ধান, নদী, খাল এই তিনে মিলে বরিশাল। আর এই বরিশালের ঐতিহ্যবাহী নদী হচ্ছে কীর্তনখোলা। একটা সময়ে এই নদীর রূপ-সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বরিশালকে ‘বাংলার ভেনিস’ বলেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তবে সময়ের বিবর্তনে কীর্তনখোলার সেই সৌন্দর্য এখন পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে। নদীর এই ঐতিহ্য এবং বরিশালকে বাঁচিয়ে রাখতে দূষণের হাত থেকে রক্ষার দাবি সচেতন মহলের। আর পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সমন্বিত উদ্যোগ দূষণ রোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কীর্তনখোলার সঙ্গে সংযুক্ত জেল খাল, ভাটার খাল, ভিআইপি কলোনির ড্রেন থেকে সরাসরি নগরীর বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নদীতে। তা ছাড়া নদীবন্দর থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করায় তারাও ময়লা-আবর্জনা নদীতে ফেলে দিচ্ছে। নগরীর এসব ময়লার অধিকাংশই পলিথিন। যেগুলো নদীতে পতিত হওয়ার পরে দু-এক দিন ভেসে থেকে তলিয়ে গিয়ে নদীর তলদেশে জমা হয়। এছাড়াও নগরীর বিভিন্ন কল-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ফেলে কীর্তনখোলার পানিকে করা হচ্ছে বিষাক্ত। যে যেভাবে পারছে ময়লা-আবর্জনা নদীতে ফেলছেন। এভাবে কীর্তনখোলায় বর্জ্য ফেলা হলে কীর্তনখোলা তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলবে। এর ফলে পরিবেশ মারাত্মক হুমকিরও সম্মুখীন হচ্ছে। এভাবে নদীর নাব্য ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকলে আস্তে আস্তে নদী ভরাট হয়ে যাবে, হারাবে নদীর গতি-প্রবাহ। তবে যদি সচেতনতা বৃদ্ধি করা যায় এবং সবার সমন্বিত উদ্যোগে কাজ করা যায় তাহলে কীর্তনখোলা নদীকে বাঁচানো সম্ভব বলে মনে করেন সচেতন মহল ও বিশেষজ্ঞরা। বাজার রোডের বাসিন্দা হুমায়ূন কবির জানান, একটা সময় আমরা জেল খালে গোসল করতাম, কিন্তু এখন যে খালের অবস্থা তাতে এ পানি ব্যবহার তো দূরের কথা, ধরতেও ইচ্ছা করে না। একই অবস্থা এখন কীর্তনখোলা নদীরও, খালের সঙ্গে সঙ্গে এখন নদীর পানিও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কারণ যে পরিমাণ ময়লা খাল থেকে নেমে নদীতে যায় তা আসলে না দেখলে বোঝার উপায় নেই। এর ফলে কীর্তনখোলার যে একটি ঐতিহ্য রয়েছে তা কিন্তু বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এ নদীটিতে বাঁচিয়ে রাখতে যা যা করা দরকার সেগুলো করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ উন্নয়ন (বাপা) সমন্বয়ক রফিকুল আলম বলেন, ১৯৫০ সালের নদী ও জলাধার সুরক্ষা আইনে স্পষ্ট উল্লেখ আছে—কোনোভাবেই নদী দূষণ করা যাবে না। নদী দূষিত হলে পরিবেশের ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য, নদীর সঙ্গে যুক্ত ও নির্ভরশীল জীবিকা নষ্ট হয়ে যায়। আবার দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিয়েছে, নদীকে কোনোভাবেই দূষণ করা যাবে না। সেটি শিল্পকারখানা বা মানুষের ব্যবহারের কারণে হোক। তিনি বলেন, প্রতিটি নদীর একটি হেলথ কার্ড দরকার, যদি নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা করে দেওয়া হয়, তাহলে তার স্বাস্থ্য তখন প্রতিনিয়ত পরীক্ষা করতে হবে। আর সেই ফলের ওপর ভিত্তি করেই অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করতে হবে। নদীর পাড়ে থাকা বাজার ও রেস্তোরাঁগুলোতে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি নজরদারিও করতে হবে।
বরিশাল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, কীর্তনখোলা নদীটা আমরা দূষণ ও দখল মুক্ত করার জন্য একটি কমিটি রয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে মন্ত্রণালয়ে বাজেটসহ পরিকল্পনা পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ এলেই জেলা প্রশাসন থেকে কীর্তনখোলা নদী দখল ও দূষণ রোধে কাজ করতে পারব।
বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তর সহকারী পরিচালক শেখ কামাল মেহেদী বলেন, কঠিন বর্জ্য নীতিমালা যা আসলে বাসাবাড়ির বর্জ্য সেটা একত্রে জড়ো করে একটা প্ল্যান্ট তৈরি করার দরকার। নদী-খালসহ যেসব জায়গায় প্লাস্টিক ফেলা হচ্ছে এটা আমি মনে করি, জনসচেতনতা ও সংরক্ষণের অভাব। কীর্তনখোলা নদীটি দূষিত হচ্ছে, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। বিশেষ করে বরিশাল নদীবন্দর এলাকা। এ জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি।