শ্রীলঙ্কায় পার্লামেন্ট নির্বাচনে ৬২ শতাংশ ভোট পেয়ে জয় পেয়েছে প্রেসিডেন্ট অনুঢ়া কুমার দিশানায়েকের বামপন্থি জোট নিউ পিপলস পাওয়ার (এনপিপি)। এর মধ্য দিয়ে এই দ্বীপরাষ্ট্রে যুগ যুগ ধরে চলে আসা রাজনৈতিক বন্দোবস্ত পালটে গেল। পুরোনো দলগুলো বলতে গেলে লাইমলাইট থেকে বিদায় হয়ে গেল। একসময়ের ছোট ফল জেডিপি নেতা অনুঢ়া এনপিপি জোটের হয়ে প্রেসিডেন্ট পদে জয় লাভের মধ্য দিয়ে দেশটিতে রাজনৈতিক ভূমিকম্পের সূচনা হয়েছিল।
গত সেপ্টেম্বরে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন অনুঢ়া। কিন্তু তখন পার্লামেন্টে তার নির্বাচনি জোট এনপিপির আসন ছিল মাত্র তিনটি। বিশ্লেষকরা বলেন, পার্লামেন্টে নিজ জোটের আসনসংখ্যা বাড়াতে তিনি আগাম নির্বাচন দেন। বলা যায়, যে লক্ষ্যে তিনি নির্বাচন আহ্বান করেন, তা সফল হয়েছে।
১৪ নভেম্বর শ্রীলঙ্কায় পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়। পার্লামেন্টে আসনসংখ্যা ২২৫। তবে এর মধ্যে ১৯৬ আসনে সরাসরি ভোট হয়। বাকি ২৯টি সংরক্ষিত 'জাতীয়ভিত্তিক' আসন বণ্টন হয় ১৯৬ আসনে কোন দল কতটিতে জিতেছে, তার ভিত্তিতে। নির্বাচনে ১৯৬ আসনের মধ্যে এনপিপি ১৩৭টিতে জয় পেয়েছে। অর্থাৎ তারা প্রায় ৭০ শতাংশ আসন পেয়ে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। জোটটি সব মিলিয়ে ৬২ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এনপিপি জোটের প্রধান প্রতিপক্ষ সমাগি জনা বালাবেগায়া (এসজেবি) মাত্র ১৪০ আসনে জয় পেয়েছে। আর দীর্ঘ ১৫ বছর দেশ শাসন করা রাজাপক্ষের দল এসএলপিপি পেয়েছে মাত্র তিন আসন।
যাহোক, ১৮ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট অনুঢ়া নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ ফল কী বার্তা দিচ্ছে? দেশকে স্থিতিশীল করতে কতখানি সক্ষম হবে নতুন সরকার?
২০২২ সালে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যায় বহুগুণ। প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন দেশটির বিক্ষুব্ধ জনগণ। ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে দেশ থেকে পালিয়ে যান। এরপর প্রেসিডেন্ট ভবনে ঢুকে পড়ে উল্লাস করে দেশটির জনগণ। মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় সেই দৃশ্য। পদত্যাগ করেন তার ভাই প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষে। অবসান হয় রাজাপক্ষে যুগের। এর প্রায় দুই বছর পর গত সেপ্টেম্বরে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। এতে জয়ী হন অনূঢ়া। শ্রীলঙ্কায় ২০২০ সালের আগস্টে পাঁচ বছর মেয়াদে পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়েছিল। সে হিসাবে নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক বছর আগে দেশটিতে আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এনপিপি জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, যা দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জয়।
এবারের নির্বাচনে এনপিপি জোট ৭০ লাখ অর্থাৎ ৬২ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় অনূঢ়া ৪২ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। এর অর্থ, তিনি সংখ্যালঘু থেকে শুরু করে সব ধরনের ভোটারের সমর্থন তার জোটের পক্ষে টানতে পেরেছেন। তবে রাজধানী কলম্বোর উপকণ্ঠে আতশবাজি জ্বালানো ছাড়া এ নিয়ে তেমন উদ্যাপন করেনি দলটি।
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার রাজাপক্ষে পরিবারের পদুজানা পেরামুনা পার্টি এক দশকের বেশি সময় শ্রীলঙ্কার ক্ষমতায় ছিল। বিগত আইনসভায় তাদের ১৪৫টির বেশি আসন ছিল। কিন্তু এবারের পার্লামেন্টে দলটি প্রায় মুছে গেছে। দলটি মাত্র তিনটি আসন পেয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পার্লামেন্টে অনুঢ়ার জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন তার হাতকে শক্তিশালী করল। প্রেসিডেন্ট কার্যনির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী, কিন্তু অনুঢ়ার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা নিয়োগে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন ছিল। এছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর তিনি প্রেসিডেন্টের একচ্ছত্র ক্ষমতায় রাশ টানার সুযোগ পাবেন। তিনি বিরোধী শিবিরে থাকার সময় এ নিয়ে প্রতিবাদ করে আসছেন।
পার্লামেন্টে নির্বাচনে নিজের রাজনৈতিক দল জনতা ভিমুক্তি পেরুমুনার (পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট- জেভিপি) বিপুল বিজয়ের পর দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদে ফের হরিনি অমরসুরিয়াকেই নিয়োগ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট অনূঢ়া। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বের পাশপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে তাকে। ১৮ নভেম্বর নতুন প্রধানমন্ত্রী এবং ২২ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভা আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেয়।
ডেইলি মিরর অনলাইনের বিশ্লেষক জয়নব হুসেন ও রেনুকা জয়বর্ধনে বলছেন, 'প্রেসিডেন্ট অনুঢ়ার সামনে শপথ নেওয়া ২১ সদস্যের মন্ত্রিপরিষদের মধ্যে সংসদে ১৩ জন নতুন মুখ তাদের নিজ নিজ পোর্টফোলিওর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। অনেকেই একমত হবেন যে নবনিযুক্ত মন্ত্রিসভা নজিরবিহীনভাবে শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে যোগ্য। আগের সরকারের তুলনায় নতুন মন্ত্রিসভায় এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদ এবং স্বনামধন্য পেশাজীবী।'
লেখকরা মূলত বলতে চাইছেন, নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া মন্ত্রিরা প্রথাগত রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বাইরে থেকে আসা, অতীতে শ্রীলঙ্কায় যেমনটা দেখা যায়নি। মিররের আরেক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, 'অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থতার জন্য ২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের বিরুদ্ধে শক্তিশালী বিদ্রোহ থেকে এনপিপি তার শক্তি অর্জন করেছে। এনপিপি সরকার অর্থনৈতিক বাধা এবং ভূরাজনৈতিক কৌশলের মুখোমুখি হতে বাধ্য। এজন্য অবশ্যই দেশকে প্রস্তুত করতে হবে এবং ধাক্কা সামলানোর জন্য সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। এনপিপির পুনর্মিলনের প্রচেষ্টা চালানোর ক্ষমতা শুধু শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ বাহিনী দ্বারা নির্ধারিত হয় না। দেশটি এখন একটি উন্মোচিত বৈশ্বিক ব্যবস্থার ক্রসকারেন্ট দ্বারা বিপর্যস্ত। কেন্দ্র-বাম এনপিপি সরকারের এখন একটি অসাধারণ ম্যান্ডেট রয়েছে।
স্বাধীনতার পর শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক সংকটের পর অর্থনীতি পুনর্গঠনের সময় এটি কি আইএমএফের কঠোরতা কর্মসূচির বিরুদ্ধে পিছিয়ে যাবে এবং জনগণকে পরিত্রাণ দেবে?' এই প্রশ্ন সামনে রেখে বিশ্লেষকরা বলছেন, শ্রীলঙ্কার জাতিগত সম্প্রদায়ের মধ্যে পুনর্মিলন ঘটাতে এনপিপি নেতৃত্বের ক্ষমতা সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্তির ওপর নির্ভর করে। যদি নতুন সরকার ব্যর্থ হয়, তাহলে এটি জেনোফোবিক শক্তির জন্য জায়গা তৈরি করবে। নবনিযুক্ত মন্ত্রিসভায় মুসলিম সম্প্রদায়ের কেউ নেই। একে একটা ধাক্কা হিসেবে দেখছেন অনেকে।
এ নিয়ে কলম্বো টেলিগ্রাফে আর মোহাম্মদ লিখেছেন, 'শ্রীলঙ্কার নতুন মন্ত্রিসভার ঘোষণা মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক হতাশার জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিক স্মৃতিতে প্রথম বারের মতো এক জন মুসলিম প্রতিনিধি ছাড়াই মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে, যা অন্তর্ভুক্তি, সমান প্রতিনিধিত্ব এবং সুশাসনের প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।' এটাকে একটি উদ্বেগজনক নজির হিসেবে বর্ণনা করে তিনি লিখেছেন, মন্ত্রিসভায় মুসলিম মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি গভীরভাবে উদ্বেগজনক, বিশেষ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থায় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে। তিনি আরো বলেন, সাম্প্রতিক নির্বাচনে এনপিপিকে মুসলিম সম্প্রদায় যে অভূতপূর্ব সমর্থন দিয়েছে তা বিবেচনা করার সময় এই বর্জন আরো বেশি উদ্বেগজনক।
বস্তুত, নির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে সরকার গঠনের জন্যই প্রেসিডেন্ট অনুঢ়া আগাম নির্বাচন দেন। এখন তার সেই আরাধ্য কেবিনেট গঠিত হলো। কিন্তু দেশকে সঠিক ধারায় ফিরিয়ে নিতে প্রেসিডেন্টকে পাড়ি দিতে হবে কঠিন পথ। সংখ্যালঘুরা তার পথের সাথি, সন্দেহ নেই। কিন্তু তার প্রকাশ কেন ঘটছে না, মার্কসবাদী প্রেসিডেন্টকে সেসব প্রশ্নের মুখেও পড়তে হতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক