ভারতে কারাগারেও জাতিগত বৈষম্য

ভারতের জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশের বান্দার এলাকার ২২ বছর বয়সী বাসিন্দা মৃদুল কুমারকে (ছদ্মনাম) ২০১৮ সালে এক প্রতিবেশীকে মারধর করার অভিযোগে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ওই প্রতিবেশী মারা হাসপাতালে মারা যান। এ ঘটনায় মৃদুলকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

মৃদুল একজন 'দলিত'। হিন্দু বর্ণ শ্রেণিবিন্যাসে দলিতরা সর্বনিম্ন এবং সহস্রাব্দ ধরে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। এই বৈষম্যের অবসান ঘটাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ যদিও নেওয়া হয়েছে, তবুও ভারতে এটি রয়ে গেছে।

গত বছরের মে মাসে জেলে ঢোকার পর প্রথম যে বিষয়টি মৃদুলকে হতবাক করেছিল, তা হলো জেল কর্তৃপক্ষ জাত-পাতের ভিত্তিতে কাজ বণ্টন করে দেন।

মৃদুল তার শহরে একটি গরুর গাড়িতে ডিমের রোল বিক্রি করতেন। তিনি ধরে নিয়েছিলেন, তাকে রান্নাঘরে কোনো কাজ দেওয়া হবে। তবে অবাক করা বিষয়, কারা কর্তৃপক্ষ তাকে তার জাত জিজ্ঞাসা করেছিল। পরে জাত-পাত যাচাই করে তাকে ড্রেন পরিষ্কার করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

কারাগারের ভেতরের অভিজ্ঞতার জানিয়ে মৃদুল বলেন, আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। আমি কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলার চেষ্টাও করেছিলাম, কাটাকাটি বা রান্নার কাজ দেওয়ার জন্য, কিন্তু তারা আমার কথা শোনেনি। আমাকে ড্রেন পরিষ্কার করতে বলা হয়েছিল।

২০২০ সালের জুলাই মাসে মৃদুল ডেপুটি জেল সুপারিনটেনডেন্টের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি বিষয়টি নোট করেন এবং তাকে বাসন পরিষ্কারের দায়িত্ব এবং রান্নার কাজে নিযুক্ত বন্দিদের সহায়ক হিসাবে নিযুক্ত করেন।

তবে তাকে তফসিলি জাতি (সরকারিভাবে স্বীকৃত ভারতের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত আর্থসামাজিক জনগোষ্ঠী) উল্লেখ করে বন্দিরা প্রতিবাদ করে। এরপর হতাশ মৃদুলকে বাগানের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যার কোনো অভিজ্ঞতা তার ছিল না।

২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় এবং বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং মনোজ মিশ্রের একটি ডিভিশন বেঞ্চ কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্যগুলোকে কারাগারে বর্ণ-ভিত্তিক বৈষম্য মোকাবেলায় কারাগারের বিধি সংশোধন করার নির্দেশ দিয়ে একটি রায় দেয়।

২০২০ সালে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ভারতীয় কারাগারে বর্ণভিত্তিক বৈষম্যের ব্যাপক বিস্তারের তথ্য প্রকাশ্যে আসে। এরপর ২০২৩ সালে সাংবাদিক সুকন্যা সান্থার দায়ের করা একটি রিট পিটিশনের ভিত্তিতে আদালত বর্ণ-ভিত্তিক বৈষম্য দূর করার সিদ্ধান্ত নেয়।

ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিসের সিনিয়র অফিসার মনোজ কুমার বর্তমানে মধ্যপ্রদেশের রতলামে কর্মরত, একসময় সেখানকার কারাগার পরিচালনা করতেন। তিনি বলেন, সমস্যাটি আমাদের সমাজে এত গভীরভাবে গাঁথা যে, আদালতের রায়ের পরেও এর সমাধান করা 'একটি দূরবর্তী লক্ষ্য' হিসাবে রয়ে গেছে।

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আমার মনে আছে, একবার একজন দলিত বন্দিকে কারাগারের ভেতরে খাবার পরিবেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অন্যান্য বন্দিরা এর তীব্র প্রতিবাদ করেছিল। এমনকি যারা খাবার রান্না করেছিল, তাদের মধ্যে ৫০ শতাংশেরও বেশি সেদিন খাবার খায়নি। কেউ কেউ এই ব্যক্তির স্পর্শ করা প্লেটে খেতে অস্বীকার করেছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এই দলিত বন্দিকে অন্য দায়িত্ব দিতে হয়েছিল।

