দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা, এর উচ্চ কক্ষের নাম জাতীয় পরিষদ, নিম্ন কক্ষ সংসদ। সংসদ নির্বাচন হবে প্রচলিত পদ্ধতিতে তিনশত আসনে। জাতীয় পরিষদের ২০০ আসন হবে সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে বন্টন হবে। আইন সভার মেয়াদ হবে চার বছর।
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী কেউ দু’বারের বেশি নির্বাচিত হতে পারবেন না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং বিচারক নিয়োগে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কমিশন গঠনের বিষয়ে সুনিদ্দিষ্ট প্রস্তাব হাজির করা হয়েছে।
ল রিপোর্টার্স ফোরামের (এলআরএফ) সাবেক সভাপতি ও দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন এই খসড়া প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। খসড়া প্রস্তাবের ওপর শনিবার (১৬ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
এতে বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এম. আসাদুজ্জামান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিচারপতি এম. এ মতিন, নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার ও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বিচারপতি, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আলোচনায় যোগ দেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে রয়েছি। সে কারনে ৯৩ অনুচ্ছেদের দিকে তাকালে এই প্রস্তাবনাগুলো এই সরকারের জায়গা থেকে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিতে পারবে কিনা সেটা ভেবে দেখা দরকার। এই অনুচ্ছেদে বলা আছে আপনি সবকিছু অধ্যাদেশ জারি করে করতে পারবেন, শুধু সংবিধান সংশোধন ছাড়া। এই খসড়া প্রস্তাবনা সংশোধনটা সংবিধান সংস্কার কমিশনকে দেবেন। সেই কমিশন কিভাবে কোন প্রক্রিয়ায় এটা আনতে পারে। কারন এখন সংসদ নাই। গণভোটের বিধান এখন নাই। তিনি বলেন, পৃথক যে সাংবিধানিক আদালতের কথা বলেছেন এটা ভুল ধারনা। এটা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে হিট করে। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় কথা যদি গণতন্ত্র ঠিক থাকে, ভোটাধিকার ঠিক রাখা যায় তাহলে সব সমস্যার সমাধান করা যায়। আপনারা সংস্কারের মাধ্যমে একটা জায়গা নিশ্চিত করেন পাচ বছর পর পর জনগণ তার স্বাধীন ও সার্বভৌম ক্ষমতা যাতে প্রয়োগ করতে পারে। স্থানীয়ভাবে স্থানীয় সরকারের প্রশ্নে জনগণের অংশগ্রহনের জন্য তার স্বাধীন সার্বভৌম ক্ষমতা যাতে প্রয়োগ করতে পারে সেই বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য যা যা করনীয় তাই তাই করলেই আমার মনে হয় সেই সংবিধান সার্বভৌম হবে। সেই সংবিধানে দেশের মানুষের আশা আকাঙ্খার প্রতিফলন হবে। সেই সংবিধান আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ন্যায় বিচার, মৌলিক মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার সহ যা যা প্রত্যাশার জায়গা আছে সব নিশ্চিত হবে। এখানে যদি গড়মিল থাকে ভোটের অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান না করা হয় আপনি যতভাবেই প্রতিষ্ঠানকে ঢেলে সাজান না কেন কোন প্রতিষ্ঠান ঠিক সেভাবে কাজ করবে না। যেমনটা করেনি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠঅনগুলো এমনকি সুপ্রিম কোর্টও। যা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হতে দেখেছি। এই অবস্থা থেকে উত্তোরনের জন্য একমাত্র পথ হলো জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। তাহলেই গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।
বিচারপতি এম. এ মতিন বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল করতে হবে। পুনর্বহাল করতে হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। তবে এই সরকার ব্যবস্থায় বিচার বিভাগের কাউকে যেন না রাখা হয়। এটা করলে বিচার বিভাগের সামনে মুলা ঝোলানো হবে। তিনি বলেন, আদি সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ হুবুহু প্রতিস্থাপন, উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে কমিশনের বিধান করতে হবে। এই আইনটি করা সম্ভব হলে বিচার বিভাগে রাজনীতিকীকরন বন্ধ হবে। বিচারপতি মতিন বলেন, সংবিধানের ৭(ক)(খ) অনুচ্ছেদের তোয়াক্কা করেনি বলেই দেশের সূর্য সন্তানরা আত্মাহুতি দিয়েছে। সংবিধান লংঘন করেই তো বিপ্লব হয়েছে। যখন বিপ্লব সফল হয়েছে তখন শাসনতন্ত্র অকেজো হয়ে গেছে। কারন ওই সংবিধানই তো ফ্যাসিস্ট জন্ম দিয়েছে।
বিচারপতি দস্তগীর হোসেন বলেন, সংসদ সদস্যদের নূ্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা দরকার। পিয়নের চাকরি নিতে গেলেও অষ্টম শ্রেণি পাস লাগে। অন্তত আইনগুলো কি হচ্ছে সে সম্পর্কে এমপিদের জ্ঞান থাকা দরকার। শুধু হাত তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না, অংশগ্রহন থাকতে হবে আইন প্রণয়নে। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করবে এমন ব্যক্তিদের সংসদে দেখতে চাই। নিষ্ঠাবান লোক যদি না থাকে যতই আইন প্রণয়ন করুন না কাজ হবে না। দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট ও সাংবিধানিক আদালতের বিরোধিতা করেন তিনি।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের এক তৃতীয়াংশ পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে। এটা সংবিধানে একটা ভয়ানক সংশোধনী। পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে আসবে এটা আমি মনে করি না। এজন্য সংসদে বিল আনতে হবে। এছাড়া সংসদে নারীর আসন ৫০ থেকে বৃদ্ধি করে একশতে উন্নীত করার প্রস্তাব করেন তিনি।
অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম বলেন, ৭২’র সংবিধানকে ১৭ বার কাটাছেড়া করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনী সংবিধানের সর্বনাশ ডেকে এনেছে। সংবিধানের কোন তেদাষ নাই। দোষ সেসব সরকারের যারা ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত ও কুক্ষিগত করার চেষ্টা করেছে। মানুষ যদি নিজেকে সংশোধন না করেন তাহলে সংবিধান কখনো স্বৈরাচার হওয়া থেকে কাউকে নিবৃত্ত করতে পারে না।
সাংবাদিক কামাল আহমেদ বলেন, বর্তমান সংবিধান ৫৩ বছরে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করতে পারেনি, বরং সংকট সৃষ্টি করেছে। ৭০ অনুচ্ছেদকে অবশ্যই তুলে দিতে হবে। যদি কেউ অন্য দলে যেতে চায় তাকে পুনঃনির্বাচন করে আসতে হবে। রাজনৈতিক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হতে হবে সংবিধান সংশোধ না পুনঃর্লিখন হবে।
সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মাসদার হোসেন বলেন, গত ৫৩ বছরে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। অনেকগুলো সংস্কার কমিশন হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর তর সইছে না। কালকেই ক্ষমতার মসনদে বসতে হবে।
ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্র থেকে বের হতে হলে সংবিধানের কিছু জায়গায় জরুরি পরিবর্তন আনতে হবে। এখন সংবিধান পুনঃলিখন সম্ভব নয়। সেই প্রক্রিয়াও নাই।
ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায় বলেন, ভবিষ্যতে সংবিধান হওয়া উচিত অন্তর্ভূক্তিমূলক। যেখানে সকল ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠীর অধিকারের কথা বলবে। রাষ্ট্র ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরন থাকতে হবে।
রাষ্ট্রচিন্তক অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম বলেন, গত ৫৩ বছরেও আমরা গত ১৫ বছরে আইন করে লুটপাটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অসাংবিধানিক কোন না কোন পন্থায় সরকার পরিবর্তন হয়েছে। ৫৩ বছরে একটা সঠিক নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠঅ করতে পারিনি।
ব্যারিস্টার মুস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, দেশে সবার আগে দরকার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করা। সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকার ক্ষমতায় আসলে সংবিধানে যেসব অসঙ্গতি রয়েছে তার সমাধান আসবে।
অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, সংবিধান রাজনৈতিক দলিল। রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধানের বিধি-বিধানে পরিবর্তন আনবে।
সাংবাদিক ও কলামিষ্ট সোহরাব হাসান বলেন, সংবিধান সংশোধনের পূর্বে রাজনৈতিক ঐক্যমত্য দরকার। তবে যারা জুলাই-আগস্টে গণহত্যা চালিয়েছে তাদের বিচার হতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাঈমী ওয়াদুদ বলেন, সংলঅপের মাধ্যমেই সংবিধানের তর্কিত অংশের সমাধানের সুযোগ রয়েছে।
সাংবাদিক সালেহউদ্দিন বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কীভাবে রাজনীতিকে কুলষিত করেছে সেটা দেশের মানুষ দেখেছে। ৭০ অনুচ্ছেদ থাকতে হবে। নইলে বড় বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সরকার গঠন করবে এমপিদের কিনে নিয়ে।
খসড়া প্রস্তাবে যা আছে
জাতীয় পরিষদ
জাতীয় পরিষদের সদস্য সংখ্যা হবে ২০০। তারা জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে অভিহিত হবেন। তাদের মধ্যে ৬৪ জন নির্বাচিত জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ১২ জন নির্বাচিত সিটি করপোরেশনের মেয়র, ২৫ জন সংরক্ষিত মহিলা এবং ১০ জন ক্ষুদ্র-নৃ গোষ্ঠী, অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
২৫ জন সংরক্ষিত নারী সংসদ-সদস্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে নির্বাচিত হবেন। অবশিষ্ট ৮৯ জন জাতীয় সদস্য নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে নির্বাচিত হবেন। এরূপ বণ্টনের ফলে যে রাজনৈতিক দল আনুপাতিক হারে যত আসন পাবে, এর ভিত্তিতে তারা মনোনয়ন দেবে। তবে শর্ত থাকে, রাজনৈতিক দলগুলো যত আসন পাবে, এর অর্ধেক সদস্য নিজ দলীয় সদস্যদের মধ্যে থেকে, বাকি অর্ধেক সদস্য বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নির্বাচিত করবে। তবে তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবেন না।
সংরক্ষিত অপর ১০ জনকে রাষ্ট্রপতি সরাসরি মনোনয়ন দেবেন। এ মনোনয়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি যতদূর সম্ভব সমতাবিধান করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্র্রদায় ও তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিকদের প্রতিনিধি নিশ্চিত করবেন।
খসড়ায় বলা হয়েছে, জাতীয় পরিষদ হবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ও আইনপ্রণয়ন সভা, যা অর্থনৈতিক নীতি, জাতীয় নিরাপত্তা নীতি, বৈদেশিক সম্পর্কের নীতি এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বিকাশে পথরেখা প্রণয়ন করবে। জাতীয় বাজেট (অর্থবিল) ছাড়া জাতীয় সংসদে পাশ হওয়া আইন চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে জাতীয় পরিষদ। জাতীয় সংসদে বাজেট উত্থাপনের ছয় মাস আগে জাতীয় পরিষদে প্রাক-বাজেট আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় পরিষদের মেয়াদ হবে চার বছর।
জাতীয় সংসদ
জাতীয় সংসদের আসন সংখ্যা থাকবে ৩০০। কোনো সংরক্ষিত মহিলা আসন থাকবে না। তবে প্রত্যেক রাজনৈতিক দল দশ ভাগ নারী সদস্যকে মনোনয়ন দিতে হবে। সরকার গঠন, সরকারের প্রতি অনাস্থা এবং অর্থ বিল পাসের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে থাকবে। এর বাইরে রাষ্ট্রের সকল আইন প্রণয়ন জাতীয় সংসদের প্রাথমিক অনুমোদনের পর জাতীয় পরিষদ চূড়ান্ত অনুমোদন দিবে। জাতীয় পরিষদ এবং সংসদ নিজেদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা নিজেরাই বৃদ্ধি করতে পারবেন না। কোন শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবেন না। তাদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির আবেদন সাংবিধানিক আদালত বিবেচনা করবে।
নাগরিকের অধিকার
প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়েছে, আদালতের অনুমতি ব্যতিরেকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন দণ্ড হতে পারে-এমন অপরাধে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে আদালতের অনুমতি ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। তবে গুরুতর অপরাধ সংঘটিত করবে-এমন সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি ছাড়া কাউকে আটক রাখা যাবে না। তবে সন্দেহের উপযুক্ত ভিত্তি থাকতে হবে। আদালতে হাজিরের সময় প্রতিবেদনে উপযুক্ত কারণগুলো উল্লেখ করতে হবে। অহেতুক হয়রানি করা যাবে না। আদালতের অনুমতি ছাড়া নাগরিকের গৃহে প্রবেশ ও তল্লাশিতে পুলিশের অধিকার থাকবে না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা
জাতীয় পরিষদের যে সব রাজনৈতিক দলের অরাজনৈতিক সদস্য আছেন তাদের এক জন করে প্রতিনিধি নিয়ে ‘নির্দলীয় ত্বধাবধায়ক সরকার গঠন’ বিষয়ক একটি সার্চ কমিটি গঠিত হইবে। ওই কমিটিতে সংসদের সরকারি দলের নেতা এবং বিরোধী দলীয় নেতা অথবা তাহাদের একজন করে প্রতিনিধি থাকবেন। জাতীয় পরিষদের অধ্যক্ষ এই সার্চ কমিটির সভাপতি হইবেন। তাহারা ঐক্যমতের ভিত্তিতে জাতীয় পরিষদের একজন নির্দলীয় সদস্যকে প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে এবং পনের জন উপদেষ্টার মধ্যে দশ জন নির্দলীয় জাতীয় পরিষদ সদস্যকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবেন। সুপারিশ পাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টা এবং দশ জন উপদেষ্টাকে নিয়োগ দিবেন। তারা ঐক্যমতের ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টা ও দশ উপদেষ্টার তালিকা চূড়ান্ত করতে ব্যর্থ হইলে কমিটির সদস্যদের দুই তৃতীয়াংশ মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে।
প্রধান উপদেষ্টা এবং দশজন উপদেষ্টা নিয়োগ প্রাপ্ত হওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা অন্যান্য উপদেষ্টাদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে অবশিষ্ট পাঁচ জন উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে লিখিতভাবে সুপারিশ করিবেন। তাহারা জাতীয় পরিষদ অথবা জাতীয় সংসদের নির্দলীয় সদস্যদের মধ্য থেকেও হইতে পারিবেন অথবা আইনসভার বাইরে সমাজের আস্থাভাজন ব্যক্তিদের মধ্য থেকেও হইতে পারিবেন। তবে তাদের কেউই কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হইতে পারবেন না। জাতীয় সংসদের কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিতে পারিবেন না।
দুই-তৃতীয়াংশ মতের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হলে কমিটির সভাপতি রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক আদালতের কাছে নির্দলীয় প্রধান উপদেষ্টা ও দশজন উপদেষ্টা নির্ধারণ করিবার জন্য অনুরোধ জানাইবেন। সাংবিধানিক আদালত সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোকে উপযুক্ত শুনানির সুযোগ দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা এবং দশ উপদেষ্টার নাম রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাইবেন। এক্ষেত্রে বিচার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ থাকতে পারবেন না।
সাংবিধানিক আদালত
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি সাংবিধানিক আদালত থাকবে। সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত একজন প্রধান বিচারপতি, আপিল বিভাগের তিনজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি এবং হাইকোর্টর দুইজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি লইয়া এই আদালত গঠিত হইবে। সাংবিধানিক আদালতে কেউ মামলা দায়ের করতে পারবে না। আদালত শুধু নিজ উদ্যোগে সংবিধান লঙ্ঘনের কোন ঘটনা নিজ উদ্যোগে পর্যবেক্ষণ করিতে এবং এসব কার্য হইতে বিরত রাখিতে প্রয়োজনীয় আদেশ প্রদান করিতে কিংবা এই ধরনের কোন কার্য সম্পাদন হইলে তাহা অবৈধ ঘোষণা করিতে পারিবে।
(৩) সংবিধানের কোনো ব্যাখ্যার প্রশ্ন উত্থাপিত হইলে রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পরিষদ অধ্যক্ষ ও স্পিকার সাংবিধানিক আদালতের মতামত গ্রহণ করিতে পারিবেন। এমনকি নির্বাহী কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশনের কোন চাহিদা পূরণে অনীহা দেখালে কমিশন সাংবিধানিক আদালতে অভিযোগ করতে পারবে।
সুপ্রিম জুডিসিয়াল কমিশন
উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগ দিবে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কমিশন। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে কমিশনে সদস্য হবেন আইনমন্ত্রী, আপিল বিভাগের একজন এবং হাইকোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারক। অ্যাটর্নি জেনারেল, আইনজীবী সমিতির সভাপতি, বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং সরকারি ও বিরোধী দল ও জাতীয় পরিনষদের অধ্যক্ষ মনোনীত একজন করে সদস্য থাকবেন।
ভোটের অধিকার
প্রজাতন্ত্রের কোন কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ভোটের অধিকার নিয়ে কোন ষড়যন্ত্র করলে কিংবা ভোট প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করলে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটের ৫০ ভাগ প্রদত্ত না হলে নির্বাচন বাতিল হবে এবং পুনরায় দুই মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। জন্মসূত্রে বাংলাদেশের যে কোন নাগরিক দেশে ১৮ বছর পর্যন্ত বসবাস করলে জাতীয় সংসদ ও জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে অযোগ্য হবেন না।
রাজনৈতিক দল
রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক ও গঠনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কমিটি গঠন হয় কিনা তা নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করবে। রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন বা ছদ্মনামে কোন সংগঠন থাকবে না।
কার নিকট হতে চাদা গ্রহন করা হয় তার তালিকা এবং আয় ব্যয়ের হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করবে।
জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল
সশস্ত্র বাহিনীর অংশগ্রহণ রেখে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কাউন্সিলের প্রধান হবেন রাষ্ট্রপতি। সরকার প্রধান, আইন সভার অধ্যক্ষ, স্পিকার, সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা, তিন বাহিনী প্রধান এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব কাউন্সিলের সদস্য হবেন।
৭০ অনুচ্ছেদ: সরকারের প্রতি আস্থা-অনাস্থা ভোট এবং অর্থ বিল ছাড়া আর সকল কিছুতে স্বাধীনভাবে মত প্রদান ও ভোট দেওয়ার অধিকার আইন সভার সদস্যদের থাকবে।
আরও যা আছে
সরকারি দপ্তরে নেতা-নেত্রী বা সরকার প্রধানের বদলে জাতীয় পতাক ও জাতীয় প্রতীক থাকবে। রাষ্ট্রের শত্রু ছাড়া কোনো নিবর্তনমূলক আইন থাকবে না। রাষ্ট্রপতির দণ্ড মওকুফের কোন স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা থাকবে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয় ভিত্তিতে। এক ব্যক্তি সংসদের একাধিক আসনে নির্বাচন করতে পারবে না। ন্যায়পাল থাকবে। সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং কার্যক্রমের তদন্তের অধিকার থাকবে ন্যায়পালের। সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর কোন সংশোধনী কার্যকর করতে হলে গণভোট লাগবে।
খসড়া প্রস্তাবে এই পুনঃলিখিত সংবিধান আগামী জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর গণভোটের মাধ্যমে গৃহীত হওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সভা পরিচালনা করেন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাসান জাবেদ। স্বাগত বক্তব্য দেন মনিরুজ্জামান মিশন।