সব পাখির নীড়ে ফেরা হয় না 

শীতের শুরুতেই ঝাঁকে ঝাঁকে খাবারের সন্ধানে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, উল্লাপাড়াসহ চলনবিলে ছুটে আসছে পরিযায়ী পাখিসহ দেশীয় নানা প্রজাতির পাখি। পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠছে চলনবিলসহ আশপাশের এলাকাগুলো। এ সুযোগে সৌখিন ও পেশাদার শিকারিরা বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ পেতে এসব পাখি নিধন শুরু করছে। প্রচলিত আইনের তেমন প্রয়োগ না থাকায় লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না পাখি শিকারিদের।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চলনবিল অধ্যুষিত তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নের নওগাঁ হাট এলাকার করতোয়া নদীর বৃরায়নগর সেতু সংলগ্ন জলাশয়ে বসেছে হাজারো পাখির মেলা। দলে-দলে বালিহাঁস পানিতে সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে। গাছের ডালে বসে আছে ছোট-বড় পানকৌড়ি, বক ও মাছরাঙ্গা। মাঝে মধ্যে গাঙচিলের আক্রমণে পাখিগুলো গাছের ডাল ও পানি থেকে ঝাঁকে বেধে উড়ে উঠছে। রং-বেরঙের পাখির কলকাকলিতে মুখরিত জলাশয় এলাকা।

চলনবিল রক্ষা আন্দোলন কমিটির তাড়াশ উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক রাজু বলেন, পাখি শিকার দণ্ডনীয় অপরাধ জেনেও তা করা হচ্ছে। পাখি কিনে ফেসবুকে পোস্ট করছেন অনেকে। মূলত ক্রেতার উৎসাহে পাখি ধরেন শিকারিরা। চলনবিলের অতিথি পাখি বাঁচাতে শিকারি ও ক্রেতা উভয় পক্ষের সচেতনতা জরুরি।

ছাইফুল ইসলাম নামে স্থানীয় এক পাখি প্রেমী বলেন, শিকারিরা ফাঁদ পেতে, জাল টাঙিয়ে, বিষটোপ ও বড়শি দিয়ে দিন-রাত পাখি শিকার করেন। বিষটোপের দানাদার বিষ খেয়ে অনেক পাখি যত্রতত্র মরে পড়ে থাকে। তাছাড়া পলাশি গ্রাম ও বস্তুল গ্রামে জবাই করা ঘুঘু পাখি, বক পাখি, টিয়া পাখি ও সারস পাখি দেখতে পেয়েছি। গত দুমাসে তাড়াশের দিঘী বাজার, কুন্দইল বাজার, বস্তুল বাজার ও গুরুদাসপুর উপজেলার বিলশা বাজার, খুবজিপুর বাজার, চাচকৈড় বাজারে ঘুরে বালি হাঁস, রাতচোড়া ও বিভিন্ন প্রজাতির বেশ কিছু বক পাখি মুক্ত আকাশে ছেড়ে দিয়েছি।

bird 1

রাতের পাখি শিকারিরা বলেন, সন্ধ্যার পরে চলনবিলের বিস্তীর্ণ মাঠের অনাবাদি জমির মধ্যে কারেন্ট জাল ও বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ পেতে রাখি। রাতে আশপাশে শুয়ে থাকি। ভোরে জাল ও ফাঁদ থেকে পাখি ছাড়িয়ে বেচে দেই। পাখির দাম চড়া, ব্যাপক চাহিদাও রয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষিত লোকজন বেশি পাখি কিনে থাকেন। অনেকে মুঠো ফোনে যোগাযোগ রাখেন। অগ্রিম টাকা পাঠিয়ে দেন। তাদের কাছে পাখি পৌঁছে দেই।
 
তাড়াশ ডিগ্রি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মর্জিনা ইসলাম বলেন, শীতে সাদা বক, ধূসর বক, বালি হাঁস, শামুকখোল, রাতচোড়া, কাঁদা খোঁচা, মাছ রাঙ্গা, ছোট পানকৌড়ি, বড় পানকৌড়ি সারসসহ অসংখ্য পাখির দেখা মেলে চলনবিলে। এ সময় পাখি শিকারিদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। পাখি জৈববৈচিত্রের অন্যতম অংশ, প্রাকৃতিক সম্পদও বটে। সুস্থ-সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা অপরিহার্য।

সেচ্ছাসেবী সংগঠন ভিলেজ ভিশনের নির্বাহী পরিচালক শরীফ খন্দকার বলেন, বেশকিছু পাখি শিকারিকে শনাক্ত করতে পেরেছি। তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। কয়েকজন পাখি ক্রেতার সঙ্গেও কথা হয়েছে। সবার অংশ গ্রহণে সচেতনতামূলক সভা করা হবে দ্রুতই।

bird

বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক জহির আকন্দ বলেন, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী পাখি শিকারিদের এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। 

উপজেলা বন কর্মকর্তা কামরুজ্জামান বলেন, লোকবল কম আমাদের। পাখি শিকারিদের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারছিনা। 

তাড়াশ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক খালিদ হাসান বলেন, ইতোমধ্যে দুইজন পাখি শিকারির জরিমানা করা হয়েছে পাঁচ-পাঁচ দশ হাজার টাকা। খাঁচার পাখিগুলো মুক্ত করা হয়েছে। পরে মুসলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় তাদের।

এ প্রসঙ্গে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুইচিং মং মারমা বলেন, পাখি শিকারিদের অবস্থান সম্পর্কে জানান। প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।