জেলবিধির সাম্প্রতিক সংশোধনী সত্ত্বেও 'মেহতার' (মেথর) বন্দিদের দিয়ে কারাগারের শৌচাগারে মানুষের মলমূত্র পরিষ্কার করানো হয়। যা বর্ণ বৈষম্যকে আরও স্থায়ী করার দিয়ে নিয়ে যায়।

ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্য

অপরাধের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের দায়িত্বে থাকা ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো ২০২০ সালে জানিয়েছিল, ভারতে বিচারাধীন বন্দিদের বেশিরভাগই প্রান্তিক বর্ণ থেকে আসা। ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরে গড়ে প্রতি তিনজনের মধ্যে দু'জন (৬৪ শতাংশ) বন্দিই ছিলেন তফসিলি জাতি। এছাড়া তফসিলি উপজাতি ১২.৩ শতাংশ এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি ৩০ শতাংশ ছিল।

২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ব্যক্তিরা এই অনাকাঙ্ক্ষিত আটকের ফলে নানাভাবে প্রভাবিত হয়। তারা আইনি সহায়তাও কম পায়। জামিনের শর্ত পূরণে অসুবিধার মতো অন্যান্য কারণে সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তিদের বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়, যার ফলে কারাগারে অনেক সময় কাটাতে হয়।

বলছেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের আইনজীবী প্রণবেশ ওম বলেন, স্বাধীনতার ৭৭ বছর পরেও কারাগারে বর্ণভিত্তিক বৈষম্য সংবিধানের ১৪ থেকে ১৮ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত 'সাম্যের অধিকার'-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা পুরানো কারাগার আইন ও বিধি সংস্কার করতে ব্যর্থ হয়েছে। অসাংবিধানিক এবং অমানবিক অনুশীলনগুলো এখনো অব্যাহত রেখেছে।

এই আইনজীবী বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানানো হয়েছে, কেননা এটি সংবিধানের প্রতি নাগরিকদের আস্থা পুনর্ব্যক্ত করেছে। আমি আশা করি সরকার নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কারা বিধিতে বাধ্যতামূলক পরিবর্তনগুলো কার্যকর করবে।

তিনি বলেন, বিচারাধীন বন্দিদের, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যারা বছরের পর বছর বিচারের অপেক্ষায় কারাগারে রয়েছেন, তাদের ওপর আদালতের অতিরিক্ত চাপ কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা আমাদের অবশ্যই মোকাবেলা করতে হবে। কথায় আছে, ন্যায়বিচার বিলম্বিত মানে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া। এই বাস্তবতা ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো রিপোর্টে প্রতিফলিত হয়েছে, যা প্রান্তিক পটভূমি থেকে আসা বিচারাধীন বন্দিদের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখায়।

দুই দশক ধরে বন্দিদের নিয়ে কাজ করা সমাজকর্মী নরেশ পারস বলেন, একজন মানুষ সর্বত্রই বর্ণবৈষম্যের শিকার হন। শুধু বাইরে নয়, জেলের ভিতরেও। কারাগারে বর্ণভিত্তিক বৈষম্য একটি সাধারণ বিষয়। জেল রেজিস্টারেও একজন বন্দির 'জাত' লিপিবদ্ধ করতে হয়।

তিনি বলেন, 'বর্ণ' নথিভুক্ত প্রক্রিয়ার মুহূর্ত থেকেই দলিত বন্দিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু হয়। এরপর জেলে কাজের বণ্টনও করা হয় জাতপাতের ভিত্তিতে। দলিত বন্দিদের শৌচাগার ঝাড়ু দিতে ও পরিষ্কার করতে বাধ্য করা হচ্ছে। অস্বীকার করলে তাদের শারীরিক নির্যাতন ও নির্যাতন করা হয়। তাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে।

প্রভাবশালী বন্দিরা দলিতদের ব্যক্তিগত কাজ করতে বাধ্য করে। জাতিভিত্তিক গালিগালাজ, অকথ্য ভাষা প্রয়োগ করে তাদের সম্বোধন করা হয়। এই বৈষম্য তাদের মানবিক মর্যাদা ও আত্মসম্মান ক্ষুণ্ণ করে, মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। এটি কারা ব্যবস্থা নিয়ে সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের প্রকাশ্য লঙ্ঘন।

তথ্যসূত্র: আরটি