তালেব রানা
হরমুজ প্রণালিতে তেল ট্যাংকার চলাচলকে কেন্দ্র করে ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা শক্তিধর দেশের উত্তেজনা আবারও চরমে পৌঁছেছে। কিছুদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে চলেছিল। সেই পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হতে না হতেই এবার ব্রিটেনের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এর প্রেক্ষিতে পারস্য উপসাগরে দ্বিতীয় যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ব্রিটেন। ভূমধ্যসাগরে থাকা ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস ডানকান আগামী সপ্তাহে পারস্য সাগরে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস মনট্রোসের সঙ্গে যোগ দেবে। দ্বিতীয় যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি ‘এলিট স্পেশাল বোট সার্ভিস’ মোতায়েন করবে ব্রিটেন। যার সদস্যরা মাইন অনুসন্ধান ও অপসারণে দক্ষ। ব্রিটেনের দাবি হরমুজ প্রণালির কাছে ব্রিটিশ তেল ট্যাংকারগুলোর নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্মুক্ত রাখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে দ্বিতীয় যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি জোরালো করতে চাইছে ব্রিটেন। একইসঙ্গে নতুন করে ওই অঞ্চলে যুদ্ধের শঙ্কাও তৈরি করেছে।
২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে করা বহুজাতিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে গত বছর যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে আসার পর থেকেই দেশ দুটির মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাম্প্রতিককালে হরমুজ প্রণালির কাছে ছয়টি তেল ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র এ ঘটনার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে। তবে ইরান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এই হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার একপর্যায়ে গত মাসে একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করে ইরান। এ ঘটনায় ইরানের তিনটি সামরিক স্থাপনায় হামলার অনুমোদন দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ট্রাম্প। যে কারণে অল্পের জন্য বড় ধরনের সামরিক সংঘাত এড়িয়েছে দুই দেশ। যদিও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। একইসঙ্গে মার্কিন সেনাদের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার আগেই ইরানের সঙ্গে এবার বিবাদে জড়িয়েছে ব্রিটেন! চলতি মাসের শুরুতে জিব্রাল্টার প্রণালির কাছে ইরানের গ্রেস ওয়ান তেল ট্যাংকার আটকে দিয়েছে ব্রিটিশ রয়্যাল মেরিন সেনারা। এ ঘটনায় ব্রিটেনকে সতর্ক করে প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান। এরই মধ্যে গত বুধবার ইরানের কয়েকটি নৌযান একটি ব্রিটিশ তেল ট্যাংকারকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করেছে ব্রিটেন। তাদের দাবি, ট্যাংকারটি বাধা দেওয়ার চেষ্টাকালে ইরানের নৌবাহিনীর সদস্যদের তাড়িয়ে দেয় রয়্যাল নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ। এর প্রেক্ষিতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের জলসীমায় নিজেদের জাহাজ চলাচলের উপর হুমকির মাত্রা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ করেছে যুক্তরাজ্য। তারা বলছে, হামলার হুমকি ‘গুরুতর’ পর্যায়ে রয়েছে। এরপরই পারস্য অঞ্চলে দ্বিতীয় যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কথা জানিয়েছে ব্রিটেন। যদিও শনিবার ব্রিটেন বলেছে, ইরানের তেল ট্যাংকার ছেড়ে দিতে রাজি আছে রয়্যাল মেরিন সেনারা। তবে এক্ষেত্রে ইরানকে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, এই ট্যাংকারটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা ভেঙে সিরিয়ায় যাবে না। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট বলেছেন, ব্রিটেন উত্তেজনা বাড়াতে চায় না। যদিও ইরানের পক্ষ থেকে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি। ব্রিটেনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা উত্তেজনা বাড়াতে চাইছে না। তবে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ট্যাংকার চলাচল উন্মুক্ত রাখতে তারা তত্পর থাকবে।
এমন পরিস্থিতিতে পারস্য অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ‘পারস্য উপসাগরে আরেকটি যুদ্ধ হবে কি?’ শিরোনামে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইরান বারবার বলছে তারা যুদ্ধ চায় না। কিন্তু এই অঞ্চলে উত্তেজনা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। তেল ট্যাংকার আটকানোর জন্য ইরান ব্রিটেনকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভৃত্য’ বলে মন্তব্য করেছে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে ব্রিটেন ইরানের ট্যাংকার আটকে রেখেছে। তারা তেল ট্যাংকার আটক রাখার ঘটনাকে একটি পরিকল্পিত কাজ বলেই মনে করছে।
সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পর মিত্রদেশ ব্রিটেনও তাদের সামরিক উপস্থিতি জোরদারের পদক্ষেপ নেওয়ায় ওই অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাত শুরুর আশঙ্কা বাড়ছে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম রণতরীর কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল জিম ম্যালয় বলেছেন, বাণিজ্যের মুক্ত প্রবাহ নিশ্চিত করতে রয়্যাল নৌবাহিনীর সাথে মিলে কাজ করা হবে।
শনিবার ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাবেক কমান্ডার কর্নেল কেম্প বলেন, তেল ট্যাংকার আটকে রাখার জন্য ইরান সার্বক্ষণিক প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খুঁজবে। এক্ষেত্রে ব্রিটিশ রয়্যাল নৌবাহিনীকে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকতে হবে। তিনি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সানডেকে বলেন, এই অবস্থায় ইরানকে অবশ্যই শক্ত বার্তা দিতে হবে। ব্রিটিশ বাহিনীর কঠিন প্রতিরোধই ইরানের জন্য বার্তা হবে।