নারী ফুটবলে কিরণ ব্যতিক্রম 

নারী ফুটবল সাফল্য পেলে এটা অমুকের ফসল। আর হারলে কিরণের দোষ। এভাবেই নারী ফুটবলের সাফল্য- ব্যর্থতা নিয়ে ফুটবল নিন্দুকেরা বলে আসছেন। দেশের ফুটবল অঙ্গনে এ কথাটা নিন্দুকের মুখে মুখে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, নির্মোহ চোখে দেখলে এখন পর্যন্ত নারী ফুটবলে যত সাফল্য এসেছে, সবই মাহফুজা আক্তার কিরণের সময়ে। ব্যর্থতা থাকতেই পারে। কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সেটাই সবাই দেখেছে। ভুলে গেছে প্রথম ম্যাচেই আর্জেন্টিনা হেরেছিল সৌদি আরবের কাছে। 

মরণব্যাধি ক্যানসার রোগে আক্রান্ত কিরণ কেমোথেরাপি চলাকালীন অসুস্থ শরীরে হাসপাতালের কাগজে বন্ডসই দিয়ে নিজের জীবন বাজি রেখে জাপানে ফুটবল মিটিংয়ে হাজির হন। সেই মিটিং অনুমোদন দেয় জাপান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের অনুদান নারী ফুটবলে ব্যবহার করা যাবে। এমন অনেক না বলা সাফল্য রয়ে গেছে কিরণের কাছে। এএফসি ও ফিফায় নির্বাহী কমিটিতে আসন পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রথম নারী ক্রীড়াসংগঠক কিরণ। এটি সহজ কথা নয়। একেবারে কোনো যোগ্যতা-দক্ষতা না থাকলে বাংলাদেশের একজন নারীকে ফিফা, এএফসি তাদের টেবিলে বসতে দেবে না, এটা সবাই বোঝেন। 

অনেক বাধা-বিপত্তির মধ্যেও বাফুফে সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিন নারী ফুটবল উন্নয়নে সব রকম সহযোগিতা দিয়ে আসছিলেন। সিরাজুল ইসলাম বাচ্চু মারা যাওয়ার পর মাহফুজা আক্তার কিরণ ছিলেন নারী ফুটবল পরিচালনার দায়িত্বে। আর সেটি পালন করতে গিয়ে নিরাপদ আঁচলের নিচে রাখতে অনেক ক্ষেত্রে কড়াকড়ি নিয়ম আরোপ করেছিলেন তিনি। কারণ মেয়েরা গ্রাম থেকে পরিবার ছেড়ে এসেছেন ফুটবলে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। খেলোয়াড়দের মা-বাবা ফুটবল ভবনে এসে কাজী সালাহউদ্দিন এবং কিরণের হাতে সন্তানদের নিরাপত্তার দায়ভার দিয়ে প্রতিশ্রুতি আদায় করে বলেছিলেন, 'আপনারা নিশ্চিত নিরাপত্তা না দিতে পারলে মেয়েকে ফিরিয়ে নেব, গ্রামে বিয়ে দিয়ে দেব।'

সবকিছু ভেবেচিন্তে অশুভ ছায়া পড়তে দেবেন না বলে বাফুফে ভবনের ক্যাম্পে মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় কিরণ সমালোচিত হয়েছিলেন। কিরণের দুর্ভাবনা অঙ্কুরেই মেয়েদের ক্যারিয়ার যদি বিনষ্ট হয়, তাহলে দেশের নারী ফুটবল মুখ থুবড়ে পড়বে। শত সমালোচনার মধ্যেও ৪০-৫০ জন ছোট-বড় প্রতিভাবান ফুটবলারকে গড়ে তোলার জন্য বিদেশি কোচিং স্টাফ এনে দিলেন। কবজি ডুবিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার অভ্যাসের মেয়েরা স্টেক ফুড খাওয়ার অভ্যাস গড়লেন। শরীরে শক্তি বাড়াতে আধুনিক রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাদ্যাভ্যাস বদল করালেন। এখন সেই মেয়েরা কাঁটা চামুচ দিয়ে মুখে খাবার তোলেন। পরিপাটি থাকার জন্য পার্লারে নিয়ে মেকআপ করিয়ে আনতেন। সেই মেয়েরা এখন ফ্যাশন করেন, টিকটক করেন। বিজ্ঞাপনে কাজ করার আমন্ত্রণ পান। 

এখন কিটক্যাট চকলেট ছাড়া মেয়েদের চলেই না। উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন। কীভাবে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে হবে সেটি শেখালেন। কানে তুলো দিয়ে কিরণ যেভাবে নারী ফুটবল উন্নয়নে কাজ করেছেন, তার ফসল পেয়েছে বাংলাদেশ। অনূর্ধ্ব-১৮ সাফ চ্যাম্পিয়ন, অনুর্ধ্ব-১৯ সাফ চ্যাম্পিয়ন-এরকম অনেক ট্রফি জয় করেছে বাংলাদেশ। ইতিহাস সৃষ্টি করেছে ২০২২ সালে। দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এত স্বল্প সময়ে একটা দেশের নারী ফুটবল উপমহাদেশের মঞ্চে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরেছে। ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, নেপালকে হারিয়ে সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। ফেয়ারপ্লে ট্রফি, সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার, সাফের সেরা খেলোয়াড়, সেরা গোলরক্ষক, যত পুরস্কার ছিল সব পেয়েছে বাংলাদেশ। 

চোখ বন্ধ করে চিন্তা করলে এটা কল্পনাও করা যায় না যে, উপমহাদেশের নারী ফুটবলে বাংলাদেশের জারগণ আকাশ ছুঁয়েছে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, যারা দিনরাত বাফুফের সমালোচনায় মত্ত থাকতেন, তারা নারী ফুটবলের সাফল্যে একটি বারের জন্য অভিনন্দন শব্দটি উচ্চারণ করেননি। কারণ সংগঠক হিসেবে কিরণ অভিনন্দন প্রাপ্য হয়ে যান কি না, এই ভয়। সাবিনা, সানজিদাদের ঢাকায় ফেরার দিন খেলোয়াড়দেরকে দেখার জন্য দর্শকভিড়ে বিমানবন্দর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অচল হয়ে গিয়েছিল। আর তখন একজন সাবেক ফুটবলারের মুখে শুনতে হয়েছিল, 'তোরা কি বিশ্বকাপ জয় করে আইছস নাকি?' 

নিন্দুকেরা কিরণকে খাটো করতে গিয়ে দেশের সাফল্যটাকে আড়াল করে দিলেন। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করা। কিরণ বললেন, ‘ফুটবলের সাফল্য ঠেকাতে গিয়ে আমাকে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। শেখ হাসিনাকে কটূক্তি করার অভিযোগে আমাকে জেলে যেতে হয়েছে। আমাকে বাজেভাবে কথা বলা হয়। প্রতি উত্তরে আমি কাউকে মন্দ কথা বলিনি।’