পরকীয়া সমাচার

 

সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান

 

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। তখন আমি একটা বায়িং অফিসে সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার হিসেবে চাকরি করি। যদিও আমি স্বাধীনভাবে নিজেই নিজের বায়ার সরাসরি ডিলিং করতাম, কিন্তু একজন ম্যানেজারের অধীনস্থ ছিলাম। তিনিই আমার বস, যিনি অহেতুক তদারকির নামে আমাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিলেন। বায়িং অফিসের মালিক, পরিচালক ও জিএম সাহেব আমার কাজে সন্তুষ্ট থাকলেও আমার বস সব সময় কিছু না কিছু অহেতুক ভুল ধরে আমার অধীনস্থ জুনিয়র কলিগদের সামনে অপদস্থ করে আমার ইজ্জত পাংচার করে দিতেন। এসব করে তিনি বেশ মজা পেতেন আর দাঁত কেলিয়ে হাসতেন। আমিও ‘ইয়েস বস’ মুভির শাহরুখ খানের মতোই ইয়েস বস বলে নীরবে সহ্য করে নিতাম। তবে মনের ভেতর জিদ চেপে যায়, তাঁকে যেভাবেই হোক জব্দ করতেই হবে। তাই তাঁর দুর্বলতা খুঁজতে লাগলাম। অবশেষে একদিন পেয়েও গেলাম। তাঁর কেবিন রুমের পাশে ডেক্সে বসে এক জুনিয়র কলিগের মাধ্যমে জানতে পারি, তিনি পরকীয়া প্রেমে মাত্রাতিরিক্তভাবে আসক্ত। যদিও উনার ঘরে সুন্দরী স্ত্রী ও দুই পুত্র সন্তান আছে। তবুও তিনি বিভিন্ন মেয়েদের সঙ্গে ফেসবুকে চ্যাটিং করেন এবং ফোনে অন্তরঙ্গ কথা বলেন। আর মেয়েগুলো তাঁকে মোরগা বানিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়।

এমন একটা তথ্য পাওয়ার পর আমার ঘনিষ্ঠ ক’জন বন্ধুর সঙ্গে পরামর্শ করে একটা দুষ্ট ফন্দি বের করলাম। ফন্দি মোতাবেক, ফেসবুকে আমি একটা ফেক মেয়ে আইডি খুলে ফেললাম। ফেক আইডির নাম দিলাম ‘ঐশী চৌধুরী’। আমার এক বন্ধুর সহযোগিতায় ভারতীয় একটা সুন্দরী মেয়ের কিছু ছবি সংগ্রহ করলাম। সেই ছবিগুলো একের পর এক আপলোড করলাম। রিয়েল আর ফেক, যেটাই হোক, সুন্দরী মেয়ে আইডিতে ফ্রেন্ড রিক্যুয়েস্টের অভাব হয় না। এক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় হাজারখানেক ফ্রেন্ড রিক্যুয়েস্ট এল। আমিও সবগুলো রিক্যুয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করলাম। ছবিগুলোতে প্রচুর লাইক ও কমেন্টসে ভরে গেছে। এখন ফেক আইডিটা রিয়েল আইডি মনে হচ্ছে। এবার সময় হলো আমার বসকে ফ্রেন্ড রিক্যুয়েস্ট পাঠানোর। যেদিন ফ্রেন্ড রিক্যুয়েস্ট পাঠালাম, সেদিনই অ্যাকসেপ্ট হলো। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় সবগুলো ছবিতে লাইক দিলেন। আমি তো খুশিতে গদগদ করছি। শিয়াল তাহলে টোপ গিলেছে। আমিও ওই ফেক আইডি থেকে তাঁর কিছু ছবিতে লাইক দিলাম। ব্যস কাজ হয়ে গেল। তিনি প্রতিদিন সকাল-বিকাল ফেসবুক মেসেঞ্জারে রুটিনমাফিক গুড মর্নিং, গুড আফটার নুন লিখে শুভেচ্ছা জানাতে থাকলেন। আমিও ফেক আইডি থেকে তাঁর সঙ্গে তাল মিলিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে থাকলাম।

এভাবে সপ্তাহ খানেক যাওয়ার পর তিনি মেসেঞ্জারে ভালো বন্ধু হওয়ার আহ্বান জানালেন। আমিও ফেক আইডি থেকে সেই আহ্বানে সাড়া দিলাম। তখন থেকে তিনি নিয়মিত বিভিন্ন ব্যক্তিগত কথাবার্তা লিখে মেসেজ পাঠানো শুরু করে দিলেন। আমিও সমান তালে উত্তর দিয়ে যাচ্ছি। সম্পর্কটা বেশ অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেছে। এবার তিনি সরাসরি মোবাইল ফোনে কথা বলতে চান, তাই মোবাইল নম্বর চাইলেন। আমি তো তখন মহাবিপদে পড়ে গেলাম। বন্ধুদের বুদ্ধিতে একটা নতুন সিম ও চায়না মোবাইল সেট কিনলাম। যেটা দিয়ে ভয়েস পরিবর্তন করে পুরুষ গলায় কথা বললেও অপর প্রান্তে মেয়েলি গলায় শোনা যায়। তারপর শুরু হলো মোবাইলে ভয়েস পরিবর্তন করে মেয়েলি গলায় কথা বলা। তিনি জানালেন, উনার স্ত্রীর সঙ্গে সেপারেশন চলছে। উনার স্ত্রী ও দুই পুত্র সন্তান আলাদা থাকে। তিনি খুব নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেন। যা ছিল পুরোপুরি মিথ্যা। আমি সব কথাই রেকর্ড করে রাখতাম আর ইনবক্সে মেসেজগুলো তো আছেই। কিছু দিন কথা বলার তিনি আসল রূপ প্রকাশ করলেন। ধীরে ধীরে কথার ফিজিক্স-কেমেস্ট্রি থেকে শুরু করে একদম বায়োলজি পর্যন্ত চলে গেলেন। মেয়ে চরিত্রে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে অস্বস্তি লাগলেও বেশ মজা পাচ্ছিলাম। তিনি তখন দেখা করার জন্য অস্থির হয়ে গেলেন। এমনকি, কোনো একটা আবাসিক হোটেলে গোপন অভিসারে যাওয়ার প্রস্তাবও রাখলেন।

এমন অবস্থায় হঠাত্ করেই একদিন অফিস টাইমে আমি তাঁর মেসেঞ্জারে তাঁর সঙ্গে চ্যাটিংয়ের সবগুলো স্ক্রিন শট ও ভয়েস রেকর্ডগুলো পাঠালাম। সেই সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর মোবাইল নম্বরটাও দিলাম। এটাও জানালাম, আপনার কুকীর্তির সবকিছু আজকেই আপনার স্ত্রীর কাছে পাঠাব। এসব দেখে যেন তাঁর আকাশ থেকে মাটিতে পড়ার অবস্থা। তিনি বারবার মোবাইলে কল দিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু আমি পিক করছি না। আমি আমার ডেক্সে বসে তাঁর অবস্থা দেখার চেষ্টা করছিলাম আর মজা নিচ্ছিলাম। তিনি তখন একের পর এক মেসেজ দিয়ে যাচ্ছেন। মেসেজের কথাগুলো ছিল এমন, ‘আমি তোমার পায়ে ধরি, আমার স্ত্রীর কাছে এসব দেবে না। সে এসব দেখলে আমার সংসার ভেঙে যাবে। আমাকে তখন আত্মহত্যা করতে হবে।’ আমি কিছু সময় পর তাঁর রুমে ঢুকে সালাম দিলাম। তিনি আমাকে দেখে খুব বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘খুব জরুরি কিছু না হলে পরে আসেন।’ আমি বললাম, ‘বস, আমি জরুরি বিষয়ে কথা বলতেই এসেছি।’ তারপর চেয়ারে বসে তাঁকে জানালাম, ঐশী চৌধুরী নামের আইডিটা আমার খালাতো বোনের আইডি। সে আপনাদের দুজনের মাঝে ঘটে যাওয়া সবকিছুই বিস্তারিতভাবে আমাকে বলেছে। এখন সে আপনার পরকীয়া প্রেমের সব কুকীর্তির কথা ভাবিকে জানাতে চাচ্ছে কিন্তু আমি খুব রিক্যুয়েস্ট করে ঐশীকে আটকে রেখেছি। আমার বসের তখন আমার পায়ে ধরার অবস্থা। আমার সঙ্গে সব খারাপ ব্যবহারের জন্য দুই হাত জোড় করে মাফ চাইলেন। আর এই মহাবিপদ থেকে উদ্ধারের সহযোগিতা কামনা করলেন। পাশাপাশি আল্লাহর কসম কেটে জানালেন, জীবনে আর এমন কাজ করবেন না। আমিও দয়ার শরীর, তাই সেই যাত্রায় তাঁকে মাফ করে দিলাম। এই ঘটনার পর সেখানে প্রায় ছয় মাস চাকরি করে ছিলাম। তিনি সেই ছয় মাসে আমাকে একটাও বাজে মন্তব্য করেননি। ঐশী চৌধুরী নামে একটা ফেক আইডি দিয়ে পরকীয়া প্রেমিক বসকে ভালোই জব্দ করেছিলাম। এখনো সেই ঘটনার স্মৃতি মনে হলে হাঃ হাঃ করে হেসে উঠি।

চৌধুরীপাড়া, মালিবাগ, ঢাকা।