মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা ফারুকীর প্রথম দিন

দায়িত্ব নিয়ে প্রথম দিন অফিস করলেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। কেমন কাটলো প্রথম দিনের সরকারি গুরুদায়িত্ব? কেমন পেয়েছেন টিমমেট? কী কী করতে চান অদূর ভবিষ্যতে? এমন নানা বিষয়ে প্রশ্ন এলো সাংবাদিকদের তরফ থেকে। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেলেন ফারুকী।

সোমবার (১১ নভেম্বর) মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ফারুকী বলেন, ‘গতকাল (রোববার) পর্যন্ত উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে ‘না’তে ছিলাম। পরে এসে হ্যাঁ বললাম। কারণ, আমি দেশের জন্য কিছু করতে চাই। সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে কাজ করতে চাই।’ ব্যক্তিগত কাজের সূত্রে আগে থেকেই তার কাজের ধরনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল বলেও জানান ফারুকী।

তিনি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থান সফল না হলে আজ হয়তো আমি জেলে থাকতাম। তবে, উপদেষ্টা হবার মতো কোনো লক্ষ্য থেকে ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করিনি। আমি শিল্পী, যখন যেটা খারাপ মনে হয় বলে যাবো। শিল্পীর কোনো দল নেই।’

বিগত দিনে নিজের বেশ কয়েকটি লেখার কথা উল্লেখ করে সংস্কৃতি উপদেষ্টা বলেন, ‘এসব লেখার কারণে কেউ কেউ আমাকে কখনও জামায়াত-শিবির বানিয়েছে। কখনও অন্য দল। কিন্তু অনেকে ভাবেনি, একটা লোককে কোনো দল নিজেদের ভাবছে না কেন? কারণ, আমি কোনো দলেরই না।’

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজের ওপর আসা চাপের দু-একটি উদাহরণও দেন ফারুকী। বলেন, ‘একটি লেখার জন্য আমার সব ট্যাক্সের ফাইল ধরে তদন্ত শুরু হয়েছিল। তিশা (ফারুকী স্ত্রী) ও আমাকে তদন্তের মুখোমুখি করা হয়েছিল।’

এক সাংবাদিক ফারুকীকে নিয়ে বিএনপি নেতা মেজর (অব.) হাফিজের করা একটি মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে চান। উত্তরে ফারুকী শুরুতে মেজর হাফিজের প্রশংসা করেন। বলেন, ‘দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার ভূমিকা ছিল। কিন্তু তিনি (মেজর হাফিজ) বোধহয় সোশ্যাল মিডিয়া দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছেন।’

এ সময় বঙ্গবন্ধুর বায়োপিকে তিশার অভিনয় নিয়েও সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন আসে। ফারুকী বলেন, তিনি আপাতত এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে চান না।

ফারুকী বলেন, ‘যত দিন থাকবো দায়িত্বে, কিছু কাজ করে যেতে চাই। আর যদি না পারি, তাহলে যখন চলে যাবো, তখন বলবো যে আমি ব্যর্থ।’

উপদেষ্টা বলেন, ‘এখানে লুকানোর কিছু নেই যে আমরা সবাই জানি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় একটি অবহেলিত মন্ত্রণালয়। এখানে বাজেট কম থাকে। কিন্তু আমার অ্যাডভান্টেজ হচ্ছে, আমি একটা ব্রিলিয়ান্ট টিম পাচ্ছি।’

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলা একাডেমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। এসব ইনস্টিটিউটের কথা উল্লেখ করে ফারুকী তার বক্তব্যে বলেন, ‘বাংলা একাডেমিতে আছেন মোহাম্মদ আজম, হি ইজ ব্র্যান্ড! আমি তার কাজ সম্পর্কে জানি। নজরুল ইনস্টিটিউটে আছেন শিবলী ভাই (লতিফুল ইসলাম শিবলী)। তিনি আমাদের ছোটবেলার হিরো ছিলেন। তার গান ছিল সবার প্রিয়। এ ছাড়া শিল্পকলা একাডেমিতে আমরা পেয়েছি সৈয়দ জামিল আহমেদকে। আমি সব সময় বলি যে বাংলাদেশের থিয়েটারচর্চার ইতিহাসে জামিল আহমেদ এক পাল্লায়, বাকি সবাই এক পাল্লায়! বাকিরা ছোট বোধ করবেন না, কারণ জামিল আহমেদ আসলেই অনেক বড়। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে আছেন আফসানা আপা, তিনিও গ্রেট রাইটার! সুতরাং আমার শক্তির জায়গাটা হচ্ছে, এমন একটি গ্রেট টিম আমার সঙ্গে আছে।’

