ড্যাপ সংশোধন হতে পারে, বাতিল নয়

যেকোনো নগরীকে বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তোলার জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শহর নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণে কোনোভাবেই সক্ষম নয়। অতীতে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। এই শহর যখন গড়ে উঠেছে, তখন নগর পরিকল্পনা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু কালের বিবর্তনে শহরবাসীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, স্বাধীনতার পর যেটা হয়েছে লাগামছাড়া। 

একদিকে জনসংখ্যার মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি এবং সেই বর্ধিত জনস্রোতের জন্য আবাসনসুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নগর এলাকায় তুমির ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ বেড়েছে। আজ থেকে কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশই গ্রামে বাস করত। জিডিপির বড় অংশই আসত গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে। এখন জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ শহরে বাস করে। আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে শিল্প ও কলকারখানা শহরকেন্দ্রিক হওয়ার কারণে গ্রাম থেকে কর্মপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষ দ্রুত শহরমুখী হচ্ছে। 

মোট জিডিপির ৬০ শতাংশই আসে শহরকেন্দ্রিক উৎপাদনব্যবস্থা থেকে। জাতীয় অর্থনীতিতে শহরের গুরুত্ব বৃদ্ধি এবং বর্ধিত জনস্রোতের আবাসন ও কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করার জন্য রাজধানী শহরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। আজ থেকে কয়েক দশক আগেও শহরের আবাসনব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার তেমন কোনো আবশ্যকতা দেখা দেয়নি। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। 

এখন যদি রাজধানী ঢাকা শহরকে পরিকল্পিতভাবে আধুনিক উপায়ে গড়ে তোলা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এই শহর বসবাসের সম্পূর্ণ অযোগ্য হয়ে পড়তে পারে রাজধানী ঢাকা শহরকে আধুনিক উপায়ে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার জন্য ২০১০ সালে প্রথম বারের মতো 'ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান' (ড্যাপ) প্রণয়ন করা হয়। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, আগামী প্রজন্মের জন্য রাজধানী ঢাকা শহরকে সুন্দর ও বসবাসযোগ্য আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলা। 

ড্যাপের আওতাধীন এলাকার পরিমাণ হচ্ছে ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার। ড্যাপ হচ্ছে একটি পরিকল্পনা দলিল। যে কোনো পরিকল্পনা সময় ও বাস্তবতার নিরিখে পরিবর্তিত বা পরিমার্জিত হতে পারে। এটা কোনো অপরিবর্তনযোগ্য দলিল নয়। কিন্তু দেখা যায়, ড্যাপ প্রণীত হওয়ার পর থেকেই আবাসন ব্যবসায়ীসহ বিশেষ বিচ্ছু মহল ড্যাপ বাতিল করার জন্য সচেষ্ট হয়ে ওঠে। সেই মহলটি কিন্তু এখনো থেমে নেই। তারা আবারও চেষ্টা করছে, কীভাবে ডরপকে বাতিল করা যায়। এই মহলের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তারা যে ব্যবসা করে, তা থেকে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করা। রাজধানী বসবাসযোগ্য থাকল কী থাকল না, সেটা তাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। পরিকল্পনাদলিল হিসেবে ড্যাপের শক্তিশালী দিকের পাশাপাশি দুর্বলতাও আছে সেই দুর্বলতা কাটানোর জন্য চেষ্টা চালানো পরিকল্পনা-প্রক্রিয়ারই অংশ। কিন্তু তাই বলে ড্যাপকে পুরোপুরি বাতিল করতে চাওয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। এটা রাজধানী ঢাকাকে পরিকল্পিত ও আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি অশনিসংকেত। 

একজন পরিকল্পনাবিদ হিসেবে আমার স্পষ্ট অবস্থান হচ্ছে, সময়ের বিবর্তনে ড্যাপ সংশোধন, সংযোজন বা পরিমার্জন করা যেতে পারে কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহলের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে কোনোভাবেই ড্যাপ বাতিল করবার সুযোগ নেই। বরং এই মহলের উদ্দেশ্যমূলক অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। অভিজ্ঞ পরিকল্পনাবিদসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে তাদের দেওয়া সুপারিশের ভিত্তিতে ড্যাপ সংশোধন করা যেতে পারে। কিন্তু কোনোভাবেই ড্যাপ বাতিল করা সংগত হবে না। 

ড্যাপ বাতিলের দাবি পরিকল্পনা- পেশাজীবীদের কাছ থেকে আসছে না। কতিপয় আবাসন ব্যবসায়ীর ব্যাবসায়িক স্বার্থ বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই এই দাবি করা হচ্ছে। ড্যাপের জনঘনত্ব পরিকল্পনার প্রস্তাবনা আধুনিক নগর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক হলেও একশ্রেণির ব্যবসায়ীর অতি মুনাফা অর্জনের সম্ভাবনা কমে যাবে। তাই তারা ড্যাপ সংশোধন নয়, বাতিল চাচ্ছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে, ব্যবসায়ের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা। কাউকে অতি মুনাফা অর্জনের সুযোগ দিয়ে শহরের বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ নষ্ট করা কোনোভাবেই সরকারের কাজ হতে পারে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, রাষ্ট্র ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অন্যায় আবদারের প্রতি নমনীয় আচরণ করে এটা কোনোভাবেই ঠিক নয়। ড্যাপে বলা আছে, পাঁচ বছর অন্তর ড্যাপ পুনর্মূল্যায়ন করা যাবে। কিন্তু দেখা গেল ড্যাপ বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার এক বছর পর তা সংশোধন করা হলো।

আবাসন ব্যবসায়ীদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, ড্যাপ এমনভাবে পরিবর্তন/সংশোধন করা হোক, যাতে নির্মাণাধীন ভবনের আয়তন ও উচ্চতা বাড়ানো যায় একটি শহরের অবকাঠামো, পরিষেবা, নাগরিক সুবিধাদি, ভার বহনক্ষমতা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জনঘনত্ব পরিকল্পনা ও নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। কেউ একজন চাইলেই ছোট ছোট প্লট বা জমির ওপর উঁচু উঁচু বহুতল ভবন নির্মাণ করতে পারেন না। কত পরিমাণ জমির ওপর কয় তলা ভবন নির্মাণ করা যাবে, ভবন নির্মাণের জন্য আশপাশে কী পরিমাণ খালি জায়গা রাখতে হবে, রাস্তার জন্য কতটা জমি ছাড়তে হবে-এসব মৌলিক ইস্যুগুলো নগর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

রাজধানী ঢাকা একটি জনবহুল শহর। এখানে তুলনামূলক কম স্থানে বেশিসংখ্যক মানুষ বাস করে। অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের ফলে ঢাকা শহর ক্রমশ বসবাসের উপযোগিতা হারাতে বসেছে। ঢাকা শহরে একসময় প্রচুর জলাশয়- জলাধার ছিল। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, জলাধারের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। অনেকেই জলাধার ভরাট করে আবাসিক ভবন নির্মাণ করছেন। তারা বুঝতেই পারছেন না, তারা নিজের ও শহরের কত বড় ক্ষতি করছেন। বাংলাদেশের মতো জনঘনত্বপূর্ণ ও বৃষ্টিপ্রবণ দেশের শহরের মোট আয়তনের অন্তত ১০ থেকে ১৫ ভাগ জলাশয় থাকা আবশ্যক এবং জলাশয়গুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ থাকা প্রয়োজন। বৃষ্টির পর দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক জলাধার থাকা প্রয়োজন। অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীর প্রাকৃতিক খাল-জলাশয় ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।

ঢাকা শহরের বিদ্যমান পানি নিষ্কাশন- ব্যবস্থা মোটেও ভালো নয়। কৃত্রিম ড্রেনেজ ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। এসব ড্রেন দিয়ে বৃষ্টির পানি দ্রুত অপসারিত হতে পারে না। এছাড়া বেশির ভাগ ড্রেন পলিথিন বা অন্যান্য আবর্জনা দিয়ে পূর্ণ থাকে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলে সেই পানি অপসারিত হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। শছরে যদি পর্যাপ্তসংখ্যক জলাধার থাকত, তাহলে বৃষ্টির পানি দ্রুত ড্রেনের মাধ্যমে সেই জলাধারে গিয়ে পড়ত এবং একসময় তা নদীতে প্রবাহিত হতো। একটি জনবহুল শহরকে পরিবেশবান্ধব এবং মানুষ ও পশুপাখির বসবাসের উপযোগী রাখার জন্য মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ সবুজ বা গাছপালা আচ্ছাদিত থাকা প্রয়োজন। 

রাজধানী শহর ঢাকা একসময় প্রচুর বৃক্ষশোভিত ছিল। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের ফলে ঢাকা শহরে গাছপালার পরিমাণ ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। গাছকে বলা হয় অক্সিজেনের কারখানা একটি জনপদে পর্যাপ্তসংখ্যক গাছপালা না থাকলে মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তুও বস্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। গাছ অক্সিজেন নির্গমন করে। একই সঙ্গে বৃষ্টির পনি শোষণ করে পরিবেশকে মানুষের বসবাসের উপযোগী রাখে ঢাকা শহরকে বসবাসের উপযোগী রাখতে হলে যেসব ড্রেন আছে, সেগুলোকে ময়লা- আবর্জনামুক্ত নির্বিঘ্নে পানি চলাচলের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। সরকারিভাবে এসব ড্রেনের রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা আরো উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে শহরবাসীকেও সচেতন থাকতে হবে। যেখানে সেখানে পলিথিন ব্যাগ ও ময়লা আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে। নাগরিকদের প্রত্যাশিত আচরণ ঢাকার বাসযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক হবে।

ড্যাপেই বলা আছে, প্রতি পাঁচ বছর পর পর ড্যাপ পর্যালোচনা করা যাবে। ফলে সময়ের প্রয়োজনে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ যে কোনো সময় প্রয়োজনে সংশোধন বা পরিমার্জন করা যেতে পারে। তবে সেটা হতে হবে এক্ষেত্রে যারা বিশেষজ্ঞ আছেন, তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে। এই শহর আমাদের সবার। ভবিষ্যৎ বংশধরগণ যাতে ঢাকা শহরে নিরাপদ ও পরিবেশসম্মতভাবে বসবাস করতে পারে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের গাফিলতি করা হলে ভবিষ্যৎ বংশধরদের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে।

লেখক: পরিকল্পনাবিদ ও প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) অনুলিখন: এম এ খালেক