দিনক্ষণ আগেই জানানো ছিল, সেই অনুসারেই আয়োজকরা প্রস্তুতি নিয়েছিল টেনিসের অন্যতম কিংবদন্তি রাফায়েল নাদালের পেশাদার ক্যারিয়ারের ইতি টানার। যেই ডেভিস কাপ দিয়ে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, সেখানেই নাদাল খেললেন নিজের শেষ ম্যাচ। যদিও টুর্নামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি তিনি জিততে পারেননি। তাতে হার দিয়েই টেনিস কোর্টকে বিদায় জানাতে হয়েছে রাফাকে।
তবে তাতে কী? পুরো ক্যারিয়ারে তো তার অর্জনের কোনো কিছুর কমতি নেই, তাকে তো পুরো টেনিস বিশ্ব চোন সে কোর্টের রাজা হিসেবেই। মঙ্গলবার টেনিসের বিশ্বকাপ ডেভিস কাপের নকআউট পর্বের প্রথম ম্যাচে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতার মালাগার মার্টিন কর্পেন এরিনায় ছিল কনায় কানায় পূর্ণ। কারণটা সবারই জানা। টেনিস কিংবদন্তি রাফায়েল নাদালের পেশাদার ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ ছিল এটি।
তাই শেষ বারের মতো রাফয়েলের কোর্টে খেলা দেখতে উপস্থিত হয় দর্শক-সমর্থকরা, যার মধ্যে ছিল তার পরিবারের সদস্যরাও। যদিও নাদালের জন্য শেষ ম্যাচটি সুখকর হয়নি। বিদায়ী ম্যাচে নেদারল্যান্ডের বটিক ত্যান ডি জাওয়ায়োর কছে ৬-৪, ৬-৪ ব্যবধানে হারেন তিনি। পরে ডাবলসে আলকারার ও মারলে গ্রানোয়ার্স হেরে যান ৭-৬ (৭/৪), ৭-৬ (৭/৩) গেমে। তাতে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় হয়ে যায় স্পেনের আর প্রস্তুত হয় কিংবদন্তির বিদায়ি মঞ্চ।
নাদালের ম্যাচ শেষে স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় তাকে উৎসর্গ করে বানানো একটি ভিডিও দেখানো হয়। সেখানে রজার ফেদেরার, অ্যান্ডি মারে, নোভাক জকোভিচ, সেরেনা উইলিয়ামসহ স্প্যানিশ ফুটবল তারকা রাউল এবং আন্দ্রে ইনিয়েস্তাকে কথা বলেছেন তাকে নিয়ে। এই ভিডিও দেখার পর একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন নাদাল।
পরে বিদায়ী বার্তায় নাদাল জানান টেনিসে ছাপ রেখে যেতে পারটাই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন বলেন, '২৩ বছরের পেশাদার ক্যারিয়ার আমার। এই ভালো-খারাপ সময়ে আপনারা আমার পাশে ছিলেন, খেলা চালিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তবে আমি মনে কোনো খোদ না নিয়েই বিদায় নিচ্ছি এই ভেবে যে, আমি ছাপ রেখে যেতে পারার। সেটি শুধু খেলাধুলার কারণেই নয়, ব্যক্তিগত কারণেও। আমি জানি সবার কাছে যে ভালোবাসা আমি পেয়েছি, সেটি শুধু টেনিস কের্টে যা করেছি, সেটির জন্য নয়।'
এ সময় তিনি আরও বলেন, 'আমি কেবল একজন ভালো মানুষ। ও স্বপ্নের পথে ছুটে চলা এক শিশু হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকতে চাই। আমি চাই মানুষ আমাকে এভাবে মনে রাখুক, যে কি না তার স্বপ্নকে ছাড়িয়ে গিয়ে ছিল। যে জীবনটা আমি যাপন করেছি, তাতে বলতেই হয়। আমি খুব ভাগ্যবান। আর টেনিসের কারণেই অবিস্মরণীয় সব স্মৃতি জমা হয়েছে ভাণ্ডারে।'
এ সময় ৩৮ বছর বয়সী স্প্যানিস এই টেনিস কিংবদন্তি নিজের জীবনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, 'আমি মায়োকার ছোট্ট গ্রাম থেকে উঠে আসা একজন সাধারণ ছেলে, যে কিনা নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটেছে সব সময়, যতটা সম্ভব কঠোর পরিশ্রম করে আমি আজ যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখানে এসেছি।'
২০০১ সালে ১৫ বছর বয়সে প্রতিযোগিতা মূলক টেনিসে পা রাখেন নাদাল। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। কোর্টে নাদালের কাটিয়ে দিয়েছেন ২৩ বছর। এ সময় তিনি খেলেছেন ১ হাজর ৩০৭টি ম্যাচ। তার মধ্যে জয়ী হয়েছেন ১ হাজার ৮০টি ম্যাচে। টেনিস কোর্টে কাটিয়েছেন ২ হাজার ৫৪৩ ঘণ্টা। অর্জনেও কোনো কমতি নেই তার।
পুরো কারিয়ারে তিনি জিতেছেন ২২টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম, রেকর্ড ১৪টি ফ্রেঞ্চ ওপেন শিরোপা, চারটি ইউএস ওপেন খেতাব এবং দুটি অস্ট্রেলিয়ান ওপেনসহ সব মিলিয়ে তিনি ক্যারিয়ারে জিতেছেন মোট ৯২টি শিরোপা। এছাড়া জিতেছেন দুটি অলিম্পিক স্বর্ণপদক শুধু তা-ই নয়, টেনিসের ইতিহাসে, মা কোটে একতরফা রাজত্ব করে গিয়েছেন নাদাল।
টেনিসের ইতিহাসে এখন অবধি কোনো প্লেয়ার তার ধারে-কাছে আসতে পারেননি। ১১৬টি ম্যাচের মধ্যে ১১২টিতে জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন তিনি। ১৯ বার টুর্নামেন্ট খেলতে নেমে ১৪ বার চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফিরেছেন নাদাল। রোলা গারোতে কোনো দিন ফাইনালে পরাজয়ের মুখ দেখেননি তিনি।
এর মধ্যে আছে চারটি ফাইনাল, যেখানে একটা সেটও হারেননি তিনি। ক্রে কোর্টে টানা ৮১ ম্যাচ জয়ের রেকর্ডও গড়েছেন তিনি। তবে পুরো ক্যারিয়ারেই তাকে সবচেয়ে বেশি সংগ্রাম করতে হয়েছে চোটের সঙ্গে। হয়তো চোট তাকে কোর্টের বাহিরে আটকে না রাখলে তার অর্জনের পরিসংখ্যানটা হতো আরও বেশি।