উঠান জুড়ে ঝলমলে রোদ। মাটি দিয়ে দইয়ের সরা বানিয়ে রোদে শুকানোর কাজ করছেন মমতা রানী। অন্যদিকে মাটির তৈরি গ্লাসগুলো রোদে সাজিয়ে রাখছেন শ্রী শ্যামল চন্দ্র। এদিকে পাশের ঘরে ইলেকট্রিক মোটরে ফর্মা বসিয়ে মাটির গ্লাস তৈরি করছেন সুধাংশু কুমার পাল। আবার ভাটা সাজিয়ে শুকনো গ্লাস, পাতিল, সরা পোড়ানোর কাজে ব্যস্ত অনেকেই। দেশজুড়ে বেকারত্ব ছেয়ে গেলেও, এই পাল পাড়ায় বসে নেই কেউ।
বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নের কল্যাণী পাল পাড়া, প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত এই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে বাঙ্গালী নদী। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রামটিতে বেশিরভাগ হিন্দু ও সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী পাল সম্প্রদায়ের বসবাস। কল্যাণী গ্রামে মোট জনসংখ্যা প্রায় ১ হাজার। এরমধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রাপ্তবয়স্কের সংখ্যা প্রায় ৩৫০ জন।
এক সময় এই গ্রামে শিক্ষিত লোকের হার ছিল কম। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বেড়েছে শিক্ষার হার। পিছিয়ে নেই পাল পাড়ার বাসিন্দারাও। আধুনিকতার ছোঁয়ায় নানা ধরনের জিনিসপত্রের ব্যবহার সহজলভ্য ও জনপ্রিয় হয়ে ঐতিহ্যবাহী মাটির পণ্যের ব্যবহার ভুলে গিয়েছে মানুষ। দেশের অন্যান্য এলাকায় মৃৎ শিল্প বিলুপ্তি পথে এগোলেও কল্যাণী এলাকার চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। মাটির তৈরি জিনিসপত্রের ব্যবহার ও তৈরি ভুলে যাননি কল্যাণী পাল পাড়াবাসী।
পড়াশোনার পাশাপাশি মৃৎ শিল্পকেও ধরে রেখেছেন তারা। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তারা এখনও বংশ পরম্পরায় আঁকড়ে ধরে রেখেছেন তাদের আদি পেশাকে। শুধু তাই নয়, লাভজনক হওয়ায় হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও এ পেশায় যোগ দিয়েছেন।
এই শিল্পের মাধ্যমে যেমন ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি দারিদ্রতাও দূর হয়েছে। মৃৎ শিল্পকে বেঁছে নিয়ে এই গ্রামে আর অতিদরিদ্র মানুষ নেই। এই কাজ করে সন্তানদের লেখা-পড়া করিয়ে শিক্ষিত করে তুলতে সক্ষম হয়েছে তারা। এদিকে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মাটির তৈরি এসব পণ্যের অগ্রিম অর্ডার পান তারা। সকাল থেকে সন্ধ্যা এসব তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকেন কারিগররা।
কারিগর মমতা রানী জানান, প্রতিদিন তিনি প্রায় ৩০০ সরা তৈরি করেন। প্রতিটি সরার জন্য তিনি এক টাকা করে মজুরী পান। মমতা ও তার স্বামী দুজনেই এই পেশায় যুক্ত। তাদের ২ ছেলে স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা করে। এই পেশায় নিযুক্ত থেকে পরিবারের যেমন দারিদ্রতা দূর করেছেন তেমনি সন্তানদের লেখা পড়া চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে শ্রী শ্যামল চান্দ্র পাল জানান, তার ভাটায় প্রায় ৩০ জন কাজ করেন। প্রতি এক মাস পর পর ভাটা জ্বালানো হয়। একটি ভাটায় ৫ হাজার সরা ও ২০ হাজার গ্লাস তৈরি করা যায়। প্রতিটি সরা ৭/৮ টাকা, গ্লাস দেড় থেকে দুই টাকায় বিক্রি হয়। এ পেশায় ভর করে তার তিন ছেলেকে লেখা-পড়া শিখিয়েছেন। তারা এখন বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করছেন।
এই গ্রামের সুধাংশু কুমার পাল স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনিও এই শিল্পের সাথে জড়িত। তিনি জানান, মৃৎ শিল্পের কাজ এক সময় খুব কষ্টের ছিল। চৈত্র মাসে নদী থেকে মাটি তুলে রাখতে হতো। এখন বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন মাটি এনে আমাদের কাছে বিক্রি করেন। প্রতি ট্রলি মাটির দাম পড়ে প্রায় ১ হাজার টাকা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই কাজ এখন অনেক সহজ হয়েছে। বৈদ্যুতিক মোটর ব্যবহার করে চাকা ঘুরিয়ে দইয়ের সরা, পাতিল, ও গ্লাস তৈরি করা হয়। অবসর সময়ে বসে না থেকে তিনি এই কাজ করে মাসে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বাড়তি আয় করেছেন।
কল্যাণী গ্রামের বাসিন্দা মাসুদ ব্যাংকে চাকরি করেন। এর পাশাপাশি প্রায় ১ একর জমির উপর সরা-গ্লাস তৈরির একটি কারখানা আছে তার। সেখানে প্রায় ৩০ জন কারিগর কাজ করছেন।
সুঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানান, কল্যাণী পাল পাড়ার মৃৎ শিল্প এই এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে পাশাপাশি দারিদ্রতা দূর করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। এ কারণে উপজেলা সদর থেকে কল্যাণী পর্যন্ত রাস্তা পাকাকরণসহ সরকারি নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছে।