স্কুল। ১৯ শে অক্টোবর ২০১২ সালে কাজী রিয়াজ রহমানের জন্মদিনেই প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে শুরু হয় মাস্তুল ফাউন্ডেশনের পদযাত্রা।
মাস্তুল ফাউন্ডেশন বহুমুখী সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে নিজস্ব স্কুল, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও বৃদ্ধআশ্রম যেখানে শতাধিক পিতামাতাহীন অনাথ/এয়াতিম শিক্ষার্থী ও বৃদ্ধ- বৃদ্ধা বসবাস করেন। এর বাহিরে কয়েক জেলায় প্রজেক্ট স্কুলগুলোতে হাজারের অধিক সুবিধাবঞ্চিত মেধাবী শিক্ষার্থীদের সকল শিক্ষার উপকরন দেয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য, পুষ্টিকর খাবার, শিশু অধিকার, মৌলিক চাহিদা নিশ্চয়তা করা হচ্ছে। এছাড়া চিকিৎসা খাতে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে 'মাস্তুল এইড' প্রকল্পের মাধ্যমে অর্ধশতাধিকের অধিক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত অসচ্ছল পঙ্গুত্ববরণকারী রোগীদের চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি হুইলচেয়ার ও কৃত্রিম পা দিয়ে সাবলম্বী করছে। মাস্তুল ফাউন্ডেশনের রয়েছে সেলাই প্রশিক্ষন কেন্দ্র, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র যার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে কর্মক্ষম করে তোলা হচ্ছে। এর বাহিরে যাকাত স্বাবলম্বী প্রজেক্টের মাধ্যমে ১০০০ জনের বেশি মানুষকে স্বাবলম্বী করা হয়েছে। মাস্তুলের প্রধান কাজের মধ্যে রয়েছে দাফন-কাফন সেবা প্রজেক্ট, যার মাধ্যমে করোনার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৩০০০ এর অধিক লাশ দাফন হয়েছে। রয়েছে মাস্তুল মেহমানখানা, যেখান থেকে শতাধিক অসহায় নিম্ন আয়ের মানুষের একবেলা পেট পুড়ে খাওয়ার ব্যবস্থা হয়।
প্রতিবন্ধকতা
কাজী রিয়াজ রহমানের বলেন, সকল কাজ মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। তার সৃষ্টির সেবায় আমরা নিজেদের বিলিয়ে দিয়ে কাজ করে যাবো। জাতি, ধর্ম, বর্ন, নির্বিশেষে দেশের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর কল্যান সাধনের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জন। অবশ্যই কাজ করতে গেলে প্রতিবন্ধকতা আসবে। প্রতিবন্ধকতা ছাড়া কোন বৃহৎ উদ্দেশ্য সফল হয় না। শুরুতে পরিবারের অনুদান দিয়ে শুরু করলেও একসময় আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। এমনকি অফিসের ভাড়া বাকি থাকায় বাড়ির মালিক অফিস ছেড়ে দিতে বলেন। অনুদানের আশায় ঘুরেছি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে। শুধু তাই নয় করোনার শুরুতে অনুদান শূন্যতে নেমে এসেছিল। তখন ভেবেছিলাম এই বুঝি সব শেষ! কিন্তু না মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে করোনাকালীন সময়ে আমরা হাজারো মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি, নিজ হাতে করোনার মৃত ব্যক্তিদের গোসল ও দাফনসেবা দিয়েছি। কাজ করেছি মহান সৃষ্টিকর্তার আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং দেশের মানুষকে ভালবেসে আর তার দৃষ্টান্ত স্বরুপ মাস্তুল ফাউন্ডেশন পেয়েছে শুভাকাঙ্ক্ষীদের অসংখ্য ভালোবাসা।
ভবিষ্যৎ স্বপ্ন
এই পথচলায় দেশের উন্নয়নের জন্য আপনার আগামী পরিকল্পনা কি হতে পারে?
এর উত্তরে কাজী রিয়াজ রহমান বলেন, শোকর আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর অশেষ রহমতে এই ১২ বছরের চেষ্টায় আমরা কিছুটা হলেও দারিদ্র দূরীকরণে ভূমিকা রাখতে পেরেছি। মাস্তুল ফাউন্ডেশন এখন থেকে নিজস্ব আয়ের মাধ্যমে সকল দাতব্য কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এই লক্ষ্যে তারা ইনকাম জেনেরেটিং প্রোগ্রাম শুরু করেছে, এবং ইতিমধ্যে সফলভাবে পরিচালিত করছে। ইনশাআল্লাহ ২০৬২ সালে মাস্তুলের ৫০ বছর পূর্তিতে দেশের জিডিপিতে ০.৫% ভূমিকা রাখার চেষ্টা করবে মাস্তুল ফাউন্ডেশন।