জুলাই অভ্যুথানের পর রাষ্ট্র সংস্কারে জনমানুষের দাবিদাওয়া সরকারের কাছে তুলে ধরতে গঠিত প্ল্যাটফরম হলো জাতীয় নাগরিক কমিটি। জুলাই আন্দোলনে বিভিন্ন সেক্টরে ভূমিকা রাখা মোট ১০৫ জন সদস্যের এই সংগঠনে মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করছেন সামান্তা শারমিন। রাষ্ট্র সংস্কার, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নির্মাণ এবং সাম্প্রতিক নানা ইস্যুতে তিনি কথা বলেছেন দৈনিক ইত্তেফাকের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবির হাকিম।
দৈনিক ইত্তেফাক: জাতীয় নাগরিক কমিটি কোন প্রেক্ষাপটে গঠিত হয়েছে?
সামান্তা শারমিন: ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরে ছাত্ররা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামে সংগঠিত হলেও আন্দোলনে অংশ নেওয়া অন্যান্য শ্রেণি-পেশার মানুষের কোনো সংগঠিত রূপ ছিল না। রাষ্ট্র সংস্কার ও পুনর্গঠনে তাদের আকাঙ্ক্ষাগুলো বাস্তবায়নে একটা সংগঠিত প্ল্যাটফরম দরকার ছিল। সে জায়গা থেকেই জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠিত হয়েছে। এটি কোনো রাজনৈতিক দল নয়।
ইত্তেফাক: শুরুতে রাজনৈতিক দল নয়, বললেও পরবর্তী সময় রাজনৈতিক দল গঠনের আলাপও উঠেছে। এক্ষেত্রে নাগরিক কমিটি কতদূর এগিয়েছে?
সামান্তা: বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোতে তরুণরা নেতৃত্বের দিক থেকে সুযোগ পায় না। অথচ বিভিন্ন আন্দোলন বা যে কোনো কর্মসূচিতে দলগুলো তরুণদের ব্যবহার করে। এ কারণে তাদের একটা রাজনৈতিক দল গঠন হোক, সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে এ ধরনের দাবি আছে। কিন্তু দল গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে কিংবা আদৌ দল গঠন করব কি না, সে বিষয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে চূড়ান্ত কোনো আলাপ হয়নি এখনো। আমরা এখনো সারা দেশের অভ্যুত্থানের শক্তিকে সংহত করা এবং আহত ও শহিদ পরিবারগুলোর দায়িত্ব নেওয়ার কাজটাই করছি।
ইত্তেফাক: সংবিধান ইস্যুতে আপনারা নতুন সংবিধানের পক্ষে বিভিন্ন সময় কথা বলেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সংবিধান ইস্যুতে অফিশিয়াল কোনো বক্তব্য দেননি। এ বিষয়ে কী ভাবছেন?
সামান্তা: বাহাত্তরের সংবিধানটা আসলে এমনভাবে শুরু হয়েছে যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে প্রোক্লামেশন যেভাবে কাটছাঁট করে নতুন করে কিছু মূলনীতি তৈরি করা হয়েছে, এগুলোকে আমরা মনে করছি বাইরে থেকে আসা চিন্তা, যেটা আসলে আমাদের দেশের জনতার মধ্যে থেকে উত্থাপিত কোনো বিষয় নয়। এই বাইরে থেকে আসা জিনিস আমাদের ওপরে একপ্রকার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত ১৫ বছরের রেজিমে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, সাংবিধানিক সংকট ইত্যাদি পরিভাষা দিয়ে আমাদের শোষণ করা হয়েছে। সংবিধান প্রণয়নে জনতার অংশগ্রহণ না থাকায় এটি জনবিরোধী সংবিধান হয়ে ওঠেছিল। এই গণবিরোধী সংবিধানকে ঝেড়ে ফেলে জনমুখী একটা সংবিধান করে তোলা এখন সময়ের দাবি। আমরা চাই সংবিধান নিয়ে সারা দেশে উঠান বৈঠক হোক, আলাপ-আলোচনা, আড্ডা হোক।
ইত্তেফাক: সংবিধান পুনর্লিখন ইস্যুতে অনেক রাজনৈতিক দল পক্ষে নেই। এ বিষয়টি আপনারা কীভাবে দেখছেন?
সামান্তা: গত ৫৩ বছর ধরে আমরা সাংবিধানিক সংকটের ঊর্ধ্বে উঠতে পারছি না। কারণ, আমরা দেখছি বিএনপিসহ অন্য সব অভ্যুত্থানকারী শক্তি বিশেষত রাজনৈতিক দলগুলো নানান মতে আছে। আমরা আহ্বান করেছি, এই ইস্যুতে ঐক্য খুব জরুরি।
ইত্তেফাক: আপনারা লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি বন্ধের কথা বলেছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং নাগরিক কমিটির মধ্যে সম্পর্ক কী?
সামান্তা: আমরা পরিষ্কারভাবে বলেছি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আমাদের নেতৃত্বস্থানীয়। তারা আমাদের ন্যাশনাল ফিগার। তাদের নেতৃত্বে আমরা এগিয়ে যাব। এটা লেজুড়বৃত্তি বলা যাবে না। আমরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।
ইত্তেফাক: নাগরিক কমিটি কি আসলে সরকারের অংশ?
সামান্তা: সরকারের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা সরকারের অনেক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছি। আমরা বিশ্বাস করি জবাবদিহিতার জায়গা না থাকলে আবারও ফ্যাসিস্ট কাঠামো গড়ে ওঠবে। এই মুহূর্তে সরকারের দুর্বলতা, মন্থরগতির যদি সমালোচনা না করি তাহলে আমাদের রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা থাকল না। আবার সরকার যদি উত্তর দিতে না পারে, তাহলে সরকারও জবাবদিহিতার অংশ হলো না।
ইত্তেফাক: সামনের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে নাগরিক কমিটি কী ভাবছে?
সামান্তা: বিগত নির্বাচনগুলোতে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। আমরা চাই বিগত ৩টা নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করা হোক। আমরা চাই সামনের নির্বাচন প্রশ্নহীন হোক, সবাই যেন তাতে অংশগ্রহণ করতে পারে। তবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে আসতে চাইলে তাদের বিচারিক প্রক্রিয়া সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অবৈধ নির্বাচনে যারা অংশগ্রহণ করেছে তাদের অবস্থান পরিষ্কার ছাড়া পুনর্বাসন সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে ক্ষমা চাইতে হবে।