গাইবান্ধায় ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) ও মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) সার সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আবার জেলার অনেক এলাকায় বাড়তি দামেও কিনতে পাওয়া যাচ্ছে না টিএসপি। সারের এই সংকটে জেলায় বিভিন্ন রবি ফসলের চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ারও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, রবি মৌসুমের শুরুতে সারের চাহিদা বেশি থাকায় ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা বাজারে এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অধিক মুনাফা করেছেন। ডিলারদের অভিযোগ চাহিদার চেয়ে সরবরাহ কম থাকায় এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তবে সারের কোনো সংকট নেই বলে দাবি করছেন জেলা কৃষি অধিদপ্তর।
সরেজমিন দেখা গেছে, সরকার নির্ধারিত মূল্য প্রতি কেজি টিএসপি ২৭টাকা ও এমওপি বা পটাশ ২০টাকা। কিন্তু অধিকাংশ সারের ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা টিএসপি ৩২ থেকে ৪০ টাকা, এমওপি বা পটাশ ২২ থেকে ২৫ টাকা দরে বিক্রি করছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় চলতি রবি মৌসুমে ১ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমিতে আলু, ৬১০ হেক্টর জমিতে মিষ্টি আলু, ১৭ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা, ৩ হাজার ৩০৭ হেক্টর জমিতে গম, ১৮হাজার ২১৫হেক্টর জমিতে সরিষা, ২৩৫ হেক্টর জমিতে তিল, ৮১হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী, ১হাজার ৯৮৬ হেক্টর জমিতে বাদাম, ৭৬৩ হেক্টর জমিতে কলা, ৯২১ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন প্রকার ডাল, ৬ হাজার ৯৪৭ হেক্টর জমিতে শাকসবজি, ২ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে মরিচ, ১ হাজার ৯৪৪ হেক্টর জমিতে পিয়াজ, ৩২৯ হেক্টর জমিতে রসুনসহ আরও অন্যান্য মসলা জাতীয় ফসল চাষের লক্ষ্য মাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে জেলায় ২৫ হাজার ৭২০ মে.টন টিএসপি ও ৪১ হাজার ৪৪১ মে.টন পটাশের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এপর্যন্ত ১০হাজার ৪৭৮ মে.টন টিএসপি ও ১২হাজার ৩৭৬ মে.টন এমওপি বা পটাশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাকি সার পর্যায়ক্রমে বরাদ্দ দেওয়া হবে।
গাইবান্ধা সদরের বল্লমঝাড় ইউনিয়নের তালুকমন্দুয়ার গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি ৭০ শতক জমিতে আলু বপন করছেন। এ জন্য তাকে টিএসপি প্রতিবস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকার স্থলে ২হাজার ২০টাকা, এমওপি বা পটাশ ১হাজার টাকার স্থলে ১হাজার ১২০টাকা এবং ডিএপি ১হাজার ৫০টাকার স্থলে ১হাজার ১৫০ টাকা দরে কিনতে হয়েছে।
সাদুল্লাপুর উপজেলার হবিবুল্লাপুর গ্রামের বর্গাচাষী মঞ্জু মোল্লা জানান, তিনি ১৬ শতক জমিতে আলু বপন করেছেন। এ জন্য সাদুল্লাপুর বাজার থেকে ৩২ টাকা দরে টিএসপি ও ২২ টাকা দরে পটাশ সার কিনেছেন।
জাতীয় কৃষক সমিতির সাদুল্লাপুর উপজেলার সভাপতি কামরুল ইসলাম জানান, সার কিনতে গেলে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সংকটের কথা বলেন। তবে দাম বেশি দিলেই সার পাওয়া যায়। কিছু কিছু ডিলার মূল্য তালিকা টাঙিয়ে রাখলেও সেই অনুযায়ী বিক্রি করছেন না। বিক্রেতারা কৃষককে বিক্রয় রসিদ দিচ্ছেন, কিন্তু বাড়তি দাম রসিদে লিখছেন না। প্রতিবাদ করলে সার বিক্রি করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন।
সাদুল্লাপুর বাজারের খুচরা সার বিক্রেতা বেলাল মিয়া জানান, চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে টিএসপির সরবরাহ কম। তিনি আরও বলেন, ডিলাররা সরকার নির্ধারিত দরে আমাদেরকে সার দিচ্ছেন না। এ কারণে বেশি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গাইবান্ধা বিএসডিসির এক সার ডিলার জানান, আমন ধান কাটার পর কৃষকরা একসঙ্গে বিভিন্ন রবি শস্যের চাষ শুরু করেন। এ কারণে অন্য সময়ের চেয়ে নন ইউরিয়া সার টিএসপি, পটাশ ও ডিএপি সারের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বরাদ্দ স্বাভাবিক সময়ের মত অর্থাৎ অন্যান্য মাসের মতই দেওয়া হয়। এ কারণে এই সংকট।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিআইসির আরেক সার ডিলার জানান, চাহিদার চেয়ে সরবরাহ কম। তিনি আরও বলেন, “এখনও গত নভেম্বর মাসের সার অনেক ডিলারকে সরবরাহ করা হয় নাই। এই কারণে সংকট সৃষ্টি হয়েছে।”
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এসোসিয়েশন জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম রিপন জানান, জেলায় টিএসপির চাহিদা বেশি। কিন্তু ডিএপি সারের বরাদ্দ বেশি। এ কারণে টিএসপির তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. খোরশেদ আলম জানান, জেলায় সারের কোন ঘাটতি নাই। তিনি আরও বলেন, বিসিআইসির ১১৩ জন ও বিএডিসির ১৫২ জন ডিলারের মাধ্যমে জেলার ৭ উপজেলায় সার সরবরাহ করা হয়। তাদের ওপর আমাদের নিয়মিত মনিটরিং আছে। কোথাও অনিয়ম হলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এপর্যন্ত সাদুল্লাপুর, গোবিন্দগঞ্জ ও পলাশবাড়ীতে একাধিক সার ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।