কর্মজীবী নারীর মেধা বিকাশে বাধা অপর্যাপ্ত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র

প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরকারি-বেসরকারি চাকরি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকতাসহ বিভিন্ন পেশা ও উত্পাদনশীল খাতে নারীর সরব অংশগ্রহণ ইতিবাচক। কিন্তু কর্মজীবী এই নারীরা সন্তান লালন-পালনে পাচ্ছেন না প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা। যেসব নারীর সন্তান দেখাশোনার জন্য পরিবারে কেউ নেই, তাদের অনেকেই সন্তানের জন্য চাকরি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। আর যারা কষ্ট করে চাকরির পাশাপাশি সন্তান পালন করছেন তারা দুটি কাজ একসঙ্গে করতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন।

নারী নেত্রীরা বলছেন, উচ্চ থেকে নিম্ন পর্যায়ে একই অবস্থা। আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি, নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা শুধু চাকরির সুযোগ দিলেই হবে না। মসৃণভাবে যেন নারীরা কাজ করতে পারেন, সেই জন্য সুযোগও তৈরি করতে হবে। মাতৃত্বকালীন ছুটির ফাঁদে চাকরি যাওয়া এবং এই ছুটির জন্য প্রমোশন আটকে থাকা বন্ধ করতে হবে। আর শিশু পালনের জন্য ১০-১২ বছরের ক্যারিয়ার থেকে গুটিয়ে ঘরে বসে যাওয়ার বিষয়টিও সুখকর নয়। এটা দক্ষতা অপচয় করা ছাড়া আর কিছু নয়।

মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্য মতে, সারা দেশে এখন মাত্র ৪৩টি দিবাযত্ন কেন্দ্র আছে। নতুন করে আরো ৩৬টি তৈরির পরিকল্পনা আছে। এরমধ্যে ১২টি ঢাকায় বাকি ২৪টি ঢাকার বাইরে। পোশাক কারখানাগুলোর মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে কারখানায় দিবাযত্ন কেন্দ্র করার আহ্বান জানানো হয়েছে। জাতীয় মহিলা সংস্থার উদ্যোগে গাজীপুরের বেশ কয়েকটি কারখানায় ডে-কেয়ার সেন্টার তৈরির প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা শহরে সাতটি এবং ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহর— রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল এবং খুলনায় ১২টি দিবাযত্ন কেন্দ্র নিম্নবিত্ত কর্মজীবী ও শ্রমজীবী নারীর সন্তানদের জন্য পরিচালিত হচ্ছে। রাজধানীর কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর, আজিমপুর, মগবাজার, রামপুরা, খিলগাঁও ও ফরিদাবাদে এ দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলো অবস্থিত। এসব কেন্দ্রের সেবা নিতে প্রতি শিশুর জন্য মাসে ৩০ টাকা করে নেওয়া হয় শিশুদের দেখভালের জন্যে। ঢাকার ভেতরে প্রতি কেন্দ্রে ৮০ ও ঢাকার বাইরে ৬০ শিশুকে সেবা দেওয়ার মতো সক্ষমতা রয়েছে। এর বাইরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির কর্মজীবী নারীদের জন্য ঢাকায় ছয়টি ডে-কেয়ার সেন্টার মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে— বাংলাদেশ সচিবালয়, এজিবি অফিস, আজিমপুর, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর, খিলগাঁও এবং মিরপুর। ওইসব কেন্দ্রে মাসে ৩০০ টাকা করে মাসিক ফি নেওয়া হয়। একসঙ্গে প্রতি সেন্টারে ৫০ শিশু সেবা দেওয়া সক্ষমতা আছে। এ ছাড়া বেসরকারিভাবেও দেশে বেশ কিছু শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র আছে। আর মতিঝিলে বেসরকারি ব্যাংকে কমর্রত নারীদের সন্তানদের জন্য ২০১৫ সাল থেকে চালু আছে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর সবশেষ জরিপের তথ্য মতে, দেশে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা ৬ কোটি ১৪ লাখ। এর মধ্যে ১ কোটি ৮৩ লাখ নারী এবং ৪ কোটি ৩১ লাখ পুরুষ। এরমধ্য থেকে দেশে ইতিমধ্যেই শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ কমতে শুরু করেছে— বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর শ্রম জড়িপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ৩৬ শতাংশ। ২০১৩ সালে এসে দেখা যায় এই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৫ ভাগে। শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও শ্রমবাজারে তা কেন কমছে তা ভাবার বিষয়।

কর্মজীবী মা সঞ্চিতা সামস বলেন, সমাজ আশা করে নারী আয় রোজগারও করবে, আবার সন্তান লালন-পালনসহ সংসারের সব কাজের দায় নিজের ঘাড়ে তুলে নেবে। শুধু সন্তান এবং সংসারের কথা চিন্তা করে অনেক মেধাসম্পন্ন নারী, অনেক প্রতিভা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কাজের ক্ষেত্র থেকে সরে পড়ছে, আবার যোগ্যতার প্রমাণ দিতেও পারেছে না।

বিজ্ঞজনেরা বলছেন, রাষ্ট্রের এখন মাতৃত্বকালীন ছুটি ও শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। কারণ একজন কর্মজীবী নারী যখন ‘মা’ হন, তখন তার সেই দায়িত্বের চাপ ভাগ করে নেওয়ার জন্য পরিবার, রাষ্ট্র, সমাজ পাশে এসে দাঁড়ায় না। বাস্তবতার এ সংকট কাটাতে শিশুর নিরাপদ শৈশব ও নারীর সৃজনশীল সত্তার বিকাশে পাড়ায়-মহল্লায়-কর্মস্থলে-কারখানায় পর্যাপ্ত মানসম্মত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সন্তানের জন্য এখনো ৭৫ ভাগ নারীকে ক্যারিয়ার ছেড়ে আসতে হয়।

 ‘কর্মজীবী নারী’র একটি জরিপে বলা হয়েছে, ৫১ দশমিক ৩৫ ভাগ অফিস বা কারখানায় শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের অস্তিত্ব নেই। দেশের মাত্র ৪০ দশমিক ৫ ভাগ কারখানায় শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে। তবে এগুলো ব্যবহার হয় না। মাত্র ৮ দশমিক ১ শতাংশ কারখানায় শিশুকক্ষ আছে, যেগুলোতে শিশুদের রাখা হয়। তবে ঢাকার কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে দিবাযত্ন কেন্দ্র থাকলেও সেবা ও উত্পাদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোতে তা নেই।

বাংলাদেশ শ্রম আইন- ২০০৬ অনুযায়ী, যে প্রতিষ্ঠানে ৪০ জনের বেশি নারী শ্রমিক আছেন, সেখানে ছয় বছর বয়স পর্যন্ত শিশুসন্তানের জন্য শিশুকক্ষ বা শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের জায়গা থাকতে হবে। কিন্তু এ আইন বাস্তবে মানা হচ্ছে না, ফলে সন্তান পালনের জন্য বহু নারীকে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।

মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী বলেন, নারীরা এখন শিক্ষিত হচ্ছে, তারা স্বাবলম্বী হয়ে অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখছে। যে ক্ষেত্রে একজন নারীর সন্তানের দেখাভাল করার জন্য অবশ্যই মানসম্মত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র থাকা দরকার। কারণ বিদেশের মতো আমাদের দেশে এখনো শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। ফলে সন্তান জন্মের পরে মায়েদের চাকরি হুমকির মুখে পড়ছে। এটা কোনভাবেই কাম্য নয়।