ট্রাম্প কি সত্যিই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেন সংঘাত বন্ধ করতে পারবেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শেষ হয়েছে। রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইতোমধ্যেই বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। এখন রাশিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে মূল প্রশ্নটি হলো, হোয়াইট হাউসের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে ইউক্রেনের সামরিক-প্রযুক্তিগত সহযোগিতা কীভাবে বিকশিত হবে এবং ট্রাম্পের বিজয় মস্কো ও কিয়েভের জন্য কী অর্থ বহন করবে।

প্রচারণার প্রতিশ্রুতি

নির্বাচনী প্রচারণার সময় নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বারবার বলেছিলেন, তিনি জিতলে তার আনুষ্ঠানিক অভিষেকের আগে ইউক্রেনে সংঘাতের অবসান ঘটাতে সক্ষম হবেন। তিনি বলেছিলেন, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেনে সংঘাত বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

সম্ভবত, এই ধরনের কথাবার্তা 'প্রাক-নির্বাচনী বক্তৃতা' হতে পারে। ট্রাম্প আগেও এমন 'অপ্রচলিত বিবৃতি' দেওয়ার জন্য পরিচিত ছিলেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে 'সমস্যা সমাধানের' প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে হ্যানয়ে ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে বৈঠকের সামগ্রিক কোনো ফলাফল ছি না। অর্থাৎ জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে রিপাবলিকানদের কোনো সফল অভিজ্ঞতা নেই।

যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে ইউক্রেনে সংঘাত অবসানের প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে তিনি কীভাবে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি। এটি অদূর ভবিষ্যতে বাস্তবে কীভাবে কাজ করতে পারে তাও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

সর্বোপরি, ২০ জানুয়ারি দুপুর পর্যন্ত ট্রাম্পের হাতে কোনো ক্ষমতা থাকবে না, বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে। ততদিন পর্যন্ত জো বাইডেনই প্রেসিডেন্ট থাকবেন।

প্রতিশ্রুতির ফলাফল দেখতে ৪৭তম প্রেসিডেন্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে এবং মন্ত্রিসভা প্রশাসন গঠন করতে হবে। তবেই তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করা যাবে।

কোন পরিস্থিতিতে ইউক্রেন সংঘাতের অবসান হতে পারে?

এখন আসি ইউক্রেনে সশস্ত্র সংঘাত অবসানের সম্ভাবনায়। হাইপোথেটিক্যালি এর ইতি টানা সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কোন শর্তে এবং কাকে বিজয়ী করে সংঘাত বন্ধ ঘোষণা করা হবে। এই পর্যায়ে, সম্মিলিত পশ্চিমা শক্তি  রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের শর্তাবলী মেনে শত্রুতা শেষ করতে মোটেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। উদাহরণস্বরূপ, কিয়েভের জোট-নিরপেক্ষ অবস্থান, নতুন অঞ্চলগুলোর উপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং ইউক্রেনের অসামরিকীকরণ এবং ডিনাজিফিকেশন।

পশ্চিমা শক্তির প্রভাবের ফলে বাস্তবতা এমন হতে পারে- ট্রাম্প যদি সত্যিই ইউক্রেন সংঘাতের অবসান ঘটাতে চান, তাহলে (এটি অবশ্যই একটি অনুমান করা যায়) তাকে পরিস্থিতিটি এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে রাশিয়া এই সংঘাতে জয়ী না হয় এবং ইউক্রেনও যেন বা হেরে যায়। অর্থাৎ ইউক্রেন তার স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারবে।

এমনটা যদি হয়, সে ক্ষেত্রে কিয়েভই প্রথম এই ধরনের শর্তে সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটানোর ইচ্ছা প্রকাশ করবে। অদূর ভবিষ্যতে দেখা যাবে, ট্রাম্প এই বিদ্যমান দ্বন্দ্বগুলো এত দক্ষ উপায়ে সমাধান করতে পারেন কি না। পশ্চিমারা হারেনি, রাশিয়া জেতেনি, ইউক্রেন পরাজিত হয়নি- এমন পরিস্থিতি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘটবে না, এমনকি সর্বাধিক কল্পনা করেও সেটি সম্ভব নয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট যদি আসলেই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেন সংঘাত থামাতে চান তা হলো- পরিস্থিতির ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ সৃষ্টি করা। নতুন মার্কিন প্রশাসন মস্কোর উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের পরিমাণ তীব্রভাবে কমিয়ে কিয়েভকে হতাশাজনক পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে।

কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে- মস্কো এ ধরনের প্রস্তাবে রাজি হবে কি না। ২০ জানুয়ারির আগে অবশিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্রেমলিন সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও বেশি অনুকূলে নিয়ে যাওয়ার জন্য 'নিয়তির নীতি' অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি বিজয়ের নীতিতে অটল থাকবে কি না।

লেখক: রাশিয়ার অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ও সংবাদমাধ্যম আরটি'র সামরিক ধারাভাষ্যকার