হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করার উদ্যোগ সরকারের

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত ৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ভুয়া, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রতিরোধে প্রতিটি জেলায় তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) ও জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি সুপারিশ প্রস্তুত করছে। এসব কমিটি সব জেলায় ভুয়া, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা বাছাই করছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদনপত্র দাখিল করবে। আবেদনের সঙ্গে এজাহার ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে চার্জশিটের সার্টিফাইড কপিও জমা দিতে হবে।

এদিকে আবেদন প্রাপ্তির সাত কর্মদিবসের মধ্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দরখাস্তটি জেলার পাবলিক প্রসিকিউটর (ক্ষেত্র বিশেষে মেট্রোপলিটন পাবলিক প্রসিকিউটর)-এর কাছে মতামতের জন্য পাঠাবে। আবেদন প্রাপ্তির ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে পাবলিক প্রসিকিউটর (ক্ষেত্র বিশেষে মেট্রোপলিটন পাবলিক প্রসিকিউটর) তার মতামত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠাবেন। পরে পাবলিক প্রসিকিউটরের মতামত সহকারে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবেদনটি ৭ কার্যদিবসের মধ্যে জেলা কমিটির সভায় উপস্থাপন করবেন। জেলা কমিটির কাছে যদি মনে হয় মামলাটি রাজনৈতিক বা অন্য কোনো উদ্দেশে হয়রানির জন্য দায়ের করা হয়েছে, তাহলে মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য কমিটি সরকারের কাছে সুপারিশ করবে। পরবর্তীকালে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ঐ সুপারিশ, মামলার এজাহার, চার্জশিটসহ আবেদন প্রাপ্তির ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে নির্ধারিত ‘ছক’ অনুযায়ী তথ্যাদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। জেলা কমিটির কাছ থেকে সুপারিশপ্রাপ্তির পর সেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এবং প্রত্যাহারযোগ্য মামলা চিহ্নিত করে তালিকা প্রস্তুত করা ও মামলা প্রত্যাহারের কার্যক্রম গ্রহণ করবে মন্ত্রণালয় পর্যালোচনা কমিটি।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অন্যান্য কারণে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, নিরীহ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ‘হয়রানিমূলক সব মামলা প্রত্যাহারের’ সুপারিশ করার জন্য দুইটি কমিটি গঠন করেছে সরকার। এর মধ্যে একটি জেলা পর্যায়ের কমিটি, আরেকটি মন্ত্রণালয়ের। আইন উপদেষ্টার নেতৃত্বে মন্ত্রণালয় পর্যায়ের কমিটিতে ছয় সদস্য থাকবেন। এই কমিটির নেতৃত্ব দেবেন আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। এছাড়া সদস্য হিসেবে কমিটিতে থাকবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব, অতিরিক্ত সচিব (আইন ও শৃঙ্খলা), যুগ্ম-সচিব (আইন) এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি (যুগ্ম-সচিব পর্যায়ের নিচে নয়)। এছাড়া কমিটির সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের আইন-১ শাখার উপসচিব/সিনিয়র সহকারী সচিব/সহকারী সচিব।

মন্ত্রণালয় পর্যায়ের কমিটি জেলা কমিটির কাছ থেকে সুপারিশ প্রাপ্তির পর মন্ত্রণালয় পর্যায়ের কমিটি সুপারিশগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে এবং প্রত্যাহারযোগ্য মামলা চিহ্নিত করে তালিকা প্রস্তুত করবে এবং মামলা প্রত্যাহারের কার্যক্রম গ্রহণ করবে। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর আওতাধীন মামলাসমূহের মধ্যে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলাগুলো দ্য অরিজিনাল ল অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৮ এর ১০ (৪) ধারার বিধানমতে কমিশনের লিখিত আদেশ ছাড়া প্রত্যাহার করা যায় না। এ কারণে এ ধরনের মামলা চিহ্নিত করে তালিকা তৈরি করতে হবে। এ ধরনের মামলার বিষয়ে করণীয় পরবর্তীকালে নির্ধারণ করবে সরকার।

ক্ষমতার পালাবদলের পর বিগত সরকারের মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নামে অনেক মামলা হয়েছে আদালতে এবং দেশের বিভিন্ন থানায়। এসব মামলায় নাম প্রকাশ করে আসামি করা হয়েছে ২৬ হাজারের বেশি মানুষকে। অজ্ঞাতপরিচয় আসামি রয়েছে ২ লাখের ওপরে। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে জুলাইয়ের প্রথম দিন থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীকে গুলি চালাতে নির্দেশ দিয়ে হত্যা এবং নির্যাতন চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে এসব মামলায়। গণআসামি করে দায়ের করা এসব মামলা বিচারের ভবিষ্যৎ কী, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, জুলাই-অগাস্টের গণআন্দোলনে হতাহতের বিচার চেয়ে দেশ জুড়ে যেসব মামলা হচ্ছে, সেগুলোর ধরন যেন আওয়ামী লীগ আমলের ‘গায়েবি’ মামলার মতোই। এতে করে ভুক্তভোগীর পরিবার সঠিক বিচার পাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা থেকে যাচ্ছে। যাচাই-বাছাই না করে মিথ্যা বা ভুয়া মামলা দিয়ে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি না করার অনুরোধ এসেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে।