পরিবর্তনে জনগণকেই ভূমিকা রাখতে হবে

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ তাদের দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তষ্ট না। কারণ এসবের কোনো দিকেই বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। 

দুর্নীতি-সন্ত্রাস-মাদক-চাঁদাবাজি-দখলবাজি আর জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি এবং বিচারহীনতা দেশের প্রধান সমস্যা। অথচ স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর এই প্রতিটা ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রগতি অর্জন করার কথা ছিল। উন্নত দেশগুলিতে যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন দেখা যায়, সেগুলির জন্য সেসব দেশের নাগরিকদের অনেক সংগ্রাম, বিদ্রোহ এবং আন্দোলন করতে হয়েছে। একদিনে এসব অর্জিত হয়নি। বাংলাদেশের জনগণকেও মুক্তিযুদ্ধ থেকে পরবর্তী সময়ে স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে কম রক্ত দিতে হয়নি। কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে উন্নত দেশের জনগণ তাদের সংগ্রাম এবং ত্যাগের ফল লাভ করলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব হয়নি এবং এখানে বারবার গণবিরোধী শাসন, দুর্নীতি এবং বিচারহীনতার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

যে কোনো সমস্যা সমাধান করতে হলে প্রথমে সমস্যার মূল কারণটা চিহ্নিত করতে হয়। বিদেশি শত্রু, প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা ডেঙ্গুর মতো রোগ-কোনো কিছুই বাংলাদেশের জন্য সমস্যা না। সব সমস্যার একমাত্র কারণ এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের নীতি- আদর্শের অভাব এবং ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করতে না পারা।

রাষ্ট্র নামের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানটার সৃষ্টি হয়েছিল ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে। কারণ রাষ্ট্রের যে কোনো সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ডে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ লাভবান হলে রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে প্রতিটা নাগরিক সেটার অংশীদার হয়। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে এই চেতনা গড়ে ওঠেনি। তাদের চিন্তাভাবনা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, গোষ্ঠীগত এবং সর্বোচ্চ দলীয় স্বার্থ বিবেচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ঠিক এ কারণে স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি, পরিবার, গোষ্ঠী এবং দলের উন্নয়ন হলেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।

এখন বাংলাদেশের জনগণকেই ঠিক করতে হবে, তারা কি অনন্তকাল একই অবস্থা দেখতে চায় নাকি সত্যিই একটা উন্নত, সভ্য এবং আইনের শাসনে পরিচালিত দেশ চায়। দেশের পরিবর্তন চাইলে প্রত্যেক নাগরিককে অবশ্যই তার দায়িত্ব পালন করতে হবে। একটা রাষ্ট্রের নাগরিকদের দায়িত্ব ইতিহাস, আইন, সংবিধান এবং অর্থনীতিসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটা ক্ষেত্রে তাদের মতামত দেওয়া এবং ভূমিকা রাখা। সরকার বা প্রতিষ্ঠানের যে কোনো ধরনের অনিয়ম, অপচয় ও গণবিরোধী তৎপরতা দেখামাত্র প্রতিবাদ করা।

রাষ্ট্র পরিচালনা করেন নেতারা। গ্রামের ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে জনগণের সমর্থনের ভিত্তিতেই নেতা নির্বাচিত হয়। ইচ্ছা করলেই কেউ নেতা হতে পারে না। জনগণের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব সৎ, নীতিবান, দেশপ্রেমিক এবং দুর্নীতিমুক্ত নেতা নির্বাচিত করা। দুর্নীতিবাজ এবং দেশপ্রেমহীন নেতা দিয়ে পৃথিবীর কোনো দেশ কোনোদিন উন্নত হতে পারে না। দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে যে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জনগণ সৎ নেতৃত্ব নির্বাচনে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। গ্রামের অধিকাংশ চেয়ারম্যান থেকে সংসদ সদস্য ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট এবং হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে। জনগণ নিজেরাই দুর্নীতিবাজদের নেতা নির্বাচিত করে তারপর তাদের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত উন্নত দেশ লাভের প্রত্যাশার মতো হাস্যকর বিষয় আর কিছু হতে পারে না।

এছাড়া জনগণকেও সব ধরনের দুর্নীতি অনিয়ম থেকে বিরত থাকতে হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মধ্যে দুর্নীতি এবং আইন না মানার প্রবণতা থাকলে আইনের শাসনে পরিচালিত দেশ গঠন করা অসম্ভব। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ দুর্নীতিগ্রস্ত হলে রাষ্ট্র দুর্নীতিমুক্ত হবে-এধরনের চিন্তাভাবনা করা সম্পূর্ণ যুক্তিহীন। নিউটনের প্রথম সূত্রে বলা হয়েছে, কোনো স্থির বা চলমান বস্তুর অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত না কোনো বহির্বল এর পরিবর্তন ঘটায়। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে যে দুর্নীতি, অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা এবং আইনের শাসনহীনতা চলেছে এসব থেকে দেশকে মুক্ত করে উন্নত এবং আইনের শাসনের পরিচালিত দেশে পরিণত করার সিদ্ধান্ত জনগণকেই নিতে হবে। অন্যথায় যেরকম চলছে সেভাবেই চলতে থাকবে।