‘ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) যে সংশোধনীর প্রস্তাব রাজউক প্রকাশ করেছে, সেখানে শহরের বাসযোগ্যতা, ধারণক্ষমতা, নাগরিক সুবিধাদি, পরিবেশ প্রাধান্য পায়নি। গুরুত্ব পেয়েছে আবাসন ব্যবসায়ীদের ব্যাবসায়িক স্বার্থ। ড্যাপ (২০২২-৩৫) চূড়ান্ত হওয়ার দুই বছরের মধ্যে দুই বার ড্যাপ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ড্যাপ সংশোধন প্রক্রিয়ায় রাজউকের কতিপয় কর্মকর্তা, পেশাজীবী এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ। গোষ্ঠীস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার সংস্কৃতি জুলাই গণঅভ্যুত্থানোত্তর বাংলাদেশে কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই প্রবণতা চলতে থাকলে যানজট-দূষণে স্থবির ও অবাসযোগ্য হয়ে পড়া ঢাকা আরও নিশ্চল হয়ে পড়বে। এ থেকে উত্তরণের জন্য পরিকল্পনাগত টেকসই কৌশল ও পন্থা কাজে লাগিয়ে জনস্বার্থ, বাসযোগ্যতা, জনস্বার্থ ও পরিবেশকে প্রাধান্য দিয়েই ড্যাপের প্রয়োজনীয় পরিমার্জনা করতে হবে।’
গতকাল বুধবার ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) আয়োজিত পরিকল্পনা ও উন্নয়ন পর্যালোচনা-বিষয়ক সংলাপে এসব কথা বলেন বক্তারা। সংলাপের প্রতিপাদ্য ছিল, ‘কোন স্বার্থে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) বারবার সংশোধনের উদ্যোগ :আইপিডির পর্যবেক্ষণ’।
অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে আইপিডির পক্ষ থেকে পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘ড্যাপ সংশোধনে রাজউকের সংশোধনীতে ভবনের আকার-উচ্চতা বাড়ানোর প্রস্তাবনা ছাড়া অন্য কিছু আসেনি। বন্যাপ্রবাহ এলাকা, জলাভূমি, কৃষিজমি রক্ষার বিষয়টি উপেক্ষায় থেকেছে। আমরা বলে এসেছিলাম, আবাসন ব্যবসায়ী ও কিছুসংখ্যক পেশাজীবী ড্যাপ বাতিল বা স্থগিতের আবেদন করছে শুধু ভবন নির্মাণে বেশি এফএআর (ফার) মান বাড়ানোর জন্যেই। আমাদের সেই শঙ্কাই সত্যে প্রমাণিত হয়েছে। ড্যাপ সংশোধনে প্রস্তাবিত এরিয়া ফার ও ব্লকভিত্তিক ফার মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাসযোগ্য শহর নির্মাণে পরিকল্পনার ব্যাকরণ অনুসরণ করা হয়নি। ফলে ড্যাপে প্রস্তাবিত সংশোধনীসমূহ ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতাকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।’
আইপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, বড় শহরের জনঘনত্ব সাধারণত একরপ্রতি ১০০ জন বা প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৫-৩০ হাজার হয়। এই জনঘনত্বও শহরের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কিছু নগর এলাকায় থাকে, যা শহরের প্রান্তের দিকে ধীরে ধীরে কমতে থাকে। চূড়ান্ত ড্যাপে ঢাকার অপরিকল্পিত এলাকা জিনিজিরার জনঘনত্ব কাঠাপ্রতি পরিবারসংখ্যা ১.২ বা একরপ্রতি ১৫০ দেওয়া থাকলেও ১৮ নভেম্বর রাজউক প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ১৫০ শতাংশ বেড়ে কাঠাপ্রতি পরিবারসংখ্যা ৩.০ বা একরপ্রতি প্রায় ৩৫০ জন প্রস্তাব করা হয়েছে। এই এলাকার আগে প্রস্তাবিত এফএআর মান ১.৩ থেকে ১৫৪ শতাংশ বৃদ্ধি করে প্রস্তাব করা হয়েছে ৩.৩।
ব্লক ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে এলাকাভিত্তিক ফার বোনাস সাধারণত ১৫-২০ শতাংশ হয়ে থাকে। অথচ রাজউক এলাকাভিত্তিক ফার মানের তুলনায় ব্লকভিত্তিক ফার মান ৯০-১২০ শতাংশ বাড়িয়ে প্রস্তাব করেছে, যা বৈশ্বিক পরিকল্পনা কৌশলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এভাবেই অনেক এলাকারই ফার মান অযাচিতভাবে বেড়েছে। ফলে এসব এলাকার বাসযোগ্যতা আরও সংকটে পড়বে বলে মনে করে আইপিডি।
অনুষ্ঠানে আইপিডির অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, ‘একটি বসবাসযোগ্য শহরে শুধু আবাসন নয়; পরিবেশ, প্রতিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গণপরিবহন ইত্যাদি বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার কথা। অথচ আমাদের ব্যবসায়ী মহল কেবল ড্যাপ বাতিল এবং ফার বৃদ্ধির কথাই বলছে।’
স্থপতি আমিনুল ইসলাম ইমন বলেন, স্থপতিরা কেবল ফার বাড়ানোর কথা বলেননি, সঙ্গে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার অন্যান্য বিষয়েও মতামত দিয়েছেন। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব নয় বিধায় ঢাকায় আগত মানুষদের বসবাসের ব্যবস্থা করতে হবে।
পরিবেশকর্মী আমিরুল রাজিব বলেন, ড্যাপ নিয়ে বিভিন্ন পেশাজীবীর পরস্পরবিরোধী অবস্থানের দায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও বর্তায়। দেশের প্রতিটি শহর ঢাকাকে অনুকরণ করার চেষ্টা করে। ফলে ড্যাপের যে কোনো সিদ্ধান্ত সুবিবেচনাপ্রসূত হতে হবে। রিহাবের গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আনতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফরহাদুর রেজা বলেন, একটি শহরের ধারণক্ষমতার ওপর ভিত্তি করেই পরিকল্পনার সব সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের কেবল মুনাফা লাভের চিন্তা শহরের উন্নয়নের অন্তরায়।