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে ফারুকী বলেন, ‘প্রথমে আমি আমার মন্ত্রণালয়ের সবার সঙ্গে বসে সত্যিকারের অবস্থাটা জানতে চাইব যে তহবিলের (ফান্ডিং) অবস্থাটা কী। এই তহবিলের মধ্যে কী পরিমাণ অর্থ খরচ হয় বেতনে, আর কী পরিমাণ খরচ হয় উন্নয়ন প্রকল্পে, কী পরিমাণ প্রশিক্ষণে- এগুলো জানার চেষ্টা করব। এরপর মন্ত্রণালয়ের অধীনে যে একাডেমিগুলো হেড করছেন, তাদের নিয়ে বসব। সেই মিটিংগুলোতে আমি চেষ্টা করব, গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্টেকহোল্ডারদের রাখতে। সবার কাছে পরিকল্পনা চাইব। বলব, আপনারা আমাদের পরিকল্পনা দিন। তিন মাসে দৃশ্যযোগ্য কী পরিবর্তন আনতে পারি আমরা! এরপর আরেকটা পরিকল্পনা দেব, আগামী এক বছরে কী দৃশ্যযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারি আমরা! কী কী প্রকল্প আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি। যে পরিবর্তনগুলো আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গনে একটা বড় প্রভাব ফেলবে!’

এক বছর মেয়াদি প্রকল্প পরিকল্পনা নিয়ে ফারুকী আরও বলেন, ‘এক বছর মেয়াদি যে পরিকল্পনাগুলো আমরা করব, সেখানে আমাদের স্বপ্ন থাকবে অনেক। ফলে আমরা দেখব, কিছু বাজেটে কুলাচ্ছে, কিছু কুলাচ্ছে না। এখানে যোগ দেওয়ার আগেই আমি প্রধান উপদেষ্টা মহোদয়কে বলেছি। এই পরিকল্পনাগুলো ওনার কাছে পেশ করব, করার পর যদি উনি মনে করেন যে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ, প্রয়োজন আছে- তাহলে নিশ্চয় সেগুলো বাস্তবায়ন করাও সম্ভব। উনি আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন, আমি ওনাকে বিশ্বাস করি, হি ইজ আ ড্রিমার। তিনি বলেছেন, পরিকল্পনা দেখার পর উনি আমার সঙ্গে বসবেন এবং ওনার সিদ্ধান্তগুলো আমাকে জানাবেন। আমার বিশ্বাস, আমরা ওনার কাছ থেকে পুরোপুরি সাপোর্ট পাব।’

কথা প্রসঙ্গে সিনেমা নিয়েও কথা বলেন সংস্কৃতির নতুন এই উপদেষ্টা। ফারুকী বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশের যে ন্যারেটিভ আমরা নির্মাণ করতে চাই, সেটা ফিল্ম ছাড়া সম্ভব নয়। যদিও ফিল্ম না ঘরকা, না ঘাটকা অবস্থায় আছে। কিন্তু আমি মনে করি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে ফিল্মের দিকে নজর দিতে হবে। কারণ, ফিল্ম হচ্ছে কালচারাল ন্যারেটিভ নির্মাণের অন্যতম টুলস।’

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে গতকাল রোববার সন্ধ্যায় শপথ নেন নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়া প্রসঙ্গে ফারুকী তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছিলেন, ‘আমি কখনোই কোনো পদ কিংবা কোনো চেয়ারে বসব, এটা ভাবি নাই। কিন্তু প্রফেসর ইউনূসের সহকর্মী হওয়াটা টেম্পটিং, না বলাটা মুশকিল।’

উল্লেখ্য, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের শুরু থেকেই সক্রিয় ছিলেন নির্মাতা ও চলচ্চিত্র পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরও সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছেন। চলমান নানা ইস্যু নিয়ে নিয়মিত নিজের মতামত ও পরামর্শ দিয়েছেন এই নির্মাতা।