আমাদের শঙ্খ নদ

গোপাল নাথ বাবুল

 

শঙ্খ নদ (সাঙ্গু নদ) চট্টগ্রাম বিভাগের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদ। শঙ্খ নদের অপরূপ রূপ দেখে মুগ্ধ হবেন না, এমন মানুষ পাওয়া ভার। অপূর্ব এ নদের দু-দিকে পাহাড়ের সারি, যেন পাহাড় আর নদের মেলবন্ধন। বর্ষায় পাহাড় বেয়ে নামে অসংখ্য ছড়া। ছলছল শব্দে ছড়ার চঞ্চল জল এসে মেশে নদে। পাহাড়ের ওপর ভেসে বেড়ায় মেঘ। মনে হয়, ওই চূড়ায় উঠলে বুঝি ছোঁয়া যাবে, ধরা যাবে এবং মেঘের মাঝে ভেসে বেড়ানো যাবে।

পাহাড়, অরণ্য, ঝরনাধারায় নয়নাভিরাম, দুর্গম পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার আয়তন ৪,৪৭০ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা পাহাড়ি-বাঙালি মিলে প্রায় ৩ লাখ। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এ জেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পর্বতগুলো। এরমধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ দুর্গম ‘মদক’ (১০৫২ মি.) পর্বতে শঙ্খ নদের উত্পত্তি। উত্তরে আরাকান পর্বত থেকে এর ভৌগোলিক অবস্থান ২১.১৩ ডিগ্রি উত্তর এবং ৯২.৩৭ ডিগ্রি পূর্বে। এ নদের প্রস্থ গড়ে ১১৯ মিটার, গভীরতা ১৫ মিটার, অববাহিকার আয়তন ১২৭৫ বর্গমিটার এবং প্রকৃতি সর্পিলাকার। মার্চ-এপ্রিল মাসে পানিপ্রবাহের পরিমাণ ১ ঘনমিটার/সেকেন্ডে এবং জুলাই-আগস্ট মাসে পানিপ্রবাহের পরিমাণ ২৭০০ ঘনমিটার/সেকেন্ডে। এ নদ উঁচু দুর্গম পাহাড়, গহীন বনাঞ্চল ও অসংখ্য পাহাড়ি জনপদ ছুঁয়ে এঁকেবেঁকে প্রায় ২৭০ কি. মি. পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ উপশহর দোহাজারীর পাশ ঘেঁষে আনোয়ারা, বাঁশখালী হয়ে কর্ণফুলির মোহনা থেকে ১৬.০৯ কিমি. দক্ষিণে কুমারখালী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে কুতুবদিয়া চ্যানেল হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। এদিকে ডলুনদী সাতকানিয়া উপজেলার সমভূমি নিষ্কাশন করে উত্তর মুখে প্রবাহিত হয়ে আমিলাইষের গরিঙ্গা হাটের কাছে শঙ্খ নদে পতিত হয়েছে এবং তার ডান পাশে পটিয়া উপজেলার সমভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত চান্দখালী নদীও শঙ্খে পতিত হয়েছে।

এ নদের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো—বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশলেও শঙ্খ নদ বান্দরবানের দক্ষিণাঞ্চলে সৃষ্টি হয়ে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে পশ্চিমে বাঁক নিয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়া বিভিন্ন নদীর পানি লবণাক্ত হলেও শঙ্খ নদের পানি মোহনার পর থেকে লবণাক্ত নয়।

এ নদের নাম শঙ্খ কেন তার কোনো তথ্যসূত্র পাওয়া না গেলেও ব্রিটিশ আমলে বাঙালি আমলারা গেজেটভুক্ত করার সময় ‘শঙ্খ নদ’ হিসেবে গেজেটভুক্ত করেন। পরবর্তীতে ১৮৬০ সালে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম গেজেটিয়ার প্রকাশকালে ব্রিটিশরা সম্ভবত ইংরেজিতে অশুদ্ধ উচ্চারণের কারণে শঙ্খ নদকে ‘সাঙ্গু নদ’ হিসেবে চিহ্নিত করে। আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় উপজাতিরা আদিকাল থেকে এ নদকে ‘রিগ্রাই খিয়াং’ (যার অর্থ স্বচ্ছ পানির নদী) এবং চট্টগ্রামের অধিবাসীরা শঙ্খ নদ হিসেবে অভিহিত করে আসছেন।

বান্দরবান জেলা এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের অধিকাংশ অঞ্চলের অধিবাসীর জীবন-জীবিকার সাথে এ নদ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এক সময় দু-জেলার অধিবাসীরা যাতায়াত, পরিবহন, কৃষি এবং অন্যান্য প্রয়োজনে এ নদটিকে বহুলভাবে ব্যবহার করলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা ও যান্ত্রিক যানবাহনের উন্নত ব্যবস্থা গড়ে ওঠার ফলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এ নদের প্রয়োজনীয়তা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশের কারণে গত কয়েক দশক ধরে এ নদের রূপ পাল্টানোর পাশাপাশি বদলে গেছে চারপাশের পরিবেশ ও জীবনযাত্রা। বর্ষাকালে তীব্র স্রোতধারা প্রবাহিত হয়ে নদটি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। তখন নদটির ভয়ঙ্কর গর্জন কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে শোনা যায়। মাঝে মাঝে স্রোতধারার তীব্রতার কারণে ফুলে-ফেপে দু-কূল ছাপিয়ে বন্যা সৃষ্টি করে। পাহাড়ি ঢলে নেমে আসা প্রচুর গাছপালা-লাকড়ি দু-কূলের মানুষ সংগ্রহ করে সারাবছরের জ্বালানির ব্যবস্থা করেন। বন্যা পরবর্তী পলিমাটি জমা হওয়ার ফলে কোনো প্রকার সার বা ওষুধ প্রয়োগ ছাড়াই অনায়াসে চাষ করতে পারেন। মেশিনের মাধ্যমে চাষিরা প্রায় ১৫ কি. মি. পর্যন্ত নিয়ে যান এ নদের পানি বোরো চাষ করার জন্য। শুকনো মৌসুমে এ নদে চিংড়ি, শোল, রুই, কাতলা, মৃগেল, মাগুরসহ হরেকরকমের মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে তাতে কিছুটা ভাটা পড়েছে নদের অপব্যবহারের কারণে। তাছাড়া কয়েক দশক আগেও এ নদ দিয়ে চট্টগ্রাম শহর থেকে কর্ণফুলির মোহনা দিয়ে যোগাযোগের মাধ্যম এবং বড় বড় নৌকা ও সাম্পানের মাধ্যমে মালামাল পরিবহণ করা হলেও বছরের পর বছর পলিমাটি আর বালি জমাটের ফলে ভরাট হয়ে গভীরতা কমে নদটির অবস্থা প্রায় সমভূমিতে রূপ নিতে চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শঙ্খের নাব্যতা ফিরিয়ে আনলে নদটির দু-পাড়ের মানুষের দুর্ভোগ কমতো এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ উপশহর দোহাজারীকে একটি নৌ-বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেত।