মেহেদী হাসান গালিব
কৃষ্ণের বৃন্দাবন প্রত্যাবর্তনের স্মরণে প্রতি আষাঢ় মাসে আয়োজিত রথযাত্রা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ একটি ধর্মীয় উত্সব। আর এই উত্সবের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে রথের মেলা। প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও রাজশাহীর সাগরপাড়া এলাকায় আয়োজন করা হয় ৭ দিনব্যাপী রথমেলা। সাগরপাড়া এলাকার রাস্তার দু-পাশের ফুটপাত যেন সেজে ওঠে হরেকরকম পণ্যের পসরায়।
প্রথম দেখায় রথের মেলাকে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিয়ে আয়োজিত ছোট পরিসরের একটি মেলা মনে হলেও এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয় মেলায় খানিকক্ষণ হাঁটাহাটি করে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলার পর। এ যে মোটেই স্থানীয় কোনো মেলা নয়, বরং রাজশাহীর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের চেয়ে রাজশাহীর বাইরের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীদের সংখ্যাই এখানে বেশি। পাশের জেলা নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া তো বটেই, সৈয়দপুর, খুলনা থেকেও ব্যবসায়ীরা এই মেলায় এসে সাজিয়েছেন তাঁদের পণ্যের পসরা।
রথমেলার অন্যতম একটি বিশেষত্ব হলো এই মেলায় ব্যবসায়ীক পণ্যের চেয়ে নিজ নিজ জেলার বিখ্যাত ও জনপ্রিয় পণ্যগুলোই প্রাধান্য পায় তুলনামূলক বেশি এবং দু-একটি দোকান পরপর খাবারের দোকান যেন মেলায় যোগ করে বাড়তি এক অনন্যতা। মিষ্টির দোকানের ভেতরেই অস্থায়ী চুলায় বানানো হয় ফুল জিলাপি। ক্রেতারা সদ্য চুলা থেকে নামানো গরম গরম রসালো জিলাপি দিয়ে ভিজিয়ে নেন মুখ। সে এক অপূর্ব দৃশ্য! শুধু কী জিলাপি? বাতাসা, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি, মুড়ি-মুড়কি, কুড়মুড়ি, খই, চানাচুরসহ আরো কতশত মুখরোচক খাবার সাজিয়ে রাখা হয় খাবারের দোকানগুলোতে। পলিথিনের বেড়াজাল ভেদ করে এসব খাবারের মিষ্টি গন্ধ যেন ছড়িয়ে পড়ে পুরো মেলায়। মিষ্টান্নমহ অন্যান্য খাবারের সব ক’টি দোকান আসে নাটোর ও রাজশাহীর চারঘাট এলাকা থেকে।
এছাড়াও মেলায় স্থান পায় বেশকিছু আসবাবপত্রের দোকান। বিছানা, সোফা, ড্রেসিং টেবিলসহ বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্রের দেখা মেলে সেখানে। দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ দোকানই এসেছে বগুড়া থেকে। এছাড়া পাশের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এসেছে খাটলার ৩-৪টি দোকান। যাঁরা ‘খাটলা’ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত নন, তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি—খাটলা মূলত ছোট আকারের এক ধরনের বিছানা। তবে এর উচ্চতা বিছানার চেয়ে খানিকটা কম। এতে তোষকের পরিবর্তে রশির পর রশি লাগিয়ে বিভিন্ন প্যাটার্নের নকশা করে বসবার কিংবা শোয়ার ব্যবস্থা করা হয়। মূলত বারান্দায় কিংবা উঠোনে বিশ্রামের জন্য এটি ব্যবহূত হয়ে থাকে।
এসবের পাশাপাশি মেলায় বগুড়া ও সৈয়দপুর থেকে আসে বিভিন্ন মাটির তৈরি আসবাবপত্র ও খেলনার দোকান। এসব দোকান যেমন খুব সহজেই ছোটদের নজর কাড়ে তেমনি বড়রাও এসে কেনেন বিভিন্ন ধরনের পণ্যসামগ্রী। খুলনা থেকে আসা একটি আলোকসজ্জার দোকান প্রতিরাতে পরিণত হয় মেলায় ঘুরতে আসা দর্শকদের আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে। সূর্য যখন গোধূলির সমস্ত আলো সঙ্গে নিয়ে টুপ করে ডুব দেয় ঠিক তখনই হরেক রঙের মৃদু আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে দোকানটি। তবে এই দোকানের বিশেষত্ব হলো এদের হারিকেনগুলো তৈরি করা হয় নারিকেলের উচ্ছিষ্ট খোল থেকে। ফেলে দেওয়া জিনিসও যে কত চমত্কারভাবে কাজে লাগানো যায়, তার অন্যতম উদাহরণ আপনি দেখতে পারবেন এই দোকানে।
এ তো গেল উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পণ্যের কথা। এছাড়াও যে আরো কতশত রঙ-বেরঙের পণ্য সাজানো হয় রথের মেলায়, তার ইয়ত্তা নেই। তবে রথের মেলা যে ইট-পাথরের এই শহরকে খানিকটা সময়ের জন্য হলেও রঙিন করে তোলে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই রঙ, এই উত্সব আর এই আনন্দের পেছনেও লুকিয়ে থাকে কিছু মন খারাপের গল্প।
গত সপ্তাহের কথা। সকাল সকাল বাসা থেকে বের হলাম মেলার উদ্দেশ্যে। ঘড়ির কাঁটা তখনো ১১টার ঘর পার হয়নি। দোকানিরা এখনো তাঁদের পণ্য সাজানো নিয়ে ব্যস্ত। প্রায় ১ ঘণ্টার মতো মেলায় হাঁটাহাটি করলাম। ততক্ষণে দোকানিরা তাঁদের দোকান প্রস্তুত করে ফেলেছেন। হাঁটতে হাঁটতে হঠাত্ চোখে পড়ল একটি দোকানে তখনো সেভাবে পণ্য সাজানো হয়নি। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোথায় থেকে এসেছেন?’ দোকানি জানালেন, ‘সৈয়দপুর।’ দোকানির সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে চোখ পড়ল দোকানের পাশেই একটি ছেলে আঁঠা দিয়ে মাটির তৈরি একটি ফুলদানির ভাঙা অংশ জোড়া দিচ্ছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে সে কাজে না থামিয়েই কাতর কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘সৈয়দপুর থেকে আসার সময় বেশকিছু মাল ভেঙে গেছে। এখন সেসব জোড়া লাগাচ্ছি।’
রথমেলার রঙ যেমন রঙিন করে তুলেছে চারপাশ, ঠিক তেমনিভাবেই রঙিন করে তুলুক হতদরিদ্র এই মানুষদের। উত্সবের রঙ ছড়িয়ে পড়ুক ক্রেতা থেকে বিক্রেতায়, ধনী থেকে গরিবের মাঝে।