তানভীর তারেক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে
নিউইয়র্কের লাগুডিয়া এয়ারপোর্টটি বিশ্বের ব্যস্ততম এয়ারপোর্টের ভেতরে একটি। এয়ারপোর্টটিতে গত কয়েকবছর ধরে সংস্কারের কাজ চলছে। অনবরত বিভিন্ন স্থান থেকে প্লেন উঠছে আর নামছে। খুব মনোযোগ দিয়ে তাই ফ্লাইট শিডিউল না দেখলে নিজের এয়ার শিডিউল দেখা সম্ভব না। সকাল ৭টায় স্পিড এয়ারলাইন্সের একটি এয়ারবাসে ছেড়ে যাবো নিউইয়র্ক থেকে।
যাঁরা বাংলাদেশের ডোমেস্টিক এয়ারলাইন্সের বাসগুলোতে চড়ে অভ্যস্ত তাঁদের দেশীয় ধারণা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারবাসে উঠলে বড্ড ভুল করবেন। কারণ একেবারে নির্দিষ্ট সাইজের ব্যাগ ছাড়া আধা ইঞ্চি প্রশস্ত বা দীর্ঘ লাগেজ হলেই আপনাকে বোর্ডিংয়ের সময় ডলার গুনতে হবে। আমাকেও তাই করতে হলো। মাত্র ০.৩ ইঞ্চি সাইজে বড় নাকি আমার লাগেজ।
কোনোভাবেই এয়ার টিকেট চেকার আমাকে ছাড়লেন না। কাস্টম অফিসার জ্যামাইকান ব্ল্যাক নারী। আমাকে কড়া করে বললেন, ‘তুমি টাকা না দিলে ব্যাগ রেখে যেতে হবে।’
আমি সেই ভোরবেলা অগত্যা সেই বাড়তি ৫৫ ডলার গুনতে গুনতে তা কনভার্ট করে দেশি টাকায় কত হয় এসব ভাবতে ভাবতে মাথা ধরে গেল। কারণ জরিমানার পরিমাণ আমার ওই লাগেজের দামের সমান।
২ ঘণ্টার জার্নি নিউইয়র্ক টু মিশিগান। সকালে উঠেই ডোনাটস আর কফি খাওয়ার অভ্যেস অধিকাংশ আমেরিকাবাসীর। এয়ারবাসের সিটে এসেও দেখলাম সবাই ব্যাগের চেইন খুলে প্যাকেট বের করে ডোনাটস আর কফি খাচ্ছে। এর আগেও ফ্লোরিডায় যাওয়ার সময় জেটব্লুতে খাবার কিনে খেয়েছি এরোপ্লেনের ভেতরে। কিন্তু একই ভুল আবার করলাম। বাইরে থেকে খাবার নিয়ে উঠলাম না। এদিকে নাস্তা করেও বের হইনি।
অগত্যা আবারো কেবিন ক্রু কাম খাবারের ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে একটা ‘ক্যাফে লাতে’ কিনলাম। পাশে বসা উশকু খুশকু বাদামি চেহারার লম্পা চুল ওয়ালা এক তরুণ হাত বাড়িয়ে পরিচিত হতে চাইলেন। খুবই অবাক হলাম তাঁর ব্যবহারে। কারণ সাধারণত দৃশ্যপট হয় উল্টো। আমিই আগ বাড়িয়ে পরিচিত হতে চাই। কথায় কথায় জানলাম সে ফরাসি মিউজিশিয়ান। নাম জর্জ ফার্মার। দীর্ঘ প্লেন যাত্রা শেষে মিশিগানে একটি মিউজিক ফেস্টিভ্যালে জয়েন করতেই সে যাচ্ছে। আমিও মিউজিক করি জেনে ভীষণ কৌতুহলী হলো। আলাপগুলোও জমলো। এক পর্যায়ে আমি আমার নিজের দেশের কথা বলতেই জানালো ইন্ডিয়ায় একবার একটি প্রোগ্রাম করতে গিয়ে সে বাংলাদেশের কথা শুনেছে। কারণ সেখানে বাংলাদেশি দর্শকও ছিল।
আমি এবারে মিশিগানে ঘুরতেই গিয়েছি। ঘুরে ঘুরে ভিডিও ভ্লগ তৈরির করবো জানাতেই জর্জ বললো, মিশিগান সিটির বাইরের সাইডটা খুব সুন্দর। ঘুরে এসো। দারুণ ভ্লগ তৈরি করতে পারবে। আমি মিউজিশিয়ান বলেই ব্যাগ থেকে বের করে দুটো কনসার্ট টিকেট বের করে দিলো। টিকেট ঠিক না। অনলাইনের দুটো কোড নম্বর। পরে দেখলাম দুটো টিকেটের মূল্য ৬২ ডলার। অথচ প্লেনে উঠতেই অকারণে এক নারী আমাকে ৫৫ ডলার জরিমানা নিলো। আর সুদূর ফ্রান্স থেকে আসা এক তরুণ মাত্র ৫ মিনিটের পরিচয়ে আমাকে ৬২ ডলার দিয়ে দিলো!
ফার্মারকে বললাম, ‘দেখো তুমি মাত্র কয়েক মিনিটের পরিচয়ে এত টিকেট গিফট করলে। অথচ এই এয়ারবাসটি আমাকে ৫৫ ডলার জরিমানা করেছে।’
স্পিড এয়ারলাইন্স ততক্ষণে ল্যান্ড করেছে। আমার হাতের ছোট ব্যাগটা দেখে সে খুব অবাক হয়ে বললো, ‘তুমি অবশ্যই ওদেরকে একটি মেইল দেবে। মেইলে ক্লেইম করলেই ওরা তোমার টাকাটা ফেরত দেবে। কারণ এত ছোট একটি লাগজে তুমি ক্যারি করতেই পারো। এটা ওদের অন্যায়।’
মিশিগান মূলত গাড়ির শহর। আমেরিকান সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি ব্র্যান্ড ফোর্ড ও ক্রাইসলার নামের দুটি কোম্পানি মিশিগান সিটির প্রায় পুরোটাই কিনে রেখেছে। তাঁদের গাড়িগুলো বানানো হয় এই শহরে। এমনকি হাসপাতাল, রেস্টুরেন্ট, একাধিক সড়কও এই গাড়ির কোম্পানির নামে দেখা গেল।
ঢাকায় ফোর্ড শব্দটি দেখেছি কৈশোরে ট্রাকের গায়ে লেখা ‘ফোর্ডের বডি’।
আমার বন্ধু ইকবাল ফেরদৌস চাকরি করে সেই ফোর্ড কোম্পানিতে। সেখানকার সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার সে। ইকবালের বাসায় কেউ নেই বলে এয়ারপোর্ট থেকে নেমেই ওর লিংকলিন গাড়িতে চেপে ফোর্ডের অফিসে গেলাম। শহরে তখন সকালের ঝুম বৃষ্টি। ল্যাপটপে ইয়া বড় সাইজের জিপের সফটওয়ার কিভাবে ডেভলপ করা হয় তা দেখলাম বসে বসে। আমি তখন যে গাড়িতে বসে ছিলাম। সেটি কেবলই কারখানা থেকে বের হয়েছে। এখনো পুরো তৈরি হয়নি বিক্রির জন্য। অনেকটা মাঝরাতে প্রেস থেকে বের হওয়া সদ্য প্রকাশিত কাঁচা পত্রিকার মতো মনে হলো গাড়িটিকে!
বড় বড় হাইওয়ে জুড়ে বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। পরদিন মিশিগান থেকে খানিক দূরে যাবো বলে ঠিক করা হলো। জানলাম আমরা ফ্রাংকেনমুথে যাবো। গুগল করতেই দেখলাম দেয়ালে টাঙানো ছবির মতো জায়গাটি। মন ভালো হয়ে গেল।
মিশিগান ডেট্রয়েট থেকে প্রায় ৪ ঘণ্টার ড্রাইভ, অর্থাত্ ওখানকার ৪ ঘণ্টা ড্রাইভ মানে ঢাকা টু কক্সবাজার। কিন্তু সুবিধা হলো ট্রাফিকের কোনো ঝামেলা নেই। হাইওয়ে স্পিড লিমিটে চললেও আমরা দারুণভাবে গিয়ে ঘুরে আসতে পারবো।
সবুজ গ্রামের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে আমাদের গাড়ি। নিউইয়র্কবাসীর অধিকাংশই আপনাকে বারেবারে মিশিগানকে বলবে গ্রাম। এখানে দেখার কিছু নেই, এসব অপবাদ ছড়াবে। আমাকেও শুনতে হয়েছে। কারণ ডেট্রয়েট থেকে যাত্রাপথে প্রশস্ত হাইওয়েকেই মনে হয়েছে ভিনদেশ। এর বাইরে দু-পাশের সবুজ ক্ষেত-খামারগুলো দেখে মনে হয় ঢাকা- রংপুর হাইওয়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। তাই ফ্রাংকেনমুথ নিয়ে যে উচ্ছ্বাস ছিল তা কিছুটা ম্লান হতে লাগলো।
কিন্তু ঠিক ফ্রাঙ্কেইনমুথের দোরগোড়ায় আসতেই মন খারাপ করা চোখগুলো ঝকঝকে হয়ে উঠল। যেন হঠাত্ করেই কোনো গ্রামের মেঠোপথ থেকে ইউরোপের কোনো মডেল সিটিতে ঢুকে পড়েছি। অথচ প্রায় পুরোটাই একটা আবাসিক শহর। আমার সঙ্গে থাকা সেলফোন, ডিএসএলআর, গোপ্রো ক্যামেরাসহ সব গেজেটগুলো বের করে দৃশ্যধারণ করতে লাগলাম। সাজানো গোছানো ফুল বাগানের
ভেতর দিয়ে একটা বড় উঠোনে ছাদখোলা রেস্তোরাঁয় লাইভ জ্যাজ মিউজিক হচ্ছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দৃশ্যধারণ করতে লাগলাম। কপোত-কপোতীরা নাচছে মৃদু ছন্দে। অধিকাংশেরই বয়স পঞ্চাশোর্ধ। আমি ক্যামেরা তাক করে আছি বলে লিয়েনা নামের এক প্রৌঢ় নারী এসে বললেন, ‘কিছু বলতে হবে আমাকে। ’
এ কথা বলেই আমার ক্যামেরাই চিত্কার করে বলে উঠল লাভ ইউএসএ। লিয়েনার বাড়ি বোস্টনে। দীর্ঘদিন ইতালিতে থেকেছে। তাঁর নাতি থাকেন নিউইয়র্ক। এখানে স্বামীকে নিয়ে ঘুরতে এসেছে। লিয়েনা বললো, ‘তোমার মন খারাপ হলেই এখানে চলে আসবে। দেখবে মন ভালো হয়ে যাবে।’
আমি ‘ধন্যবাদ’ বলে বিদায় নিলাম। শুধু লিয়েনাই নয়, পুরো রাস্তাজুড়ে অগণিত টুরিস্ট। এতটা বন্ধুসুলভ কোনো টুরিস্ট এরিয়া দেখিনি। সবাই একে অপরকে যেচে পরিচয় হচ্ছে। কথা বলছে। যেকোনো পর্যটকই তাই প্রেমে পড়ে যাবে এই জায়গাটির। এ কারণেই জায়গাটিকে বলা হয় ‘ফান সিটি’। যে যার মতো করে আনন্দ করছে। রাস্তায় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গাড়ির পাশাপাশি চলছে সাদা ধবধবে ঘোড়াচালিত গাড়ি। চলছে একটি ভিন্ন ডিজাইনের রিকশা।
এছাড়া মিশিগান মিলিটারি ও স্পেস হিরোদের জাদুঘর এখানে। যা দেখলে ইতিহাসের পথে হাঁটবেন আপনিও কিছুক্ষণ। তবে বিশ্ব যুদ্ধকালীন কিছু গল্প জানা থাকলে এই জায়গাটি আপনাকে আরো আপন করে নেবে। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে লেক। ছোট্ট এক জলাধার। টুরিস্টরা একটি প্যাকেজ কিনে বড় বোটে ঘুরে আসতে পারেন। তবে সবটুকু একদিনে ঘুরতে চাইলে খুব ভোরে এখানে এসে পৌঁছাতে হবে। খুব সকালে মিশিগান সদর থেকে রওনা হলে পুরোদিন ঘুরে নৈশভোজ সেরে সবাই যার যার নিবাসে ফিরে যায়। তাই শনি, রবিবার অন্যান্য দিনের চেয়ে ভিড় থাকে।
বুড়ো-বুড়িদের পাশাপাশি ১৭/১৮ বছরের তরুণ-তরুণীদের ভিড় দেখা গেল। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই জানা গেল সামার ভ্যাকেশনে ঘুরতে এসেছে।
আশেপাশের দোকান দেখলেই চোখ জুড়াতে থাকবে। এছাড়া এই ফ্রাংকেনমুথের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো চকোলেটের দোকান। কারণ বিখ্যাত ব্র্যান্ডের চকোলেটগুলোর শপে গেলেই আপনাকে আপনার সামনেই চকোলেটের কাঁচামাল দিয়ে একেবারে ইচ্ছে মতো চকোলেট বানিয়ে দেবে। আপনি অবাক হয়ে দেখবেন কিভাবে ক্যাডবেরিসহ বিভিন্ন বিখ্যাত চকোলেটগুলো তৈরি হয়। এই অভূতপূর্ব দৃশ্য না দেখলে আপনি মিস করবেন। ঘুরতে ঘুরতেই তাই মনে পড়ল নিউইয়র্কের বন্ধুদের কথা। যাঁরা আমাকে মিশিগানে দেখার কিছু নেই বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন এই স্টেটে কোনো প্রাণ নেই। শুধু ইট-পাথরের শহর।
আমরা ঘুরে-টুরে ক্লান্ত হয়ে আবারো ফিরলাম ডেট্রোয়েট অভিমুখে। যাওয়ার সময় পকেটে হাত দিতেই বের হয়ে এলো প্লেনে দেখা হঠাত্ বন্ধু জর্জ ফার্মারের দেওয়া ওই দুটি কনসার্টের টিকেট। সেখানে লেখা গেট ওপেন বিকেল ৫টা। কিন্তু আমরা জিপিএসএর দেওয়া সময় মেপে দেখলাম সেই ভেন্যুতে পৌঁছাতে আমাদের রাত সাড়ে ১১টা বেজে যাবে। ততক্ষণে কনসার্ট শেষ হয়ে যাবে। ৬২ ডলারের টিকেট দুটো করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যেন আমার দিকে। চোখে মুখে তখন আমাদের ফ্রাঙ্কেনমুথের মুগ্ধতা। লিয়েনার কথাগুলো মনে পড়ল।
আমেরিকাবাসীর মন খারাপ হলে যেখানে যায়। সেখান থেকে ফেরার পথে কনসার্ট না দেখতে পারার আক্ষেপে আমার উল্টো মন খারাপ করে দিলো। ড্রাইভিং সিটে ইকবাল ফেরদৌস। ও আবার কণ্ঠশিল্পী হাবিবের অন্ধ ভক্ত। হাবিবের গান ছেড়ে দিলো জোরসে। গাড়ির জানালা আধখোলা। তাতেই সজোর বাতাস আমাদের চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে। বাইরের আকাশে ততক্ষণে ঘন আঁধার। কোনো চাঁদ-তারা নেই। ফ্রাঙ্কেনমুথের আলো ঝলমলে শহর থেকে বেরিয়ে আমরা আবারো যেন ওয়েস্টার্ন মুভির কোনো দীর্ঘ জনশূন্য রাস্তায় এসে পড়লাম।