স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণের গুরুত্ব

গতকাল ইত্তেফাকের এক খবরে বলা হইয়াছে যে, দেশের সর্ববৃহৎ সরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে প্রতিদিন আসিতেছে ১০ হাজার রোগী। ইহাতে কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাইতেছে। ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালটির বারান্দা, মেঝে এমনকি সিঁড়িতে রাত্রি কাটাইয়াও অনেকে চিকিৎসসেবা গ্রহণ করিয়া থাকেন। স্বাধীনতা লাভের ৫৩ বৎসর পরও দেশের প্রধান হাসপাতালে এই চিত্র কেন দেখা যাইবে? অতিরিক্ত চাহিদা থাকিলেও এই হাসপাতালটিতে নাই প্রয়োজনীয় শয্যা। নাই পর্যাপ্ত জনবলও। তাহা ছাড়া জেলা-উপজেলার অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালে দুপুরের পর কোনো অপারেশন হয় না বিধায় এই সকল রোগীর ৮০ শতাংশই আসে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এই পরিস্থিতিতে এই হাসপাতালের উপর হইতে রোগীর প্রচণ্ড চাপ কমাইতে মহাখালীতে করোনার সময় আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠিত ১ হাজার ৫৪ শয্যার বিশেষায়িত করোনা (ডিএনসিসি) হাসপাতালটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অধীনে দেওয়ার জন্য প্রস্তাব করা হইয়াছে। ইহা ছাড়া ঢামেকে আরো ৫ হাজার শয্যার একটি হাসপাতাল তৈরির কার্যক্রম চলিতেছে বলিয়া জানা যায়। ইহাতে এই হাসপাতালের উপর হইতে রোগীর চাপ কিছুটা কমিবে বটে; কিন্তু ইহাই কি একমাত্র সমাধান?

প্রকৃতপক্ষে রাজধানী ঢাকার উপর হইতে সমগ্র দেশের রোগীর চাপ কমাইতে হইলে আমাদের চিকিৎসাসেবার বিকেন্দ্রীকরণের গুরুত্বকে অনুধাবন করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নাই। আমরা জানি, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হইতেছে দেশের একটি বৃহৎ মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়ের আওতায় দেশে এখন পর্যন্ত ৩৭টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, ৬৭টি প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও প্রায় ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকসহ অনেক স্বাস্থ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, যাহা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব উন্নয়নের দৃষ্টান্ত নিঃসন্দেহে; কিন্তু তাহার পরও গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষ সকল আধুনিক চিকিৎসাসেবা হইতে বঞ্চিত। মূলত বাংলাদেশের ৪৬০টি উপজেলার ৪৬০টি উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার কথা থাকিলেও বিভিন্ন কারণে দেশের জনগণ তাহাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা পাইতেছে না। কেননা এখনো এই সকল হাসপাতালের রোগীকে বাহির হইতে বিভিন্ন টেস্ট করিয়া আনিতে হয়। এখনো এই সকল হাসপাতালে ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশয়ানের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায় নাই। যেইহেতু জেলা-উপজেলায় সকল রোগের চিকিৎসা পাওয়া যায় না, তাই অধিকাংশ মানুষ চিকিৎসার জন্য বাধ্য হইয়া ঢাকায় চলিয়া আসে। ইহাতে ঢাকার হাসপাতালগুলির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়িয়া যায়। গ্রাম হইতে আগত রোগীরা সঠিক চিকিৎসা হইতে বঞ্চিত হন, দালালদের খপ্পরে পড়িয়া টাকা হারান এবং নিঃস্ব হইয়া বাড়ি ফিরিয়া যান। আবার ইহাতে ঢাকার স্থানীয় রোগীদেরও জরুরি সেবা পাইতে বিলম্ব হয়।

উপরিউক্ত পরিস্থিতি হইতে উত্তরণে স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণের গুরুত্ব সর্বাধিক। আমাদের এমনভাবে চিকিৎসাব্যবস্থা সম্প্রসারণ করিতে হইবে, যাহাতে একেবারে জটিল রোগ ছাড়া গ্রামের মানুষকে চিকিৎসার জন্য উপজেলা বা জেলার বাহিরে আসিতে না হয়। এই জন্য জেলা-উপজেলা হাসপাতালগুলির সক্ষমতা বাড়ানো ও ব্যবস্থাপনার উন্নতির প্রতি আমাদের সর্বাগ্রে মনোনিবেশ করিতে হইবে। এই সকল হাসপাতালে ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশয়ানের ঘাটতি দূর করিয়া তাহাদের নিয়মিত উপস্থিতি ও অফিস সময়সূচি অনুযায়ী তাহাদের যথাযথ কর্মতৎপরতা নিশ্চিত করিতে হইবে। দেশের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলিতেও এমবিবিএস ডাক্তার নিয়োগ, তাহাদের জন্য নিরাপদ বাসস্থান তৈরি ও সেইখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ করা দরকার। অন্যদিকে প্রত্যেক উপজেলা হাসপাতালে জরুরি বিভাগ, ব্লাড ব্যাংক ও প্রয়োজনীয় প্যাথলিজিক্যাল টেস্টের ব্যবস্থা করিতে হইবে। সেখানে নিশ্চিত করিতে হইবে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সরবরাহ  ইহা ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের সকল স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করিতে হইবে। পরিশেষে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের উপর চাপ কমাইতে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে নূতন সরকারি হাসপাতাল নির্মাণসহ পুরাতন হাসপাতালগুলির সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। বিভাগীয় হাসপাতালগুলিতে প্রয়োজন বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার সম্প্রসারণ। ইহাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের ঢাকায় আসিবার তেমন প্রয়োজন পড়িবে না এবং তাহাদের এই জন্য অবর্ণনীয় কষ্ট ও দুর্ভোগ পোহাইতে হইবে না।